Friday, April 19, 2024
spot_img
Homeলাইফস্টাইলহাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে জেনে নিন করণীয়

হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে জেনে নিন করণীয়

সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) একটি বাস্তব, প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি, যা রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এড়িয়ে চলতে পারে এমন সংক্রমণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধা দেয়। সংক্রমণ সম্ভাব্য জায়গাসমূহের মধ্যে হাসপাতাল হচ্ছে অন্যতম। হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আউটকাম বের করতে হলে কার্যকরী সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

কার্যকরী আইপিসির জন্য নীতিনির্ধারক, হাসপাতাল ব্যবস্থাপক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সেবাগ্রহীতাসহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবস্তরে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন। রোগীর নিরাপত্তা ও সেবার মানের ক্ষেত্রে আইপিসি একটি অনন্য ব্যবস্থা। কারণ এটি স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীর জন্য এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি অভ্যন্তরীণ কাজে সার্বজনীনভাবে প্রাসঙ্গিক। যথাযথ আইপিসি ব্যবস্থাপনার অভাবে সেবা প্রদানকারী হাসপাতালগুলোই হতে পারে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অনেক বড় ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। ত্রুটিপূর্ণ আইপিসি ব্যাপক ক্ষতির কারণ এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই একটি বাস্তবমুখী কার্যকর আইপিসি ছাড়া মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ করা অসম্ভব।

সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) স্বাস্থ্য পরিচর্যার সব দিককে প্রভাবিত করে, যার মধ্যে রয়েছে হাতের স্বাস্থ্যবিধি, সার্জিক্যাল সাইটের সংক্রমণ, ইনজেশন নিরাপত্তা, এন্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স ও জরুরি অবস্থার সময় এবং জরুরি অবস্থার বাইরে হাসপাতালগুলো কীভাবে কাজ করে সব কিছুই।

নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশগুলোতে আইপিসি সাপোর্ট প্রোগ্রামগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ এবং মেডিকেল হাইজিন স্ট্যান্ডার্ডগুলো সেকেন্ডারি সংক্রমণ দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।  

১.  হাসপাতালে সংক্রমণ বা হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশন:

স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালে সেবাগ্রহণকালে যে ইনফেকশন তৈরি হয়, যা রোগী ভর্তির সময় উপস্থিত ছিল না তাকেই হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশন বা নজোকোমিয়াল ইনফেকশন বলে। চিকিৎসার অগ্রগতি যেমন জীবন রক্ষাকারী অনেক উপায় উপকরণ নিয়ে এসেছে, ঠিক তেমনি এটি সংক্রমণসহ স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত বেশ কিছু ঝুঁকিও তৈরি করেছে।

এই ইনফেকশন সাধারণত হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সময় বা হোমকেয়ারের সময়ও হতে পারে। এই অপ্রত্যাশিত সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য রোগীর অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ ছাড়াও হাসপাতালে থাকার সময়কাল দীর্ঘায়িত করা এবং অতিরিক্ত ডায়াগনস্টিক ও থেরাপিউটিক ইন্টারভেনশনের কারণ, যা রোগীর অতিরিক্ত খরচ তৈরি করে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে জনমনে ভয় ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। 

হেলথকেয়ার অ্যসোসিয়েটেড ইনফেকশনের ঝুঁকির ফ্যাক্টর ও কারণসমূহ: 

যে কোনো রোগীর হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশন (ঐঅও) হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও কিছু কিছু ফ্যাক্টর এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যেমন রোগীর বার্ধক্য বা অন্তর্নিহিত রোগের উপস্থিতি, যা রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে, ইনভেসিব মেডিকেল ডিভাইস যেমন রোগীর জন্য ক্যাথেটর বা ব্রেদিং টিউবসের ব্যবহার, রোগীর সার্জিক্যাল প্রসেডিউর থেকে জটিলতা এবং এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার ইত্যাদি। রোগীর জন্য ব্যবহৃত ইনভেসিব মেডিকেল ডিভাইস যেখানে-সেখানে পড়ে থাকা থেকে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের HAI হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি সংক্রমক জীবাণুর সংস্পর্শে এসে রোগী থেকে স্বাস্থ্যকর্মীর ঐঅও হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া নিম্নোক্ত ফ্যাক্টরগুলোকে আমরা  HAI হওয়ার কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি—
♦ রোগীর বয়স ৬৫ বছরের  ঊর্ধ্বে হলে

♦ রোগী জরুরি বিভাগে বা নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে ভর্তি থাকলে

♦ হাসপাতালে সাত দিনের বেশি অবস্থান করলে

♦ কেন্দ্রীয় শিরার ক্যাথেটর, অভ্যন্তরীণ মূত্রনালির ক্যাথেটর অথবা  এন্ড্রোট্রাকিয়াল টিউবের ব্যবহার হলে

♦ সার্জারি বা অস্ত্রোপচার হলে

♦ ট্রমা ইনডিউজড ইমিউনোসাপ্রেশন

♦ নিউট্রোপেনিয়া

♦ চূড়ান্তভাবে মারাত্মক রোগ বা কোমায় থাকলে 

১.২. হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশনের প্রকারভেদ: হাসপাতালে প্রধানত চার ধরনের হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশন পাওয়া যায়—

♦ ক্যাথেটর সম্পর্কি মূত্রনালির সংক্রমণ (ঈঅটঞও)

♦ সেন্ট্রাল লাইন এসোসিয়েটেড ব্লাডস্ট্রিম ইনফেকশন (CLABSI)

♦ সার্জিক্যাল সাইট ইনফেকশন (SSI)

♦ ভেন্টিলেটর সম্পর্কিত ইভেন্ট (VAE)

১.৩.    হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশনের প্রভাব: 
হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশনের বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এটি রোগী ও তার আত্মীয়স্বজনের মাঝে ভয় ও উদ্বিগ্নতা তৈরি, একক বা বিচ্ছিন্ন কক্ষে অবস্থানকালীন রোগীর মানসিক চাপ তৈরি, রোগী ও তার আত্মীয়দের অর্থনৈতিক ক্ষতি, রোগীর অসুস্থতা বৃদ্ধি বা মৃত্যু, হাসপাতালে থাকার সময় বৃদ্ধি, অতিরিক্ত জনবল-খরচ-এন্টিবায়োটিক ও সরঞ্জামের ব্যবহার, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল হ্রাস পাওয়াসহ নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।

২.    হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়: 

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হেলথ কেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশন বা স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রনের মৌলিক উপাদানের একটি আউটলাইন প্রদান করেছে, যা নিম্নরূপ—
♦ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ
♦ জাতীয় ও ফ্যাসিলিটি লেভেলের জন্য সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ গাইডলাইন তৈরি
♦ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা
♦ হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড ইনফেকশন বা স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত সংক্রমণের ওপর নজরদারি (ঝঁৎাবরষষবহপব)
♦ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রনের জন্য মাল্টিমোডাল কৌশল নির্ধারণ
♦ পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়া
♦ পর্যাপ্ত জনশক্তি প্রদান, সহনীয় কাজের চাপ ও প্রয়োজনীয় বেড ক্যাপাসিটি
♦ ফ্যাসিলিটি পর্যায়ে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রনের জন্য পরিবেশ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা।

২.১.    হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ অনুশীলন:
হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ অনুশীলনের দুই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত— ১. স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতা এবং ২. অতিরিক্ত সতর্কতা। স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতা হলো— সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক ও বাধ্যতামূলক অনুশীলন। এটি ছাড়া আমাদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতাসমূহের মধ্যে রয়েছে— হাত ধোয়ার জন্য তরল সাবান, একটি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন, দ্রুত সংক্রমক শনাক্তকরণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ শিক্ষা প্রদান, গ্লাভসের ব্যবহার, আইসোলেশন এবং উপযুক্ত সুরক্ষা-সামগ্রীর ব্যবহার ও সরবরাহ, জীবাণুমুক্তকরণ ও পৃষ্ঠগুলো পরিচ্ছন্ন রাখা, রোগীদের খালি পায়ে হাঁটা থেকে বিরত রাখা, প্রতিদিন এবং অপরিচ্ছন্ন হলেই লিলেন পরিবর্তন করা, খাবার নির্দ্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি। 

স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতার অনুশীলন নিশ্চিত করা ও বজায় রাখার পর প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত সতর্কতা অনুশীলনের। অতিরিক্ত সতর্কতাকে আমরা ট্রান্সমিশনভিত্তিক সতর্কতাও বলে থাকি। অতিরিক্ত সতর্কতার মধ্যে তিন ধরনের সতর্কতা রয়েছে—

১. এয়ারবর্ন বা বায়ুবাহিত সতর্কতা,

২. ড্রপলেট বা ফোঁটাবাহিত সতর্কতা এবং

৩. কন্টাক্ট বা যোগাযোগ সতর্কতা।

বায়ুবাহিত সতর্কতাসমূহের মধ্যে রয়েছে—
♦ স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতার বাস্তবায়ন
♦ রোগীকে আলাদা একক ঘরে/কেবিনে রাখা, যেখানে বায়ুপ্রবাহের নেগেটিভ প্রেসার বা চাপ রয়েছে
♦ কেবিনের দরজা বন্ধ রাখা। কেউ কেবিনে প্রবেশ করলে মাস্ক পরে প্রবেশ করা
♦ প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্য ব্যতীত রোগীর চলাচল ও পরিবহণ সীমিত করা। প্রয়োজনে রোগীকে মাস্ক পরিয়ে বাহিরে বের করা ইত্যাদি।

ড্রপলেট বা ফোঁটা সতর্কতার ক্ষেত্রেও প্রথমে স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতা নিশ্চিত করতে হবে এবং পরে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর দিকে নজর রাখতে হবে—

♦ রোগীকে আলাদা একক ঘরে/কেবিনে রাখা অথবা একইভাবে সংক্রমিত রোগীর সঙ্গে এক কেবিনে রাখা

♦ রোগীর ১-২ মিটারের মধ্যে কাজ করতে হলে মাস্ক পরিধান করা

♦ রোগী পরিবহণের সময় রোগীকে মাস্ক পরিয়ে নেওয়া

সবশেষে কন্টাক্ট বা যোগাযোগ সতর্কতা অনুশীলনের ক্ষেত্রেও স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতার বাস্তবায়নের পর নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে হবে—

♦ রোগীকে আলাদা একক ঘরে/কেবিনে রাখা অথবা একইভাবে সংক্রমিত রোগীর সঙ্গে এক কেবিনে রাখা

♦ রোগীর স্থান নির্বাচনের সময় রোগের এপিডেমিওলজি ও রোগীর সংখ্যা বিবেচনা করতে হবে

♦ কেবিন বা ঘরে প্রবেশের সময় পরিষ্কার অ-জীবাণুমুক্ত গ্লাভস পরিধান করতে হবে

♦ রোগীর সং ফিজিক্যাল কন্টাক্টে আসতে হলে রুমে প্রবেশের সময় একটি পরিষ্কার ও অ-জীবাণুমুক্ত গাউন পরিধান করতে হবে। 

২.২.    রোগীর প্লেসমেন্ট ও পরিবহণ
সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রনের জন্য রোগীর থাকার জায়গা এবং রোগী পরিবহণ পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংক্রমণ কমাতে হাতধোয়ার বেসিন, টয়লেট ও বাথরুমের সুবিধাসহ একক কক্ষে রোগীকে রাখা উত্তম। তবে কক্ষের অভাব বা অন্য কোন কারনে যদি তা সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে একই জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত একাধিক রোগীকে একটি রুম বা ওয়ার্ডে রাখা যেতে পারে। এধরনের সমন্বিত রুমে দুইজন রোগীর বিছানার মধ্যে ১-২ মিটার ফাঁকা রাখতে হবে। পাশপাশি সংক্রমিত রোগীর বেড, ওয়ার্ড এবং কক্ষসমূহ অন্যান্য রোগীর এলাকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা জরুরী। 
রোগী পরিবহনে অসতর্কতা থেকেও হাসপাতালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সংক্রমিত রোগী পরিবহনের সময় উপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। উদাহরনসরূপ বলা যায়, পালমোনারি যক্ষ্মা বা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পরিবহনের সময় রোগীকে মাস্ক পরিয়ে নেয়া এবং এ সকল রোগীদের পরিবহনের ক্ষেত্রে আলাদা হুইল চেয়ার, স্ট্রেচার, পেশেন্ট ট্রলি এবং লিফট ব্যবহার করা প্রয়োজন। 

২.৩.    পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা অনুশীলন (Environmental Management Practice)ঃ
রোগী ব্যবস্থাপনা ও সেবার জায়গাগুলো বেশিরভাগই ভেজা মোপিং দিয়ে পরিষ্কার করা উচিত। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য শুকনো ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করার অনুশীলন আদর্শ মানে উন্নীত নয়। মোপিংয়ে একটি নিরপেক্ষ ডিটারজেন্ট সলুশনের ব্যবহার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মানকে উন্নত করে। ৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতার জন্য খুব কার্যকরী। প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য উৎস খোঁজার প্রয়োজন না হলে পরিবেশের ব্যাকটেরিওলজিক্যাল পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। 
২.৪.    হাউসকিপিং বিভাগের যথাযথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনাঃ
হাসপাতালের পরিবেশগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা, দূষণ ও জীবাণুমুক্তকরনসহ সার্বিক সংক্রমণ রোধে হাউসকিপিং বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হাউসকিপিং বিভাগকে নি¤েœাক্ত পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে-
♦ হাসপাতালের সমস্ত এলাকা পরিষ্কার ও দুষণমুক্ত করতে একটি উপযুক্ত লিখিত সময়সূচী থাকতে হবে
♦ নিয়মিত পরিষ্কারের পদ্ধতি কার্যকর ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে
♦ ব্যবহার, কার্যকারিতা, গ্রহনযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং খরচের উপর ভিত্তি করে ক্লিনিং সামগ্রী নির্বাচন করতে হবে
♦ সমস্ত ক্লিনিং পণ্যগুলো হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে এবং তাদের গঝউঝ (গধঃবৎরধষ ঝধভবঃু উধঃধ ঝযববঃ) ভুক্ত হতে হবে
♦ রুম বা কেবিন পরিষ্কার করার সময় সকল কর্মীকে স্ট্যান্ডার্ড সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে 
♦ যেকোন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করার সময় হ্যান্ড গøাভস ব্যবহার করা উচিত। তবে পার্কিউটেনিয়াস আঘাতের উচ্চ ঝুঁকি থাকলে ডিসপোসেবল গøভস ব্যবহার না করে ভারী শুষ্ক গ্লাভস ব্যবহার করা যেতে পারে।
♦ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেডিউর অনুসরণ করে ম্যানেজার ও সুপারভাইজারঘণ সকল হাউসকিপিং কর্মীদের লিখিত মানদন্ড ব্যবহার করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের দক্ষতা মুল্যায়ন করতে হবে।
♦ সকল হাউসকিপিং ম্যানেজার ও সুপারভাইজারগণ যারা ক্লিনিং পণ্য নির্বাচন একটি জীবাণুনাশক পরিষ্কার ও একটি অ-জীবাণুনাশক পরিষ্কার এজেন্টের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে
♦ জীবাণুমুক্ত করার জন্য অ-গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্টগুলোতে উচ্চস্তরের জীবাণুনাশক বা তরল রাসায়নিক জীবাণুনাশক ব্যবহার করা যাবে না। 
♦ রুম বা কেবিনের সারফেস (মেঝে, দেয়াল, টেবিলটপ ইত্যাদি) সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে
♦ ক্লিনিং বা জীবাণুমুক্তকরণ পণ্য ব্যবহারে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরন করতে হবে
♦ বিভিন্ন হাউসকিপিং সল্যুশন কখনো একত্রে মিশ্রিত করা যাবে না
♦ কম স্পর্শ করতে হয় এমন সারফেসের তুলনায় ঘনঘন স্পর্শ করতে হয় (যেমন-দরজার নব, বিছানার রেলিং, বিদ্যুতের সুইজ, টয়লেটের আশেপাশের পৃষ্ঠগুলো) এমন সারফেসগুলো বেশি বেশি পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
♦ রোগী পরিচর্যার জায়গার দেয়াল, ভার্টিক্যাল ব্লাইন্ড, জানালার পর্দার কাপড় পরিষ্কার করা যখন তা দৃশ্যত ময়লা হয়ে যায়
♦ রোগীর পরিচর্যার জায়গায় কখনো জীবাণুনাশক ফগিং ব্যবহার করা যাবে না
♦ বড় সারফেস এরিয়া পরিষ্কারের যে সমস্ত পদ্ধতি রোগী পরিচর্যার জায়গায় এরোসোল বা ধূলোবালি ছড়িয়ে দেয় সমস্ত পদ্ধতি এড়িয়ে চলতে হবে
♦ মপ, কাপড় ও সল্যুশনের কার্যকর ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি অনুসরন করতে হবে
♦ প্রতিদিন বা প্রয়োজন অনুসারে ক্লিনিং সল্যুশন তৈরি করা এবং ঘন ঘন তাজা সল্যুশন ব্যবহার করা
♦ ক্লিনিং সল্যুশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবারই পরিষ্কার মপ ও কাপড় ব্যবহার করা 
♦ ব্যবহারের পরে মপ ও কাপড় পরিষ্কার করতে হবে এবং পুণঃব্যবহারের পূর্বে তা শুকিয়ে নিতে হবে অথবা ডিজপোসেবল মপ হেড ও কাপড় ব্যবহার করতে হবে
♦ মপ হেডগুলো প্রতিদিন লন্ড্রিতে পাঠানো উচিত

২.৫.    আইসিইউ, ওটি এবং আইসোলেশন রুমের পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণঃ
আইসিইউ এবং আইসোলেশন রুমে অবস্থানকারী রোগীদের সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। পাশপাশি ওটির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। তাই ওই বিশেষায়িত এলাকাগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জীবাণুমুক্তকরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইসিইউ, ওটি এবং আইসোলেশন রুমের পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণের জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো করা যেতে পারে-
♦ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মোপ দেয়া
♦ পরিষ্কার গরম পানি দিয়ে মেঝে, দেয়ালের সিলিং ধুয়ে ১০ মিনিটের জন্য রেখে দিতে হবে এবং শুকানোর সময় দিতে হবে
♦  ক্লিনিং এজেন্ট দিয়ে পানির সঠিক ঘনত্বের দ্রবন তৈরি করা এবং এক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক কোম্পানীর নির্দেশনাবলী অনুসরন করা
♦ মেঝে, দেয়াল, সিলিং ইত্যাদি কার্যকরীভাবে ঘষতে মপের পরিবর্তে হার্ড ব্রাশ ব্যবহার করা
♦ সারফেস জীবাণুনাশক দ্রবনে নরম কাপড় ভিজিয়ে বিছানা, আসবাবপত্র ও ফ্যান পরিষ্কার করা
♦ সরঞ্জামাদি যেমন ভেন্টিলেটর, মনিটর ইত্যাদি পরিষ্কার করতে সাবধানতা অবলম্বন করা
♦ ১৫-৩০ মিনিট রুম ও এর বিভিন্ন আসবাব ও সরঞ্জাম শুকানোর জন্য ছেড়ে দেয়া
♦ অন্য ঘরে বা রুমে যাওয়ার আগে পূর্বে ব্যবহৃত মপ, দ্রবন বাদ দিয়ে নতুন মপ ও দ্রবন ব্যবহার করা

২.৬.    হাউসকিপিংয়ের জন্য আইসিইউ পরিষ্কার করার প্রটোকলঃ
♦ প্রতিদিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তা সুপারভাইজারগণ পরিদর্শন করে নিশ্চিত করবেন এবং একটি পরিদর্শন লগবুক মেইনটেইন করবেন। জীবাণুনাশক দ্রবন পুণঃপ্রস্তুত করার বিষয় হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন।
♦ পর্যায়ক্রমিকভাবে সুপারভাইজারগণ ক্লিনিং কার্যক্রম পরিদর্শন করে লগবুকে স্বাক্ষর করবেন।
♦ একটি জীবাণুনাশক দিয়ে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ভেজা সোয়াবিং করতে হবে এবং সমস্ত আইসিইউ প্রতিদিন একবার ভ্যাকুয়াম করতে হবে।
♦ আইসিইউ’র সমস্ত সরঞ্জাম ও বেড- এর জন্য সপ্তাহান্তে কার্বনাইজেশন করতে হবে এবং প্রতিটি তারিখের স্টিকার সংযুক্ত করতে হবে।
♦ আইসিইউ’তে দর্শনার্থীর প্রবেশ সীমাবদ্ধ করতে হবে।

২.৭.    অপারেশন থিয়েটর (ওটি) এর আদর্শ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণঃ
হাসপাতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এরিয়া হচ্ছে অপারেশন থিয়েটার বা ওটি, যেখানে সার্জনগণ রোগীদের নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে সার্জারি করে থাকেন। সার্জারি বা ওটি এরিয়া হচ্ছে এমন একটি জায়গা যেখানে ডিজইনফেকশন বা স্টেরিলাইজেশনের বিষয়ে কোন আপোষ করার সুযোগ নেই। সার্জারিতে ব্যবহার পূর্ব ও পরবর্তী ওটি টেবিল, ইন্সট্রুমেন্ট ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি জীবাণুমুক্তকরণ হাসপাতালের অন্যতম মৌলিক কাজ। পাশাপাশি ওটি এরিয়া, পোস্ট অপারেটিভ এরিয়ার পরিবেশ ও সেবার উপর রোগীর পরবর্তী অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করে। একটি আদর্শ ওটি’র কিছু প্যারামিটার নি¤েœ উল্লেখ করা হলো- 
♦ ওটি’র প্রস্তাবিত আকার হচ্ছে ৬.৫ ী৬.৫ ী৩.৫ মিটার
♦ প্রতিটি ওটি’র দরজা স্প্রিং লোড ফ্ল্যাপ টাইপের হওয়া উচিত তবে ¯øাইডিং দরজাগুলোও পছন্দ করা হচ্ছে কারণ এতে কোন বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়না।
♦ সারফেস বা ফ্লোর হতে হবে ¯িøপ প্রতিরোধী, শক্তিশালী, দূর্ভেদ্য ও কম জোড়া সম্পন্ন। 
♦ ওটি রুমের তাপমাত্রা হবে ১৮-২৪ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড এবং আর্দ্রতা থাকতে হবে ৫০-৮০%। অপারেশন এরিয়া থেকে দূরে লুমিনার এয়ার ফ্লো বিশেষভাবে সহায়ক। 
♦ ওটি জীবাণুমুক্ত করতে সাধারণত ফরমালডিহাইড ফিউমিগেশন ব্যবহৃত হয়। ১০০০ ঘনফুট জায়গার জন্য ১ লিটার পানিতে ৫০০ মিলি ফরমালডিহাইড, ফরমালিন গরম করার জন্য চুলা বা হট প্লেট এবং ৩০০ মিলি ১০% অ্যামোনিয়া প্রয়োজন। সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে বাতাস বন্ধ রাখতে হবে এবং ফ্যান ও এসির সুইচ অফ করতে হবে। ফরমালিন দ্রবন ফুটিয়ে শুকাতে হবে। সরারাত ওটি বন্ধ রাখতে হবে। তবে ইদানিং বাজারে অত্যাধুনিক ফিউমিগেশন মেশিন পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে এক ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে একটি ওটি, কেবিন ইত্যাদি জায়গা ফিউমিগেট করা যায়। প্রতি সপ্তাহে একবার ফিউমিগেশন করা উচিত।  

২.৭.১.    ওটি ক্লিনিং, কার্বোনাইজেশন ও ফিউমিগেশনের প্রটোকলঃ
♦  প্রতিদিন সকালে প্রথম অপারেশনের পূর্বে ওটি ক্লিনিং ও কার্বোনাইজ করা।
♦ সমস্ত সরঞ্জাম (ইন্সট্রুমেন্ট), ওটি টেবিল, দেয়াল, মেঝে পরিস্কার ও কার্বোনাইজ করতে হবে।

২.৭.২.    কার্বোনাইজেশন পদ্ধতিঃ
১% হাইপোক্লোরাইড দ্রবন ব্যবহার করে কার্বোনাইজেশন করা হয়। ৪% সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দ্রবন বাজারে পাওয়া যায়। ৭৫০ মিলি পানির সাথে ২৫০ মিলি ৪% সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দ্রবন যুক্ত করলে ১% সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দ্রবন তৈরি হয়ে যায়।

২.৭.৩.    প্রতিটি অপারেশনের পরেঃ
♦ হাসপাতালের বর্জ্য নিষ্পত্তি প্রটোকল অনুযায়ী রঙিন কোডেড ব্যাগে বা বিনে লিলেন ও বর্জ্য সংগ্রহ করতে হবে।
♦ বর্জ্য নিষ্পত্তি প্রটোকল অনুযায়ী পৃথক রঙের কোডেড প্লাষ্টিক ব্যাগে ময়লা লিলেন সংগ্রহ করতে হবে।
♦ বর্জ্য নিষ্পত্তি প্রটোকল অনুযায়ী পৃথক রঙের কোডেড প্লাষ্টিক ব্যাগে শার্প ও স্পঞ্জ আলাদা সংগ্রহ করতে হবে।
♦ মেঝে ও অন্যান্য জায়গা থেকে ছিটকে পড়া রক্ত সরানোর পরে তা জীবাণুমুক্ত করে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।
♦ সব সরঞ্জামাদি কার্বোনাইজ করতে হবে।
♦ সংক্রমিত কেইস অপারেশনের পর আইসিসি বা বেসিলোসিড অনুমোদিত হাসপাতাল জীবাণুনাশক ম্যানুফেকচারারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্প্রে করতে হবে। 

২.৭.৪.    শেষ অপারেশনের পর:
♦ অপারেশনে ব্যবহৃত সব জিনিস ও সরঞ্জাম সরানোর পর ওটি এলাকা পরিষ্কার করতে হবে।
♦ ১ শতাংশ জীবাণু হাইপোক্লোরাইড দ্রবণ দিয়ে ফ্লোরে মপ দিতে হবে।
♦ ফ্লোরে মপ দেওয়ার পরে ওটির দেয়াল, টেবিল টপ, সরঞ্জাম কার্বোনাইজ করতে হবে।
♦ আইসিসি বা বেসিলোসিড অনুমোদিত হাসপাতাল জীবাণুনাশক ম্যানুফেকচারারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্প্রে করতে হবে।
♦ ওটির দায়িত্বে থাকা সিস্টার বা সুপারভাইজার দুটি অপারেশনের মধ্যে ওটিতে ব্যবহৃত জিনিসপত্র অপসারণ, পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের ব্যবধান নির্ধারণ করবেন। 

২.৮.    হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ: 
হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরাসরি সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাসপাতালের দৈনন্দিন কাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে বর্জ্য নিষ্পত্তি। বর্জ্য পৃথকীকরণ, সংগ্রহ, সঞ্চয়, পরিবহণ এবং নিষ্পত্তি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান লক্ষ্য হলো বিপজ্জনক উৎস (যেমন প্যাথজেন) এর ঝুঁকি হৃাস করা এবং রোগী, হেলথকেয়ার ওয়ার্কার ও পরিবেশে তাদের সংক্রমণ রোধ করা। স্বাস্থ্য পরিচর্যা বর্জ্যকে মেডিকেল, বায়োমেডিকেল বা হাসপাতাল বর্জ্যও বলা হয়ে থাকে। এই বর্জ্যগুলো সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে ১. ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য; ২. অঝুঁকি বা ঝুঁকিহীন বর্জ্য। যেসব বর্জ্য উৎস থেকে আসে, যা সংক্রমক, রাসায়নিক অথবা তেজক্রিয় এজেন্ট দ্বারা দূষিত হতে পারে, এসব হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য। আর যেসব বর্জ্য পদার্থ সাধারণ গার্হস্থ্য উপাদান দ্বারা গঠিত এবং সম্ভাব্য রাসায়নিক বা তেজক্রিয় ঝুঁকির প্রতিনিধিত্ব করে না, তা হচ্ছে অ-ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য। সংক্রামক বর্জ্য নানা ধরনের হতে পারে—
♦ রক্ত বা রক্তের উপাদান- তরল রক্ত, সিরাম, প্লাজমা ইত্যাদি
♦ প্যাথলজি বর্জ্য— ময়নাতদন্ত বা অস্ত্রোপচারের সময় সংগৃহীত প্লাসেন্টা, জরায়ু, শরীরের অঙ্গ, মানুষ বা প্রানীর টিস্যু ইত্যাদি
♦ মাইক্রোবায়োলজিক্যাল কালচার ও বর্জ্য
♦ শার্পস যেমন সুঁচ, ব্লেড, গ্লাস, পিপেট ইত্যাদি
♦ দূষিত আইটেম, যা রক্ত বা অন্যান্য সংক্রামক নির্গত করে। 

২.৮.১.    বর্জ্যের কনটেইনার ও স্টোরেজ
শার্প কন্টেনার অবশ্যই শক্ত, পাংচার ও লিক প্রুফ এবং বন্ধযোগ্য হতে হবে। সব সংক্রামক বর্জ্যের পাত্রে একটি বায়োহ্যাজার্ড লেবেল অথবা কালার কোড করতে হবে, যা হাসপাতালের কর্মীদের দ্ধারা শনাক্তযোগ্য। সংক্রামক বর্জ্য উৎপাদনের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা নিষ্পত্তি বা ট্রিটমেন্ট করতে হবে। সম্ভাব্য এক্সপোজারের ঝুঁকি কমাতে স্টোরেজের সময় কমিয়ে আনতে হবে এবং স্টোরেজ এলাকায় দৃশ্যমান বায়োহ্যাজার্ড চিহ্ন লাগিয়ে সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত করতে হবে।

২.৮.২.    গোল্ডেন রুলস ফর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট
হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তিনটি গোল্ডেন রুলস রয়েছে, যা হাউসকিপিং ম্যানেজার, সুপারভাইজার এবং কর্মীদের সার্বক্ষণিক মনে রাখতে হবে।
♦ হাসপাতাল বর্জ্য অন্য কোনো বর্জ্যের সঙ্গে মেশানো যাবেনা।
♦ হাসপাতাল বর্জ্য পরিবহণ, ট্রিটমেন্ট ও নিষ্পত্তির আগে সময়সূচি অনুযায়ী উৎস হতেই তা কালার কোড অনুযায়ী আলাদা পাত্রে বা ব্যাগে রাখতে হবে।
♦ ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময়ের জন্য অপরিশোধিত কোনো হাসপাতাল বর্জ্য সংরক্ষণ করা যাবে না।

২.৮.৩.    হাসপাতাল বর্জ্যের প্রকার ও কালার কোডেড বিনের ব্যবহারঃ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম একটি উপায় হচ্ছে বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী এসব আলাদা করা এবং কালার কোডেড বিনে রাখা। হাসপাতাল বর্জ্যের ধরন, এর সংরক্ষণ পাত্র ও উদাহরণ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো- 
বর্জ্যের প্রকার    পাত্রের রঙ বর্জ্যের উদাহরণ

সংক্রামক বর্জ্য    

হলুদ    সংক্রমিত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, প্লাস্টার
মানুষের শরীরের অঙ্গ, প্লাসেন্টা
সংক্রমিত স্যালাইন ব্যাগ, স্যালাইন সেট, সিরিঞ্জ, রক্ত সঞ্চালন ব্যাগ ও সেট, ব্যভহৃত ক্যাথেটর, ড্রেনেজ ব্যাগ টিউব, রাইস টিউব, ইউরিন ব্যাগ, ইউরিনাল, ডায়ালাইসিস বর্জ্য
ল্যাবরেটরির রক্তের স্যাম্পল, কালচার, কাশি, সিরাম, শরীরের লিকুইড, ব্যবহৃত গ্লাভস এবং
রোগীদের দ্বারা ব্যবহৃত টিস্যু ইত্যাদি

শার্প বা ধারালো বর্জ্য    
লাল    ব্যবহৃত সকল প্রকার সুঁই (পোঁড়া/ভাঙ্গা), ব্লেড, ভাঙা ¯øাইড, টেস্ট টিউব, শিশি, অ্যাম্পল, পিপেট, কভার ¯িøপ, জার
ব্যবহৃত অর্থোপেডিক যন্ত্রপাতি যেমন- পেরেক, স্ক্রু, ইস্পাত তার ও প্লেট
কাঁচি, ভাঙ্গা কাঁচ, ধারালো ধাতব বস্তু
পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বর্জ্য
বা
প্লাস্টিক বর্জ্য    
সবুজ    ব্যবহৃত অসংক্রামক প্লাস্টিক ও ধাতব পাত্র
অসংক্রামক শিশি, সিরিঞ্জ, স্যালাইন ব্যাগ
মিনারেল ওয়াটারের বোতল

সাধারণ বর্জ্য (অসংক্রামক)    
কালো    ব্যবহৃত কাগজ, খালিবক্স, কাপড়
খাদ্যের বর্জ্য যেমন ডিমের খোসা, রান্নাঘরের বর্জ্য, কাগজের বক্স, কার্টুন, পলিথিন ইত্যাদি।

৩.    একনজরে হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপসমূহ
♦ সংক্রামক এজেন্ট নির্মূল করা
♦ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা
♦ জলাধার নিয়ন্ত্রণ করা
♦ পোস্ট এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস (ব্যাধির আক্রমণ এড়ানোর জন্য চিকিৎসা)
♦ সংক্রমণের ওপর নজরদারি
♦ হাতধোঁয়া
♦ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা
♦ জীবাণুমুক্তকরণ (স্টেরিলাইজেশন)
♦ রোগীদের পৃথকীকরণ এবং বাধা বা বেরিয়ার সতর্কতা
♦ পিপিই এর ব্যবহার
♦ আইটেম ও সরঞ্জামের দূষণমুক্তকরণ (ডিকন্টামিনেশন)
♦ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের টিকাদান
♦ এন্টিবায়োটিকের বিচক্ষণ ব্যবহার
♦ পরিবেশ দূষণমুক্তকরণ
এখানে তিনটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে সংক্ষেপে বলা যায়—
স্টেরিলাইজেশন বা জীবাণুমুক্তকরন: স্টেরিলাইজেশন হচ্ছে একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে সব মাইক্রোবায়াল নির্মূল বা হত্যা করা হয় এবং এটি অনুজীব হত্যার সর্বোচ্চ স্তর। স্টেরিলাইজেশনের চারটি পদ্ধতি রয়েছে যেমন- অটোক্লেভ, ড্রাই হিট বা শুষ্কতাপ, রাসায়নিক স্টেরিলাইজেশন, বিকিরণ বা রেডিয়েশন। 
ডিজইনফেকশন বা জীবাণুমুক্তকরণ: ডিজইনফেকশন বলতে তরল রাসায়নিক ব্যবহার করে রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীবকে রুম টেমপারেচর বা ঘরের তাপমাত্রায় মেরে ফেলার পদ্ধতিকে বুঝায়।
পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুয়েপমেন্ট বা পিপিই এর ব্যবহার: পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুয়েপমেন্ট বা পিপিই এর ব্যবহার হচ্ছে সংক্রমণ প্রতিরোধী একটি কার্যকরী ব্যবস্থা। পিপিইসমূহের অন্যতম হচ্ছে- মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, গাউন, ক্যাপ, সুকভার, চোখের গগজ ইত্যাদি।
৪.    সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ:
হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন- রোগীদের নিম্নমানের জীবনযাপন, দারিদ্র্যতা, স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে দুর্বলতা, পুরনো ও সংকুচিত ক্লিনিক বা হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়, হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, সম্পদ, সরঞ্জাম ও সুবিধার অভাব, মেডিকেল ডিভাইসসমূহের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, দূষণমুক্তকরণ ও পুনর্ব্যবহার, স্বাস্থ্যকর্মীদের স্ট্যান্ডার্ড প্রিকুয়েশন সংক্রান্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ যেমন- হাতধোয়ার বিধি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার, শার্পস- লিলেন ও বর্জ্য পরিষ্কার ও দূষণমুক্তকরণ, উত্তম অনুশীলনসমূহ নির্ণয় ও বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণ, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের পদ্ধতি, পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা যেমন- দেয়াল, মেঝে, পৃষ্ঠ, পরীক্ষার বেড ও অন্যান্য আসবাবপত্র ইত্যাদি। উপরোক্ত চ্যালেঞ্জ ছাড়াও নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে মূলত চারটি প্রধান বাধা রয়েছে—
♦ আর্থিক সহায়তার অভাব
♦ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কর্মরত দক্ষ কর্মীদের অপর্যাপ্ত সংখ্যা
♦ হাসপাতালসমূহে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী 
♦ অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও সরবরাহ

৫.    সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন 
এপিডেমিলজিক্যাল সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ইন্টারভেনশন, হাসপাতালের সংক্রমণ উন্নয়ন মূল্যায়ন এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাসপাতালে একটি ‘সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ গঠন ও কার্যকর করা একান্ত প্রয়োজন। এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, হাসপাতাল লাইসেন্স প্রাপ্তির কিছু শর্তাবলির কারণে বিভিন্ন হাসপাতালে এ সংক্রান্ত একটি কাগুজে কমিটি থাকলেও বাস্তবে এই কমিটির কার্যকারিতা খুব কম হাসপাতালেই রয়েছে। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নার্স, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট, ডাক্তার এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত জনশক্তির সমন্বয়ে হাসপাতালে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। একটি আদর্শ ইনফেকশন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটি নিম্নোক্তভাবে গঠন হতে পারে—
♦ হাসপাতাল প্রশাসনের প্রতিনিধি
♦ সংক্রমক রোগ ও পেশাগত স্বাস্থ্য চিকিৎসকসহ প্রধান ক্লিনিক্যাল বিভাগের প্রতিনিধি
♦ নার্সিং সুপারিন্টেনডেন্ট/মেট্রন/নার্সদের প্রতিনিধি
♦ ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিস্ট
♦ ফার্মাসিস্ট
♦ সেন্ট্রাল স্টেরাইল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট (সিএসএসডি)-এর প্রকৌশলী/অপারেটর
♦ প্রকৌশলী (মেইনটেন্যান্স বিভাগ)
♦ হাউসকিপিং ইনচার্জ
♦ ট্রেনিং ইনচার্জ

৫.১. সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বা আইপিসি কমিটির দায়িত্বকর্তব্য
♦ এপিডেমিলজিক্যাল সার্ভিল্যান্স ডাটা পর্যালোচনা এবং ইন্টারভেনশনের জন্য এরিয়া চিহ্নিতকরণ
♦ সার্ভিল্যান্স ও প্রিভেনশনের জন্য একটি বার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও অনুমোদন করানো
♦ হাসপাতালের সবস্তরে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ উন্নয়ন মূল্যায়ন ও অগ্রসর করা
♦ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তায় কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা
♦ এপিডেমিক তদন্তে পর্যালোচনা ও ইনপুট প্রদান করা
♦ হাসপাতালের সামষ্টিক স্বার্থে অন্যান্য কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও সহযোগিতা করা 

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অংশ হচ্ছে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সঠিক মাত্রায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সফল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার পূর্বশর্ত। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনা এবং এর অনুশীলন নিয়ে বেশ আলোচনা থাকলেও হাসপাতালের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে খুব কম আলোচনাই ফোকাস পেয়েছে। ফলে এ দেশের হাসপাতালগুলো স্বাস্থ্যসেবার কতটুকু ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারছে তা অনেকাংশেই অস্পষ্ট। রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন— সেবা নিচ্ছেন, অনেকেই সুস্থ হচ্ছেন এসব দেখে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা বোকামি। বরং এসব ইতিবাচক আউটকামের পাশাপাশি হাসপাতালে কতজন রোগী সংক্রমিত হচ্ছেন, কতজন এর ফলে মারা যাচ্ছেন, কতজনকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, কি পরিমান রোগী দীর্ঘমেয়াদি ট্রমাতে পড়ছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের শতকরা কত অংশ এই সংক্রমনের শিকার হচ্ছেন, হাসপাতালের ক্যাচমেন্ট এরিয়াতে হাসপাতাল সংক্রমণের কোনো প্রভাব পড়ছে কিনা, এসব আলোচনা ও সার্ভিল্যান্সকেও সামনে আনতে হবে। তবেই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোর সেবা ব্যবস্থাপনার গুনগত মানের প্রকৃত মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। চিকিৎসাসেবার অন্যতম মাধ্যম হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনার মান যদি উন্নত করা না যায় এবং হাসপাতালে মানসম্মত সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকে, তবে এই হাসপাতালগুলোই দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল, স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এবং রোগী ও রোগীর এটেন্ডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সবার হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। 

লেখক: মুহাম্মদ জাকির হোসেন 
হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments