Wednesday, November 30, 2022
spot_img
Homeধর্মহুদহুদের গল্পে সাংবাদিকতার পাঠ

হুদহুদের গল্পে সাংবাদিকতার পাঠ

কোরআনের বর্ণনায়

পাখি আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি। কোরআনে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিভিন্ন পাখির আলোচনা এসেছে। আল্লাহর নবী সোলায়মান (আ)-এর রাজত্বকালের হুদহুদ পাখির গল্প সেসবের অন্যতম। গল্পটিতে রয়েছে সংবাদ সংগ্রাহক ও পরিবেশকদের জন্য বিরাট শিক্ষা। হুদহুদের গতি, বুদ্ধিমত্তা, সুষ্ঠু-নির্মোহ সংবাদ সংগ্রহ এবং নিঁখুত উপস্থাপন বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। 

সামপ্রতিক গবেষণা বলছে, যোগাযোগ-দক্ষতা ও গতি বিবেচনায় হুদহুদ কবুতরের চেয়ে সেরা। এটি অন্যতম দ্রুতগতির পাখি এবং উড়াল দেওয়ার ক্ষেত্রে তার দলবদ্ধতার প্রয়োজন পড়ে না। আত্মরক্ষার কৌশল ভালোই রপ্ত আছে; ক্ষুধা-তৃষ্ণায় দমে যায় না। বুদ্ধিমত্তা ও ধূর্ততায় তার জুড়ি মেলা ভার। এ কারণেই হয়তো সব প্রাণীর ভাষা-জানা সোলায়মান (আ.) হুদহুদকে নিজের সংবাদদাতা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

ঘটনাটির অবতারণা করে আল্লাহ তাআলা বলেন, এরপর সোলায়মান পাখিদের খোঁজখবর নিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার, হুদহুদকে তো দেখছি না, সে কি অনুপস্থিত? আমি অবশ্যই তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা জবাই করব অথবা সে উপযুক্ত কারণ দর্শাবে।’

একটু পরেই হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, ‘আপনি যে খবর মোটেও জানেন না তা আমি অনুপুঙ্খ জেনে এসেছি এবং সাবা জাতি থেকে সুনিশ্চিত খবর নিয়ে এসেছি। আমি দেখলাম, এক নারী তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁকে সব কিছুই দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাঁকে ও তাঁর প্রজাদের দেখলাম, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করছে। শয়তান তাদের কাছে তাদের কর্মকাণ্ডকে তৃপ্তিদায়ক করেছে এবং তাদের সত্পথ থেকে বিরত রেখেছে, ফলে তারা সত্পথ পায় না। (শয়তান এ কাজ এ জন্য করেছে) যাতে তারা সেজদা না করে আল্লাহকে, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর গোপন খবর প্রকাশ করেন; যিনি জানেন, তোমরা যা গোপন করো এবং তোমরা যা ব্যক্ত করো। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনিই সুবিশাল আরশের অধিপতি।’

সোলায়মান বলল, ‘আমি যাচাই করে দেখব, তুমি কি সত্য বলেছ, না তুমি মিথ্যাবাদী? তুমি আমার এই চিঠি নিয়ে যাও এবং তাদের তা অর্পণ করো; এরপর তাদের কাছ থেকে সটকে পড়ো এবং দেখো, তারা কী উত্তর দেয়।’ (সুরা নামল, আয়াত: ২০-২৮)

বিশেষ গুণ ও ক্ষমতাসম্পন্ন হুদহুদ পাখির কর্মকাণ্ডে সংবাদকর্মীদের জন্য রয়েছে চমত্কার সব শিক্ষা। এখানে কয়েকটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

কৌতূহলোদ্দীপক শিরোনাম : গল্পে আমরা দেখি, কৌতূহলোদ্দীপক ও আকর্ষণীয় শিরোনামে সে কথা শুরু করেছে, যা সাংবাদিকতার জন্য অনন্য শিক্ষা। সে বলেছে, ‘আপনি যে খবর মোটেও জানেন না তা আমি অনুপুঙ্খ জেনে এসেছি এবং সাবা জাতি থেকে সুনিশ্চিত খবর নিয়ে এসেছি।’ সে দ্রুতই চমত্কার এক ইন্ট্রো দিয়ে কথা শুরু করেছে। ফলে সোলায়মান (আ.) তা শুনতে কৌতূহলী হয়ে পড়েন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন।

সাজানো বিষয়কাঠামো : বিষয়কাঠামো গুছালো হওয়ার ব্যাপারে বোদ্ধা সাংবাদিকরা বেশ জোর দেন। প্রত্যেক সংবাদের শিরোনাম, ভূমিকা, মূল বিষয়বস্তু ও উপসংহার থাকা আবশ্যক। হুদহুদ তা তো করেছে, সঙ্গে পঞ্চ-ইন্দ্রীয় ও বুদ্ধিমত্তারও প্রয়োগ করেছে। যেমন, তিনি একজন নারী, তাঁর ও তার সমপ্রদায়ের মধ্যে শাসক-শাসিতের সম্পর্ক বিদ্যমান, তিনি সাবা অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি এবং তাঁর রাজ্যে প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে ইত্যাদি সে দেখে-শুনে বুঝতে পেরেছে। আর শয়তান তাদের সত্পথ থেকে বিরত রেখেছে এবং এ কারণেই তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হচ্ছে না ইত্যাদি কথা তাকে বুদ্ধি খাটিয়েই বের করতে হয়েছে।

গল্পের চরিত্রে বৈচিত্র্য : গল্পের চরিত্রে বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গল্পে বেশ কিছু বৈচিত্র্য আমরা দেখতে পাই। প্রথমে সোলায়মান (আ.) হুদহুদকে সন্ধান করে পান না। আবার হুদহুদ তাঁর সামনে এসে বড় খবরটি দেয়। এরপর সাবার রানির কথার অবতারণা করে। তার সমপ্রদায়ের সূর্যের উপাসনার কথা আলোচনা করে। এভাবে গল্পে বৈচিত্র্য আসে।

অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে সংযম : গল্পে গভীর দৃষ্টি দিলে দেখি, সোলায়মান (আ.) হুদহুদকে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন করেছেন। প্রথমে তিনি বললেন, ‘কী ব্যাপার, হুদহুদকে তো দেখছি না।’ এরপর অভিযোগের সুরে বললেন, ‘সে কি অনুপস্থিত?’ এরপর পর্যায়ক্রমে কঠোর শাস্তি থেকে লঘু শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। কঠিন শাস্তি, এরপর জবাই, এরপর কারণ দর্শিয়ে ক্ষমাপ্রাপ্তির কথা বলেছেন। এটি ইমানদারের লক্ষণ। ইমানদার কখনো ধৈর্যহারা হয় না। ক্ষমাই তার শেষ কথা। সুতরাং প্রতিশোধ নয়, সংশোধন ও ক্ষমাই সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।

সংবাদকর্মীর আত্মরক্ষা-কৌশল : সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে তা থেকে নিজেকে রক্ষা করার কৌশলও সংবাদকর্মীর জানা থাকা চাই। হুদহুদ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তা করেছে। শুরুতেই সে সোলায়মান (আ.)-কে চমকে দিয়ে বলেছে, ‘আপনি যে খবর মোটেও জানেন না, তা আমি অনুপুঙ্খ জেনে এসেছি।’ এর মাধ্যমে সে সোলায়মান (আ.)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তার অনুপস্থিতির যথাযথ কারণ শুনতে বাধ্য করেছে।

মার্জিত শব্দচয়ন : গল্পে হুদহুদ চমত্কার শব্দচয়ন করে কথা বলেছে। আয়াতের ‘আহাততু’ ও ‘নাবা’ শব্দদ্বয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ‘ইহাতা’ ধাতুর অর্থ অনুপুঙ্খ জানা, যেখানে কোনো ফাঁকফোঁকর নেই। আর ‘নাবা’ শব্দটি আরবিতে অধিক নির্ভরযোগ্য খবরকে বলা হয়। খবর নির্ভরযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এ রকম শব্দের ভূমিকা ব্যাপক।

ঘটনার চিত্রায়ণ : সংবাদে ঘটনার যথাযথ চিত্রায়ণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সংলাপ, চারপাশের অবস্থার বিবরণ এবং বিভিন্ন সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা গল্পটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। সবার সামনে সোলায়মান (আ.) হুদহুদকে তালাশ করলেন। হুদহুদ সাবা রাজ্যের জীবন্ত বিবরণ হাজির করল। সোলায়মান (আ.) তাদের জন্য চিন্তিত হলেন এবং তাদের আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য চিঠি দিলেন।

সংক্ষেপে উপস্থাপন : কম শব্দে বেশি কথা বুঝিয়ে দেওয়া এবং বাহুল্যবর্জন করাও একটি দক্ষতা। হুদহুদ তা ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছে। খুব অল্প শব্দে সে বেশ বড় ঘটনা বুঝিয়ে দিয়েছে। যেমন, সে বলেছে, ‘তাকে সব কিছু দেওয়া হয়েছে।’

গল্পটি কোরআনের অন্যতম অলৌকিক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদের তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাওফিক দান করুন।

লেখক : লিবিয়ান ইতিহাসবিদ, ফকিহ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আল-জাজিরা আরবি থেকে

ইসমাইল নাজিম-এর ভাষান্তর

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments