Saturday, April 20, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামমন্ত্রীর চেয়ে ক্ষমতাবান এরা কারা?

মন্ত্রীর চেয়ে ক্ষমতাবান এরা কারা?

লুৎফর রহমান

শেষ করতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের একটি বক্তব্য দিয়ে। মানবজমিনকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, পাঠ্য বইয়ে ভুল তথ্য থাকলে বিপদ আছে। সেটি অশিক্ষার চেয়েও ভয়ঙ্কর। নতুন পাঠ্যক্রম চালু করে শিক্ষার্থীদের সময়োপযোগী করে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। এই পাঠ্যক্রম কীভাবে আরও বেশি বাস্তবসম্মত এবং শিক্ষার্থীবান্ধব করা যায় তার জন্য বড় এক সুযোগ করে দিতে পারে এই ভুল আর ভ্রান্তির ইস্যু। আশা করি শিক্ষা বিভাগ এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে একটি নির্ভুল পাঠ্যক্রম উপহার দিতে পারবে। যেসব শ্রেণিতে সামনের দুই বছরে নতুন পাঠ্যপুস্তক আসছে সেখানে আর কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা বিতর্কিত বিষয় থাকবে না যা ইস্যু হয়ে সরকারকে বিব্রত করে


বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই আসার পর থেকেই বিতর্কের শুরু। ভুল, নানা অসঙ্গতি বইয়ের পাতায় পাতায়। কাগজ সংকটের কারণে বছরের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থী হাতে বই পায়নি। কেউ ছয়টি বইয়ের দু’টি হাতে পেয়েছে, তিনটি পায়নি।

বিজ্ঞাপনabout:blankকেউ কেউ এখনো নতুন বছরের বইয়ের দেখা পায়নি। শিক্ষার্থীরা সময়মতো বই পাবে কিনা এ নিয়ে আগে থেকে শঙ্কা ছিল। কারণ বিদায়ী বছরের শেষটা গেছে নানা অস্থিরতায়। বিশেষ করে ডলার সংকটে আমদানি সংকোচিত হয়েছে। এতে কাগজের সরবরাহ কমে যায়। কালিসহ ছাপার অন্যান্য উপকরণেও সংকট দেখা দেয়। এমন সব কারণে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের চাহিদার পুরো বই সরবরাহ করতে পারেনি জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। যে বই সরবরাহ করা হয়েছে তার কোনো কোনোটির কাগজের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বই হাতে না পাওয়াটা একটা বড় খবর। কিন্তু এখন এটি নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। আলোচনার বিষয় বইয়ের ভুল আর অসঙ্গতি।  ইতিহাসের তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে পাঠ্য বইয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পিতার নামের অংশ বাদ দেয়া হয়েছে। তার পদবি নিয়ে অনেকটা খেয়ালিপনা করা হয়েছে। বইয়ের প্রচ্ছদে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় উপস্থাপন করে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। শিশু শিক্ষার্থীদের সামনে অবাস্তব কাল্পনিক তথ্য দিয়ে তাদের শিক্ষা দেয়ার ভ্রান্ত কৌশল নেয়া হয়েছে। এমন ভুল, ভ্রান্তি আর অসঙ্গতি পাঠ্য বইয়ের পুরো মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। 

শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকে ভুল তথ্য, সরাসরি গুগল অনুবাদ করে তুলে দেয়ার বিষয়টি এই শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।  নতুন কারিকুলামের সপ্তম শ্রেণির ‘বিজ্ঞান, অনুসন্ধানী পাঠ’ বই নিয়ে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। যার দায় স্বীকার করেছেন এর দুই লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. হাসিনা খান। মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই বইয়ের সম্পাদনার দায়িত্বেও ছিলেন। বইটিতে চুরি করে তথ্য সংযোজনের অভিযোগ উঠেছে। বেশকিছু জায়গায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ওয়েবসাইট থেকে হুবহু কপি করা হয়েছে। এছাড়া ইংরেজি ভার্সনের ভাষান্তর করা হয়েছে গুগল সহায়তায়।  বিষয়গুলো সামনে আসার পর দেরি না করেই দায় স্বীকার করে নিয়েছেন ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. হাসিনা খান। তারা এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, বইটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ হওয়ায় পরবর্তীতে তথ্যগুলো শোধরে নেয়া হবে। এছাড়া বইয়ের যে অংশটুকু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তা সংযোজনের সঙ্গে তারা সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। অন্য লেখকরা এই অংশটুকু লিখেছেন বা সংযোজন করেছেন। কিন্তু সম্পাদক হিসেবে তারা এর দায় নিজেরাই নিয়েছেন।  প্রশ্ন হলো ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো খ্যাতনামা লেখক ও শিক্ষাবিদকে সম্পাদনা বোর্ডে রেখে ওই লেখকরা কেন এমন কাজ করলেন বা করতে গেলেন। যারা এই কাজ করেছেন তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করে এই কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল কিনা?  এছাড়া ভুলের পর দায় স্বীকার করে নেয়া হলেও এই ভুলের খেসারততো কিছুটা হলেও দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাদের পাঠে ছন্দপতন হয়েছে। পাঠ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।  পাঠ্য বইয়ে বিবর্তনবাদের শিক্ষা নিয়েও একটা বড় বিতর্ক হচ্ছে।

 এটিকে ধর্মীয় ইস্যু বানানোর চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে এ নিয়ে নানা দাবিও তোলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো বিদ্যমান পাঠ্যপুস্তকে যেসব পাঠ ছিল এ নিয়ে এতদিন কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। হঠাৎ কেন এই বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে দিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হলো। মুসলিম প্রধান দেশে কেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করে এমন বিষয় পাঠ্যপুস্তকে জুড়ে দেয়া হলো? ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ এসব করে বিশেষ কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় কিনা এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে।  বইয়ের ভুল আর বিভ্রান্তির বিষয়ে শুধু যে দুই সম্পাদক দায় স্বীকার করে নিয়েছেন তা কিন্তু নয়। এ বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডও বিব্রত। বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফরহাদুল ইসলাম গণমাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, তিনি গত জুনে দায়িত্ব নিয়েছেন। পূর্বাপর ঘটনার দায় তার নেই। তবে বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে ভুলের দায় তিনি নিচ্ছেন।  ভুলের দায় নিয়েছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দায় নিলেও একটি বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন নতুন শিক্ষাক্রমে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা হয়েছে। পাঠ্যবই প্রণয়নের ক্ষেত্রে আগেই কিছু ছবি ও পাঠ বাদ দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত মানা হয়নি। নির্দেশনার পরেও সেগুলো ছাপানো বইয়ে রয়ে গেছে।  প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফরহাদুল ইসলামও ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা বিভাগের শীর্ষ সবার উপস্থিতিতে মন্ত্রীর এই বক্তব্য মানে এটি পুরো শিক্ষা বিভাগের বক্তব্য। কারণে ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর দাবির বিষয়ে কেউ দ্বিমত করেননি। 

এখন প্রশ্ন হলো মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের চেয়ে কারা এই ক্ষমতাবান যে তারা নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভুল আর বিভ্রান্তি রেখেই পাঠ্যবই প্রকাশ করেছেন। কারা এমন ক্ষমতাবান যে তারা মন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করার মতো ঝুঁকি নিতে পারেন?  ওই সংবাদ সম্মেলনেই মন্ত্রী জানিয়েছেন, ভুল সংশোধনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পৃথক কমিটি হয়েছে দায়ীদের বিষয়ে তদন্ত করতে। ওই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধিও রাখা হয়েছে। এতে অনেকটা পরিষ্কার যে বিষয়টি খোদ সরকার প্রধানেরও নজরে রয়েছে।   মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে যারা পাঠ্য বইয়ে বিতর্কিত বিষয় জুড়ে দিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। সরকারকে বিব্রত করেছেন। সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বেগে ফেলেছেন তাদের খুঁজে বের করার কাজটি এতোটা সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। অতি ক্ষমতাধর এই সব ব্যক্তি এবং বলয়কে চিহ্নিত করার কঠিন কাজটি আশা করি সংশ্লিষ্ট তদন্ত দল বের করে আনতে পারবে। কেন কারা এমন কাজ করেছে তা বের করা গেলে সামনে হয়তো এমন ভুল আর হবে না।  বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা ইস্যুতে সরকার বেকায়দায় আছে। উন্নয়ন, উৎপাদন সচল রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা চলছে। 

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আর এক বছরের কম সময় বাকি থাকতে পাঠ্য বইয়ের ইস্যুটি সামনে আসা নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকার সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ এমনও প্রশ্ন তুলেছেন ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ এসব কাজ করেছেন কিনা?  এর পেছনে কারা, কোনো দুরভিসন্ধি আছে কিনা? কেউ কেউ সরাসরি এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সরকার পতনের দাবিতে চলমান বিরোধীদের আন্দোলনের সঙ্গেও কেউ কেউ এর যোগসূত্র করে বক্তব্য দিয়েছেন। সরকারি দলের নেতাদের এমনসব দাবি যদি সত্য হয় তাহলেতো এটি আরও ভয়াবহ বিষয়। কেউ যদি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য পাঠ্য বইয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের উপর সওয়ার হয়ে থাকে তাহলে তো এটি খুঁজে বের করা শুধু জরুরিই নয়, এটি অতি জরুরি একটি বিষয়। পাঠ্য বইয়ের মতো সার্বজনীন বিষয়ে কারো রাজনৈতিক হীন দৃষ্টি পড়ে থাকলে এটি বের করা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্টদের বড় দায়িত্ব। আমরা আশা করবো এমন কিছু হয়ে থাকলে শুধু রাজনৈতিক ‘ষড়যন্ত্রের’ মতো এটিকে ধরে না নিয়ে গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত করে তা প্রকাশ করা হবে। এমন কোনো ষড়যন্ত্র থাকলে যেন দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

 রাজনৈতিক ইস্যুর মতো ষড়যন্ত্রের কথা বলে যাতে আসল ইস্যুকে আড়াল না করা হয়। ষড়যন্ত্রের কথা বলে যাতে দায়ীদের দায়মুক্তির কোনো সুযোগ তৈরি না করা হয়।  শেষ করতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের একটি বক্তব্য দিয়ে। মানবজমিনকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, পাঠ্য বইয়ে ভুল তথ্য থাকলে বিপদ আছে। সেটি অশিক্ষার চেয়েও ভয়ঙ্কর। নতুন পাঠ্যক্রম চালু করে শিক্ষার্থীদের সময়োপযোগী করে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। এই পাঠ্যক্রম কীভাবে আরও বেশি বাস্তবসম্মত এবং শিক্ষার্থীবান্ধব করা যায় তার জন্য বড় এক সুযোগ করে দিতে পারে এই ভুল আর ভ্রান্তির ইস্যু। আশা করি শিক্ষা বিভাগ এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে একটি নির্ভুল পাঠ্যক্রম উপহার দিতে পারবে। যেসব শ্রেণিতে সামনের দুই বছরে নতুন পাঠ্যপুস্তক আসছে সেখানে আর কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা বিতর্কিত বিষয় থাকবে না যা ইস্যু হয়ে সরকারকে বিব্রত করে।  

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments