Sunday, June 23, 2024
spot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি১০ হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান করতে চান রাব্বি

১০ হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান করতে চান রাব্বি

দেশ-বিদেশের ক্লায়েন্টদের কাজ করে বছরে আড়াই লাখ ডলারেরও বেশি আয় করেন রেজুয়ান আহমেদ রাব্বি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ৫০ জন কর্মী। ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়েছেন শতাধিক মানুষকে। রাব্বির সফলতার গল্প শুনেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

 

তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন রাব্বি।

বোনের মোবাইল ফোনে ছবি, রিংটোন ডাউনলোড করতেন। স্কুল ছুটি শেষে যখন সবাই খেলাধুলা করত রাব্বি তখন কম্পিউটারের দোকানে কাজ করতেন। মোবাইলে গান লোড, ফটোকপি, ফটোশপের কাজ করে দিতেন। বিনিময়ে দোকান মালিক কম্পিউটারে ব্রাউজ করতে দিতেন।
এসব করতে করতেই ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর পরিবারের কাছে বায়না ধরেন একটি মোবাইল ফোন কিনে দেওয়ার জন্য। অনেক কান্নাকাটির পরে রাব্বির মা তাঁর গয়না বিক্রি করে একটি স্যামসাং মোবাইল কিনে দেন। 

 

জমি বিক্রি করে ল্যাপটপ

এর কিছু দিন পর কাজের সুবিধার জন্য রাব্বি মা-বাবার কাছে একটি ল্যাপটপ আবদার করেন।

তত দিনে মা-বাবাও যেন ছেলের মধ্যে সম্ভাবনা আছে বুঝতে পেরেছিলেন। জমি বিক্রির টাকায় তাঁরা ছেলেকে ল্যাপটপ কিনে দেন। এই ল্যাপটপ যেন রাব্বির জীবনে নতুন গতি এনে দেয়। 

 

পাঁচ ডলার আয় করতেই দুই বছর

দুই বছর লেগে থাকার পর প্রথম আয়ের মুখ দেখেন রাব্বি। ২০১৩ সালে তিনি ফাইবার মার্কেটপ্লেস থেকে প্রথম আয় করেন পাঁচ ডলার।

এরপর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সমস্যায় পড়লে গুগল, ইউটিউবের সাহায্য নিয়েছেন। তাঁকে ফ্রিল্যান্সিং শিখতে ওয়াসিম সরোয়ার রাহি ও রাইসুল ইসলাম সিহাদ সাহায্য করেছেন। সিহাদ সম্পর্কে তাঁর মামা হন। 

 

শিখতে গিয়ে যত সমস্যা

রাব্বি প্রথম দিকে ইংরেজি ভালো পারতেন না। বায়ারদের বুঝিয়ে বলতে পারতেন না। অথচ কাজটা কিন্তু নিজে ঠিকই পারতেন, বুঝতেনও। সারা দিন ঘরে বসে কাজ করেন। অনেক মানুষই ব্যাপারটা ভালোভাবে নিত না। আর পেপাল না থাকায় পেমেন্ট নিতে তো ঝামেলা হতোই।

 

২৭ বছর বয়সে কোটিপতি

ফ্রিল্যান্সিং শুরুর মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় রাব্বির আয় কোটি টাকা পেরিয়ে যায়। এক মাসে সর্বোচ্চ তিনি আয় করেছেন ৩০ হাজার ডলার। রাব্বির মূল উদ্দেশ্য মান বজায় রেখে কাজ করা। অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

 

রাব্বির যত সিক্রেট

নিজে কাজ শিখতে গিয়ে পদে পদে সমস্যা মোকাবেলা করেছেন। অভাব-অনটনে জীবন জর্জরিত হয়েছে বারবার। তাই নিজের সিক্রেটগুলো বলতে তাঁর একটুও দ্বিধা নেই। রাব্বি চান, অন্যরা এই লাইনে এসে প্রতিষ্ঠিত হোক। তাঁর জীবনের গল্পগুলো অন্যদের জন্য হয়ে উঠুক অনুপ্রেরণা। রাব্বির ১০টি সিক্রেট হলো—কম্পিউটার ব্যবহারের দক্ষতা, ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা, পছন্দের বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব, আকর্ষণীয় প্রফাইল তৈরি করা, মার্কেটপ্লেসে কম মূল্যে কাজ করা, কাজের প্রতি মনোযোগ, কঠোর পরিশ্রম, কোয়ালিটির সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করা, ক্লায়েন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ, ধৈর্য ধারণ।

 

রাব্বির যত কাজ

রাব্বি মূলত এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমেশন), কনটেন্ট রাইটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, গেস্ট পোস্টিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন। রাশিয়া, ভারত, কাতার, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, নেপাল ইত্যাদি দেশের বায়ার তাঁর বেশি। ১৭০টিরও বেশি দেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আইটি সেবা দিচ্ছে রাব্বি আইটি। আপওয়ার্ক, ফাইভারে তিনি টপ রেটেড সেলার (এসইও ব্যাকলিংকস)।

 

রাব্বি আইটি

২০১৮ সালে তিন-চারজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে রাব্বি আইটির কাজ শুরু করেন, ২০১৯ সালের দিকে যা আলোর মুখ দেখে। আইটি ফার্ম করার ভাবনা মাথায় কিভাবে এলো জানতে চাইলে রাব্বি বলেন, ‘যখন নিয়মিত কাজ পেতে শুরু করি তখন অনেক শিক্ষিত বেকার এবং বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী ফ্রিল্যান্সিং শেখার এবং কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে। আমার কাজের পরিমাণ বাড়তে থাকায় রাব্বি আইটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করি। মধুপুরের পালবাড়ী গ্রামে ১০ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাব্বি আইটিতে বর্তমানে ৫০ জন কর্মী কর্মরত আছেন। তাঁদের বেতন দিতে হয় মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। বছরে আড়াই লাখ ডলারের বেশি রাব্বি আইটির মাধ্যমে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আনেন তিনি। রাব্বি আইটিতে মূলত এসইও, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, লিংক ব্লিডিং ইত্যাদি কাজ করা হয়। রাব্বি আইটিতে বিভিন্ন সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে বিনা মূল্যে সেমিনারের আয়োজন করা হয়।  ইংরেজিতে ভালো এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা আছে এমন ব্যক্তিদের লিখিত, প্র্যাকটিক্যাল ও ভাইভা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে রাব্বি আইটিতে কাজ করার সুযোগ আছে।

 

পেমেন্ট গেটওয়ে সমস্যা

ফ্রিল্যান্সিং করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েন রাব্বি পেমেন্ট গেটওয়ে নিয়ে। পেমেন্ট গেটওয়ে নেওয়ার জন্য প্রায় দুই বছর চেষ্টা করার পর রাব্বি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেয়েছেন। রাব্বি বলেন, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জুম মিটিংয়ের পর পেমেন্ট গেটওয়ে প্যাডেল, এসট্রাইপ (Payment Gateway- Paddle, Stripe)  আমাদের অনুমোদন দেয়।

 

শিখিয়েছেন যাঁদের

একদম হাতে ধরে শতাধিক মানুষকে ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়েছেন রাব্বি। এঁদের অনেকের মাসিক আয় এক থেকে পাঁচ হাজার ডলার। রাব্বির ছোট ভাই রায়হান আহম্মেদ শান্তও ফাইবার, আপওয়ার্কসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে কাজ করে মাসে চার-পাঁচ হাজার ডলার আয় করে থাকেন।

 

হয়নি বিএসসি

রাব্বি বিএসসি শেষ করার জন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হয়নি। বিএসসি পাসের স্বপ্ন অর্থাভাবে ভেঙে যায়। এরই মধ্যে বাইক দুর্ঘটনায় রাব্বির বাবা গুরুতর আহত হন। রাব্বিকে তখন সব কিছু ছেড়ে গ্রামে চলে আসতে হয়। নতুন করে শুরু করেন সব। ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনাসহ সব ধরনের দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। পরে রাব্বি সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছেন। মা-বাবা, দুই ভাই, দুই বোন, স্ত্রী নিয়ে বসবাস করেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের পালবাড়ী গ্রামে।

 

ফ্রিল্যান্সিংয়ের টাকায়

ফ্রিল্যান্সিংয়ের টাকায় রাব্বি বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট তো কিনেছেনই, পাশাপাশি মসজিদ, মাদরাসা নির্মাণ এবং অসহায় মানুষের সাহায্য করাসহ বিভিন্ন ধরনের সমাজকল্যাণমূলক কাজ করে থাকেন।

 

আগামী দিনের ভাবনা

আরো বেশি বৈদেশিক রেমিট্যান্স অর্জনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। রাব্বি আইটি ফার্মে ১০ হাজার কর্মীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন—এমন অনেক পরিকল্পনা তাঁর আগামী দিনের জন্য।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments