চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭ দিনের বিশেষ লকডাউন

দেশের সীমান্তবর্তী ৭ জেলায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ চোখ রাঙাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সংক্রমণ পরিস্থিতি সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই জেলাতে সংক্রমণের হার ৫০ শতাংশের ওপরে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে- যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী ও সিলেট জেলাতেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর সঙ্গে ভারতে যাতায়াতের একটি সম্পর্ক থাকতে পারে।

একই কথা বলেছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। যাকে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগজনক বলছেন। এ ছাড়া দেশে ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, এর আগে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ হার ছিল ৩১ শতাংশ। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জে হঠাৎ সংক্রমণের হার ৫০ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার রাত ১২টা থেকে জেলায় সাত দিনের বিশেষ লকডাউন ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রেস ব্রিফিংকালে জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজ এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, লকডাউনের সময় জরুরি পরিষেবা ছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় আম বাজারজাত করা যাবে। জেলা পুলিশ সুপার এএইচএম আবদুর রকিব জানান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনকে সহায়তায় মাঠে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মঙ্গলবার থেকে জেলায় প্রবেশের সব পথ সিলগালা করা হবে, যাতে কেউ জেলায় প্রবেশ করতে এবং বাইরে যেতে না পারে। পাশাপাশি সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন মেনে চলতে বাধ্য করা হবে জনগণকে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঈদ উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেছেন। ফলে অচিরেই বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সংক্রমণ বাড়তে পারে। আমাদের আশঙ্কা ছিল ঈদের ছুটির পর সংক্রমণ বাড়বে, এখন সেটাই হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ অনেক বেড়েছে। যদিও সংক্রমণ কতটা বাড়বে তা বুঝতে হলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তাই বেশি করে পরীক্ষা, রোগীদের আইসোলেশন ও সংক্রমণ বেশি হলে দ্রুত এলাকাভিত্তিক লকডাউনের ওপর জোর তাগিদ দেন তারা।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিত্র বলছে, দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। আগেরদিন সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ হাজার ৬৮৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৪১ জন। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৮.১৫ শতাংশ। এর ১০ দিন আগে (ঈদের পরদিন) রোগী শনাক্তের হার ছিল ৬.৯৫ শতাংশ। শনাক্ত বাড়লেও গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু কমেছে। এদিন মারা গেছেন আরও ২৫ জন। এ নিয়ে নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫২১ জন হয়েছে। মোট মৃতের মোট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৪০১ জন।

এর আগে গত ২২ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাপ্তাহিক তুলনামূলক চিত্রের তথ্য বলছে, দেশে করোনা সংক্রমণের ৬৩তম সপ্তাহ (১৬ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত) শেষ হয়েছে। এই সপ্তাহে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ৬৬৯ জন, মারা গেছে ২৪৬ জন এবং সুস্থ হয়েছে ১৪ হাজার ৬০২ জন। এর আগের সপ্তাহে (৯ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ৬৬৯ জন, মারা গেছে ২৪৬ জন এবং সুস্থ হয়েছে ১৪ হাজার ৬০২ জন। অর্থাৎ দেশে এক সপ্তাহের ব্যবধানে করোনার নতুন রোগী শনাক্ত বেড়েছে ৩.৪০ শতাংশ। তবে মৃত্যু ৮.৯৪ শতাংশ এবং সুস্থতা ৪২.৭৩ শতাংশ কমেছে।

জানা গেছে, সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা থেকে জরুরি রোগী পার্শ্ববর্তী বড় জেলায় বা বিভাগীয় শহরে দ্রুত আনার প্রস্তুতি নিতে ইতোমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশে করোনার ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত রোগী বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে।

গত রবিবার অধিদপ্তরের অনলাইন বুলেটিনে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৯ জনের শরীরে করোনার ভারতীয় ধরন পাওয়া গেছে। জিনোম সিকোয়েন্সিং চলছে। আমরা মনে করি, সব ফলাফল হাতে এলে সংখ্যাটা বেড়ে যাবে। ভাইরাসটির ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই করোনা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষামূলক যেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হচ্ছে, ভারতীয় ধরনের ক্ষেত্রেও সেই ব্যবস্থাগুলোকে আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সঠিকভাবে মাস্ক পরতে হবে, অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়াসহ সব স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। প্রতিটি মানুষ যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে বিশ্বের কেউ নিরাপদ নয়। এই মহামারী থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্যবিধি মানার এবং সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ২৫ মৃত্যু, শনাক্ত ১৪৪১ : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ২৫ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে করোনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১২ হাজার ৪০১ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৪১ জন। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৭ হাজার ৬৮৩টি। এর মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৪১ জন। ২৪ ঘণ্টার নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। দেশে এখন পর্যন্ত ৫৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৯৫টি নমুনা পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫২১ জন। মোট নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ২৫ জন। এর মধ্যে ২১ জন পুরুষ এবং ৪ জন নারী। ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ১৩ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৭ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৪ জন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ১ জন রয়েছেন। মৃতদের অঞ্চল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ৬ জন, চট্টগ্রামে ৬, রাজশাহী ৩, খুলনায় ৭ ও রংপুরে ৩ জন রয়েছেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ৮৩৪ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৭১ জন, চট্টগ্রামে ২৪২, রংপুরে ৪৭, খুলনায় ৭৭, বরিশালে ৩৫, রাজশাহীতে ৯০, সিলেটে ৬১ ও ময়মনসিংহে ১১ জন রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English