Thursday, May 23, 2024
spot_img
Homeজাতীয়স্বাগত ২০২৪: প্রত্যাশা আলোর দিশা

স্বাগত ২০২৪: প্রত্যাশা আলোর দিশা

২০২৪ এ নতুন আশা, নতুন প্রাণ, নতুন সুরে নতুন গান, নতুন জীবনের নতুন আলো, নতুন বছর কাটুক ভালো’ প্রত্যাশা দিয়ে শুরু হোক নতুন বছর। দেশের প্রতিটি প্রাণ নতুন বছরে নতুন সূর্যোদয়, নতুনভাবে প্রাণোচ্ছ্বল জীবনযাপন, নতুন প্রত্যয় নিয়ে নব আনন্দে জেগে উঠুক। ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে চলে এলো আরো একটি বছর। নতুন বছরের নতুন দিনে সবার জীবন উজ্জীবিত হোক নবযৌবনের মতো। কবির ভাষায় ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ¦রা/ অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা’র মতোই। বিদায়ী বছরের সব কষ্ট-যন্ত্রণা-অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে নতুন বছরে সর্বোত্রই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। বিদায় ২০২৩, স্বাগতম ২০২৪। নতুন বছরের প্রথম দিন অসীমের পানে মহাকালের যাত্রায় সূচিত হলো আরেকটি মাইলফলক। মহাকালের এই যাত্রায় একেকটি বছর এলো নতুন উদ্দীপনা ও প্রেরণা নিয়ে।

ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের পহেলা জানুয়ারি কুয়াশার চাদর ভেদ করে প্রকৃতির নিময়েই শীতের সকালে পূর্বাকাশে উঠেছে নতুন সূর্য। অতীতের হিংসা-বিদ্বেষ, অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সম্মিলনে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম দিন। গতকাল শনিবার সূর্যোস্তের মধ্য দিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে ২০২৩ সাল। স্বাগত ২০২৪। হ্যাপি নিউ ইয়ার (শুভ নববর্ষ)।

প্রশ্ন হচ্ছে কেমন কাটলো বিদায়ী বছরটি? ২০২৩ সাল হতে পারতো সম্ভবনার উজ্বল নক্ষত্রের বছর। পুনপ্রতিষ্ঠার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। যে উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই জনগণের ভোটের অধিকার পুন:প্রতিষ্ঠা হতে পারতো। কিন্তু দেশের মানুষের জন্য বছরটি ছিল ভয়ঙ্কর, বিভীষিকাময়, অনিশ্চয়তা, সংকট এবং অস্তিরতার বছর। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ মেগা প্রকল্পের নামে চোখ ধাঁধাঁনো উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নেমে গেছে তলানিতে। অনিয়ম, অনৈকতা এবং দুর্নীতি-লুটপাটের কারণে মানুষের মধ্যে ধনী-গরীবের বৈষম্য বেড়েছে। নানাবিধ সংকট তথা ডলার সংকট, ব্যাংকের প্রতি ভোক্তার আস্থাহীনতা, নানাবিধ সংশয়, অস্থিরতা, অঘটন, উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা, ভোগান্তি, মানবাধিকার নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিতর্ক, আতঙ্ক, অপ্রাপ্তির মধ্যদিয়ে কেটে গেছে বছরটি। জনগণের ভোটের অধিকার পুনপ্রতিষ্ঠায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করায় বছরের শেষ ৫ মাসে ৯২ মামলায় বিএনপির ১৫১২ জন নেতাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এসব বিচার, মামলা নিয়ে বিতর্ক আছে। এসব মামলার বেশির ভাগই ছিল গায়েবি; মামলা করেছে আইন শৃংখলা বাহিনী এবং স্বাক্ষীও দিয়েছেন তারাই। এমনকি অনেক মামলা শুনানি রাতেও করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে এ বছর রাজপথে নিহত হয়েছে ৪৫ জন আহত হয়েছে ৬৯৭৮ জন। কারাগারে মৃত্যু এবং সীমান্ত হত্যা বেড়েছে। বিজ্ঞজনদের ভাষায় ২০২৩ সাল ছিল জাতির জন্য অন্ধকারের বছর। প্রকৃতির নিয়মে প্রতিদিন সূর্য উঠেছে, সূর্য ডুবেছে, দিন-রাত অতিবাহিত হয়েছে; কিন্তু মানুষ অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। বিএনপির নেতাদের ভাষায় ২০২৩ সালের প্রতিটি রাত ছিল ‘এক একটি কালো রাত’। আইন শৃংখলা বাহিনীর গ্রেফতার ও নির্যাতন এড়াতে ঘর ছাড়তে হয়েছে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে, রাত কাটাতে হয়েছে বনে-জঙ্গলে ধান ক্ষেতে। বিএনপি নেতাদের ধরতে গিয়ে পুলিশ ভাইকে, মাকে বোনকে গ্রেফতার করেছে। স্বাধীনতার ৫২ বছরে ২০২৩ সালের মতো এতো অন্ধকার অধ্যায় অতিক্রম করতে হয়নি; সর্বমুখী সংকটে জাতিকে কখনো পড়তে হয়নি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইউক্রেন-রাশিয়া ও ইসরাইলের গাজা আক্রমণ নিয়ে ব্যাপক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছিল। কিন্তু গণতন্ত্র তথা মানবাধিকার, আইনের শাসন, জনগণের ভোটের অধিকার ইত্যাদি ইস্যুতে দেশকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। উগান্ডা, নাইজেরিয়া, জিম্বাবুয়ে, কম্বোডিয়ার মতো গরীব, গণতন্ত্রহীন নিম্নস্তরের দেশের কাতারে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম। জনগণের ভোটের অধিকার তথা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সব দলের অংশগ্রহণের শান্তিুপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ‘নতুন ভিসানীতি’ ঘোষণা করেছে। অতপর জো বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন এবং অধিকার রক্ষায় নতুন ‘শ্রমনীতি’ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে ২৭ দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, জাপানসহ প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশের জনগণের ভোটের অধিকার এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার দেয়ার দাবিতে সোচ্চার ভুমিকা পালন করেছে। তারা চায় বাংলাদেশে জনগণের ভোটের অধিকার। মূলত গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তিরোহিত হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার খড়গ মাথায় নিয়েই নতুন বছরে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ।

অপ্রিয় হলেও সত্য দেশে হারিয়ে গেছে মানুষের ভোটের অধিকার। ২০০৯ সালের পর মানুষ জাতীয় ও স্থানীয় কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। এই ১৪ বছরে প্রায় ৪ কোটি নতুন ভোটার হয়েছে; কিন্তু তারা কোনিদিনই ভোট দিতে পারেনি। ২০১৪ সালের (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন নির্বাচিত) ও ২০১৮ সালের (রাতের ব্যালটে সিল) দু’টি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের ঘা মাথায় নিয়েই ২০২৪ সালে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কেন্দ্র করে বছরজুড়ে রাজনীতি ছিল উত্তপ্ত। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউয়িন, যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে সারাবছর দৌঁড়ঝাপ করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এসব দাবি, পরামর্শ উপেক্ষা করে ডামি প্রার্থীর নির্বাচনের পথ বেঁছে নিয়েছে; যা নতুন বছরের ৭ জানুয়ারি হওয়ার কথা। একদিন আন্তর্জাতিক মহলকে ক্ষেপিয়ে তোলা অন্যদিকে দেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষের নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে উপেক্ষা; অন্যদিকে বছরজুড়ে ডলার সংকটে অর্থনীতির বিপর্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের ভোগান্তি, ভাড়া বৃদ্ধির নামে নৈরাজ্যকর পরিবহন খাত, পণ্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতিতে ভোক্তার নাভিশ্বাস, আইন শৃংখলা রক্ষার নামে আইন শৃংখলা বাহিনীর বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপর জুমুল-গ্রেফতার-নির্যাতন, মানবাধিকার নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে বিতর্ক অব্যহত ছিল। বছরজুড়ে একদিনে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে বাকযুদ্ধ বিতর্ক চলেছে; বিপরীতে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারণা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিয়োদগারও হয়েছে সমানতালে।

ক্যালেণ্ডারের পাতা থেকে বিদায় নেয়া ২০২৩ সালের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ বিশিষ্টজনরা বিভিন্নভাবে করছেন। বছরটি হতে পারতো পরিবর্তনের বছর, জনগণের ভোটের অধিকার পুনপ্রতিষ্ঠার বছর। কিন্তু সেটা হয়নি। বরং বছরের শেষ দিনগুলোতে রাজপথ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিন-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত, হরতাল অবরোধ ফিরে এসেছে। জনগণের ভোটের অধিকার কালোমেঘে ঢেকে গেছে। বছরজুড়েই রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সংকট নতুন বছরে অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতা ডেকে এনেছে। নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে মোটা দাগে বলা যায় বছরের শেষ দিকে রাজনীতিতে ‘অন্ধকার দিশা’য় নেতিবাচক আগামীর আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে কর্মজীবী মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশে গরিব যেমন বেড়েছে, তেমনি কোটিপতির সংখ্যাও বেড়েছে। ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বিদেশে টাকা পাচার বেড়েছে। মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশে বাড়ি বানানোর অবিশ্বাস্য খবর আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তদন্তে উঠে এসেছে। নির্বাচনে অংশ নেয়া নেতারা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হলফনামায় অর্থবিত্তের যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ৫ বছরে অনেকর অর্থ-সম্পাদ ৫০ গুন, একশ গুন এমনকি হাজারগুন বেড়ে গেছে।

সামজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে বছরজুড়ে ছিল সামাজিক অস্থিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, সরকারি ও বেসরকারি খাত, শিল্প-কারখানা,ক্ষুদ্র ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই কার্যত বছরজুড়ে ছিল অচলাবস্থা। ব্যাংক খাতে অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ বোধ করছেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা, ভিসানীতির ভীতি প্রশাসনে কর্মরত বিতর্কিত দলবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাঁপন ধরিয়েছে। ডলার সংকটে আমদানি-রফতানিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। কমে গেছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। গার্মেন্টসসহ শিল্প খাতের বহু শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। নতুন বেতনের দাবিতে আন্দোলনে শ্রমিক নিহত এবং সাড়ে ১২ হাজার টাকার নতুন বেতন কাঠামো প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কিছু কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে। নানা ঘটন-অঘটনের সাক্ষী ২০২৩ গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশীদের তৎপরতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউয়নভুক্ত দেশগুলোর পার্লামেন্টের বাংলাদেশের কিছু ব্যাক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং বাংলাদেশ উৎপাদিত গার্মেন্টস পণ্য ক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার দাবি তুলেছে। বিদায়ী বছরের শেষ দিনেও আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে অস্থিরতা, বিক্ষোভ, সহিংসতা, হামলা-মামলা গ্রেফতার, বিচারে বিএনপি নেতাদের কারাদণ্ড দেয়া অব্যাহত ছিল। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা ফের রাজনীতি মাঠে ফিরে আসার বছর। মানুষের অধিকার আদায়ে রাজনৈতিক দলগুলো একাট্ট হয়ে কর্মসূচি দেয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে বিএনপির নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক দল।

নতুন বছরে নতুন প্রত্যাশা থাকে নাগরিকের। বিগত বছরের সাফল্যতা-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ করে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের পরিক্রমা করতে হয়। প্রবাদে রয়েছে রাত যত অন্ধকার হয় ভোরের সূর্য্য ততই কাছে চলে আসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিছেছেন, ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়/ আড়ালে তার সূর্য হাসে/ হারা শশীর হারা হাসি/ অন্ধকারেই ফিরে আসে।’ নতুন বছরের নতুন সূর্য নতুন আলোর দিশা নিয়ে ফিরে আসবে সে প্রতিক্ষায় রয়েছে মানুষ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments