বিশ্বব্যাপী ২০২১ সালের জুনে প্রায় ৭৭ কোটি শিশু স্কুলে যাচ্ছিল না। তবে সেপ্টেম্বরে ১৪১টি দেশে স্কুল খুলে দেওয়ার কথা। ইউনেস্কো ২০২০ সালে ধারণা করেছিল, মহামারির কারণে প্রায় ২.৪ কোটি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ঝরে পড়বে। অনেক শিশু ফিরে আসবে না, কারণ এর মধ্যে তাদের বিয়ে হয়ে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, দূরবর্তী শিক্ষার পরিস্থিতিতে শিশুরা একাডেমিকভাবে পিছিয়ে পড়ে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষার পাশাপাশি অন্য আরও অনেক প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। ইউনিসেফের শিক্ষা বিভাগের প্রধান রবার্ট জেনকিন্স বলেছেন, বিদ্যালয়গুলো সব শেষে বন্ধ করা এবং সর্বপ্রথম খোলা উচিত। এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে বাবা-মা বাইরে গিয়ে স্টেক খেতে পারেন, কিন্তু তাদের সাত বছর বয়সি সন্তানকে স্কুলে যেতে দেন না! ডেনমার্কের প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০২০-এর এপ্রিলে আবারও চালু হলে কিছু অভিভাবক ভাবলেন তাদের সন্তানদের গিনিপিগ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যালয়ে সংক্রমণ বাইরের সম্প্রদায়ের তুলনায় তিন বা চারগুণ কম। নিউইয়র্ক ও সল্টলেক সিটির বিদ্যালয়ে আক্রমণের হার দেখা গেছে মাত্র ০.৫ থেকে ০.৭ শতাংশ। জার্মানি, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে পরোক্ষ সংক্রমণও কম।

ইউরোপের ১৭টি দেশেও দেখা গেছে, শিক্ষকদের মধ্যে সংক্রমণের হার কমিউনিটির অন্যদের তুলনায় বেশি নয়। তবে ইসরাইলের একটি স্কুলে সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল, যার কারণ ছিল শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে বসা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার এবং মাস্ক না পরা। হ্যাঁ, বিদ্যালয় খোলার পর যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ বাড়ছে। কিন্তু এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ঘটছে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোতে, যেখানে রিপাবলিকান গভর্নররা মাস্ক ও টিকা নিরুৎসাহিত করতে বেশি আগ্রহী। উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতেও সেই শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটছে, যাদের বাবা-মা মাস্ক পরতে এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে খুব আগ্রহী নয় অথবা শিশুদের মধ্যে অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী (কোমরবিড) রোগ আছে।

কিছু অজানা কারণে ১১ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে করোনায় মৃত্যু প্রায় নেই বলা চলে। শুরুতে মনে করা হয়েছিল, শরীরের যে কোষের মাধ্যমে সার্স-সিওভি-২ শরীরে ঢোকে তা শিশুদের মধ্যে কম। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কোষের প্রকাশ শিশুদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই। যেহেতু শরীরের চর্বির কোষগুলোর বাহ্যিক প্রকাশ ভাইরাসটিকে শরীরে ঢুকতে সাহায্য করে, তাই স্থূলকায় শিশুদেরও প্রাপ্তবয়স্কদের মতো করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

তবে শিশুদের সুরক্ষার হার বেশি হওয়ার কারণ হিসাবে মনে করা হয়-শিশুদের মধ্যে একটি সহজাত অনাক্রম্যতা রয়েছে এবং তাদের মধ্যে করোনাভাইরাসের অন্যান্য প্রজাতির সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বেশি, যা তাদের অধিকতর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদান করে এবং প্রাণঘাতী প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট থেকে সংক্রমণ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি সংক্রমণের একটি এখন ঘটছে তাদের মধ্যে। আমরা জানি, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার ৫ থেকে ১১ বছর বয়সি শিশুদের প্রায় দ্বিগুণ, লিঙ্গের হিসাবে যা প্রায় সমান সমান।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে করোনার কারণে অনেক শিক্ষক বা কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যেখানে টিকা দেওয়ার হার কম। এটি ঘটছে এজন্য যে, যখন শিশুরা সংক্রমিত হয়, তারা কদাচিৎ রোগের লক্ষণ বা প্রতিকূল ফলাফল প্রদর্শন করে; কিন্তু যখন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ হয়, বিশেষত যাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক (কোমরবিড) রোগ থাকে, তাদের কারও কারও মৃত্যু ঘটতে পারে।

এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয়-বয়সি শিশুদের মধ্যে কোভিড-১৯ নিয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি ছিল, নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি ছিল, অথবা মারা গেছে, তাদের মধ্যে যথাক্রমে ২৩, ৩৮ ও ৩৩ শতাংশের অন্তত একটি অন্তর্নিহিত অসুস্থ (কোমরবিড) অবস্থা বিদ্যমান ছিল (যেমন হাঁপানিসহ ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা ছিল ৭ শতাংশ; শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ১ শতাংশ; ০.৯ শতাংশ ছিল রোগ-প্রতিরোধের দুর্বলতা, ০.৮ শতাংশ বহুমূত্র; ০.৭ শতাংশ মানসিক রোগ; ০.৬ শতাংশ হৃদপিণ্ডের ও রক্তনালির রোগ এবং ০.৫ শতাংশ গুরুতর স্থূলতা। সামগ্রিকভাবে ২০২০-এর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে তথ্য তা হলো, করোনার কারণে মোট ১.২ শতাংশ বিদ্যালয়-বয়সি শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ০.১ শতাংশকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল এবং ০.০১ শতাংশেরও কম শিশু (১০ হাজারে একজন) করোনায় মারা গেছে; যা বৈশ্বিক গড় ২.০-এর চেয়ে অনেক কম।

যুক্তরাষ্ট্রে ৮ সেপ্টেম্বরের এক তথ্যসূত্রে জানা যায়, করোনায় মোট ৬,৪৩,৮৫৮ মৃত্যুর মধ্যে ০ থেকে ১৭ বছর বয়সির সংখ্যা ৪১২, যাদের মধ্যে ১৮৬ জন মেয়ে। অর্থাৎ প্রতি ১০ হাজারে মৃত ৬ জন। এ পার্থক্য সম্ভবত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণেই। যেহেতু ০ থেকে ১১ বছর বয়স পর্যন্ত মৃত্যু ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের মৃত্যুর অর্ধেক, সেই হিসাবে প্রতি ১০ হাজার মৃত্যুর মধ্যে ২ জন হলো ১১ বছর বয়সের নিচে আর ৪ জন ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশে করোনার কারণে গত ১৮ মাসে মোট ২৭ হাজার মৃত্যুর মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে, ৫টি মৃত্যু ১১ বছরের কম বয়সির মধ্যে (সাড়ে তিন মাসে একজন) এবং ১১টি মৃত্যু হয়েছে ১১ থেকে ১৮ বয়সিদের মধ্যে (পৌনে দুই মাসে একজন)। এটি অন্যান্য কারণে শিশু মৃত্যুর চেয়ে অনেক কম। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা কৃষ্ণকায় ও হিস্পানিকদের মধ্যে সর্বাধিক। এরপর মৃত্যু এশীয়দের মধ্যে বেশি এবং শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সবচেয়ে কম।

কোভিড-১৯ সম্পর্কিত বাংলাদেশের জাতীয় কারিগরি কমিটি কিছু ভালো সুপারিশ করেছে। যেমন-মাস্ক পরা (কীভাবে তিন স্তরবিশিষ্ট সুতির মাস্ক প্রস্তুত করা হয় সে বিষয়ে পরামর্শ দিলে আরও ভালো হতো); শারীরিক দূরত্ব, ভিড় ও সমাবেশ এড়ানো; বিদ্যালয় কর্মী ও শিক্ষকদের টিকা; কর্মী, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের দিকনির্দেশনা; ক্লাসে হাইব্রিড উপস্থিতি; পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা; পরিবারে সংক্রমণের অবস্থা এবং নির্বাচিত বিদ্যালয়গুলোতে পর্যবেক্ষণ ও দৈনিক স্কুলভিত্তিক প্রতিবেদন; প্রয়োজনে চিহ্নিতদের পৃথকীকরণ বা পরিবারের সদস্যদের থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করা ইত্যাদি।

কিন্তু যদি শিক্ষক ও কর্মীদের সংক্রমিত পাওয়া যায়, তবে বিদ্যালয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত তার পরামর্শ পাওয়া যায়নি। শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র ও বাসনপত্রের দৈনিক স্যানিটাইজেশন; মধ্যাহ্নভোজের আগে ও পরে দুই শিফটে স্কুল চালানোর বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে। একই বিছানা দুজন বা ততধিকের ব্যবহার এড়ানো ছাড়াও অন্যান্য আসবাবপত্রের বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। যে জনপদে করোনার প্রকোপ বেশি, শ্রেণিকক্ষ ছাড়াও সেখানকার ছাত্রাবাসগুলোতে মাস্কের ব্যবহার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে যোগ করা যেতে পারে (উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজ্যে এ ধরনের এলাকায় বাড়িতে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে)।

পরামর্শে যা বলা হয়নি, কিন্তু যা করা যেতে পারে তা হলো-যে জেলায় রোগ নজরদারির (সার্ভেইল্যান্স) সুবিধা নেই, সেখানে কমপক্ষে অ্যান্টিজেনভিত্তিক পরীক্ষা সম্প্রসারণ করা। পরামর্শে বলা হয়েছে, যেসব জায়গায় পরীক্ষার ইতিবাচকতা (পজিটিভিটি) ২০ শতাংশের বেশি বা যেখানে সাপ্তাহিক বৃদ্ধি ৩০ শতাংশ বা তার বেশি, সেখানে নজরদারি জোরদার করা উচিত; কিন্তু ১০০ ও ১৩০ এবং ৩,০০০ থেকে ৩,৯০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি যদিও হার অনুযায়ী একই; কিন্তু সংক্রমণের সম্ভাব্যতা অনুযায়ী সমান নয়।

বিদ্যালয়ভিত্তিক মনিটরিং টিম এবং দৈনিক রিপোর্টিং কীভাবে করা যায় সে বিষয়ে একটি পরামর্শ স্কুল ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক এ ধরনের কমিটির প্রধান হতে পারেন এবং প্রতিটি শ্রেণির একজন প্রতিনিধি এবং দুই থেকে তিনজন শিক্ষক ও কর্মচারী কমিটির সদস্য হতে পারেন। কমিটি ৫ বছর বয়সিদের মাস্ক না পরানোর পরামর্শ দিয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ। টিকার অনুমোদনের অপেক্ষা না করার মতোই তা সব দেশে মান্য করা হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্তুতিমূলক বিদ্যালয়ে মাস্ক এমনকি তিন বছর বয়সিদেরও পরানো হয়।

টিকার প্রথম ডোজ সামান্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। কিন্তু যারা কোমরবিড রোগে আক্রান্ত তাদের মধ্যে দুর্বল প্রতিরোধ মিউট্যান্টের/রূপান্তরের জন্ম দিতে পারে, তাই টিকার দুই ডোজ গ্রহণের পর দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রতিরোধ শক্তি পরীক্ষা করার পর তাদের বিদ্যালয়ে আসার অনুমতি দিতে হবে।

অন্য উপদেশগুলো হতে পারে-শ্রেণিকক্ষের জানালা ও দরজা বায়ু চলাচলের জন্য খোলা রাখা, যা বাতাসে ভাইরাসের ঘনত্ব হ্রাস করবে। কোন অবস্থায় বিদ্যালয় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তার একটা নীতি থাকা প্রয়োজন। একটা বিদ্যালয়কে কখন প্রাদুর্ভাবের শিকার ঘোষণা করা হবে, তার নীতি থাকা প্রয়োজন।

উদাহরণস্বরূপ, শিকাগোয় শুরুতে একটি বিদ্যালয়ে পাঁচটি সংক্রমণের ঘটনাকে প্রাদুর্ভাব বলা হয়েছিল, এখন এটিকে আরও কঠোর করার জন্য দুটি সংক্রমণকে প্রাদুর্ভাব বলা হচ্ছে। একটা বিদ্যালয়ে প্রাদুর্ভাব হলে সব বিদ্যালয় বন্ধ করতে হবে, এটি কোনো জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তাহলে তো বিদ্যালয়ে গমনকারী শিশুদের অভিভাবকদের ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ করতে হবে আগে।

উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের (কোমরবিড) বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখা; বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে দৈবচয়নের মাধ্যমে বায়ু পরীক্ষা করা; বিদ্যালয়ে সংক্রমণ ঘটলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে এবং শিশুদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে একটি সজ্ঞান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি ইত্যাদি দেশে ছয় মাসের বেশি বয়সি শিশুদের জন্য সিনোভ্যাকের টিকা পরীক্ষা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয়ের কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্য কোভিড-১৯ রোগের ঝুঁকি হ্রাস করার কৌশলগুলো একটি প্যাকেজের আকারে নিতে হবে।

আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন : চিকিৎসক ও গবেষক

English