Monday, December 6, 2021
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামসিসিইউ'তে খালেদা, 'আইসিইউ'তে নির্বাচন, 'লাইফ সাপোর্টে' গণতন্ত্র!

সিসিইউ’তে খালেদা, ‘আইসিইউ’তে নির্বাচন, ‘লাইফ সাপোর্টে’ গণতন্ত্র!

ড. মাহফুজ পারভেজ

তাৎপর্যপূর্ণভাবে গতকাল (১৪ নভেম্বর) বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে ‘সিসিইউ’তে নেওয়া হয়েছে আর সেদিনই নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, আইসিইউ’তে নির্বাচন, ‘লাইফ সাপোর্টে’ গণতন্ত্র। আপাত সম্পর্কহীন ও কাকতালীয় হলেও এসব কথাকে হাল্কা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এসব মন্তব্যে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক প্রবাহ সম্পর্কে একটি অসুখকর চিত্র উপস্থাপিত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

যদিও মাহবুব তালুকদারের এমন বক্তব্য কতটুকু বাস্তব- তা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেছেন, ‘মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য তথ্যভিত্তিক মনে হয় না। তিনি যে প্রেক্ষাপটে বক্তব্য রেখেছেন তার কোনো ভিত্তি নেই। মাহবুব তালুকদার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন রেখেছেন।’

বাংলাদেশে জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে শুধু নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই নয়, দেশ-বিদেশের নানা ফোরামেও প্রায়শই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করে জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে মর্মে বিএনপিসহ অনেক বিরোধী দলের লাগাতার অভিযোগও শোনা যায়। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থার অনুপস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে অনেক দলই হরহামেশা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার অভিপ্রায় জানায় এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে।

সাম্প্রতিক চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংঘাত সহিংসতার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে।অনিয়ম ও সহিংসতা রোধে দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতি রয়েছে বলেও মনে করেন তারা। তারা বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য এখন সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এই ‘সব পক্ষের’ মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক দলগুলো। অতি স্বল্প সংখ্যক কতিপয় স্বতন্ত্র প্রার্থীকে বাদ দিলে রাজনৈতিক দলগুলোই নির্বাচনের মূল চালিকা শক্তি। তারাই নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাকে সচল ও গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখে।

কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সুসম্পর্ক ও সমঝোতা অতি ভঙ্গুর একটি বিষয়। রাজনৈতিক বিতর্ক ও ইস্যুতে তাদের মধ্যে একমত বা সহমত হওয়ার দৃষ্টান্ত অত্যল্প। বরং দূরত্ব ও অবিশ্বাসই অধিক। যে কারণে একদা  নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের আন্দোলন হয়েছিল এবং এরই ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব ও অবিশ্বাস অতীতের মতো বর্তমানেও চলমান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী শক্তি ও তার সমমনা দলগুলো নির্বাচনে যাবে না বলে বলছে। আবার আওয়ামী লীগও বিএনপি ‘এলো না গেলো’ তা গ্রাহ্য করছে না। আওয়ামী লীগ নাকি দেউলিয়া হয়ে গেছে, বিএনপি নেতারা এমন মন্তব্য করছেন। আর ‘ বিএনপি নেতাদের এমন বক্তব্য জনগণের মধ্যে বিনোদনের উৎসে পরিণত হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ‘যারা নিজেরা দেউলিয়া হয়ে এখন সর্বহারাতে রূপ নিতে যাচ্ছে তারা অন্যদের নিয়ে কথা বলা হাস্যকর’ উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বিএনপিই এখন দেউলিয়া হয়ে গেছে।’

এইসব তর্ক-বিতর্ক ও বক্তব্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও পারস্পরিক আস্থাহীনতার প্রমাণবহ। ফলে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য এখন সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে’ মর্মে যে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের যে বক্তব্য ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে, তাকে শুধু চমক কিংবা রূঢ় সত্য বা তথ্যভিত্তিক নয় বললেই সব বিতর্ক শেষ হয়ে যায় না। বরং নির্বাচন ব্যবস্থা বিষয়ক বিতর্ক চাঙ্গা হয়ে সামনে চলে আসে। তিনি বলেন যে, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ যতই ফুরিয়ে আসছে, নির্বাচন ব্যবস্থা ও অবস্থা দেখে ততই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন এখন আইসিইউ-তে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গণতন্ত্র এখন লাইফ সাপোর্টে। দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু মনোভাব গণতন্ত্রকে অন্তিম অবস্থায় নিয়ে গেছে। খেলায় যেমন পক্ষ-বিপক্ষের প্রয়োজন হয়, তেমনি একপক্ষীয় কোনো গণতন্ত্র হয় না। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনো মূল্যে গণতন্ত্রকে আমরা লাইফ সাপোর্ট থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চাই। এজন্য দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এই সংকট নিরসনে সকল দলের সমঝোতা অপরিহার্য।’

মাহবুব তালুকদারও মোদ্দা কথায় বলেছেন যে, ‘দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু মনোভাব গণতন্ত্রকে অন্তিম অবস্থায় নিয়ে গেছে। এই সংকট নিরসনে সকল দলের সমঝোতা অপরিহার্য।’ কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষায় ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে সমুন্নত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য ও সমঝোতা কখন এবং কীভাবে হবে? অবিশ্বাস ও দূরত্বে ভরা বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলমান সঙ্কট সমাধানে আদৌ কোনও আশার আলো দেখাতে পারছে না।

এমতাবস্থায় বরং আরও সমস্যা ও সঙ্কটের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন মানবজমিনকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে এখন নির্বাচন এরকমই হবে। বিরোধী দল থাকুক বা না থাকুক, সরকারি দলের মধ্যেই মারামারি হবে। আরও হবে। ইউনিয়ন পরিষদে মাত্র দ্বিতীয় ধাপ গেছে। এরপর যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, এমপিরা যখন নমিনেশন পাবে তখন আরও মারামারি হবে। আমাদের ইলেকশন কমিশন কিছু করতে পারবে না। করার কোনো মুরোদ নেই।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বলেছেন, ‘নির্বাচনে যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার তার অভাব রয়েছে। নির্বাচন কমিশন, সরকার, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং যারা নির্বাচন করছেন তারা যদি না চায় যে নির্বাচনকে আমরা অবাধ, সুষ্ঠু করবো তাহলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্নভাবে পক্ষপাতিত্ব।’

আইসিইউ’তে নির্বাচন কিংবা প্রকৃত নির্বাচন নিয়ে ‘সন্দেহ’ অথবা ‘লাইফ সাপোর্টে’ গণতন্ত্র কোনও দেশের কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য মোটেও সুখকর নয়।  এইসব সংকট নিরসনে সকল দলের সমঝোতা না হওয়াও আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়। ফলে ‘সুখকর নয়’ ও ‘কাঙ্ক্ষিত নয়’, এমন বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়া জরুরি। নচেৎ এইসব বিদ্যমান সমস্যা গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্কটকে তীব্র করে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিপদই বাড়াবে। 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments