Wednesday, July 17, 2024
spot_img
Homeধর্মসাহাবিদের সময় মিথ্যা ছিল না

সাহাবিদের সময় মিথ্যা ছিল না

আরবজাতির স্মৃতিশক্তির প্রখরতা সবার কাছে প্রসিদ্ধ ও সর্বজনবিদিত। তারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের জীবনবৃত্তান্তসহ বিস্তারিত বংশতালিকা পূর্ণাঙ্গ মুখস্থ রাখত। এমনকি তাদের ঘোড়া ও উটগুলোর বংশতালিকাও মুখস্থ রাখত। বিভিন্ন কবির হাজারও কবিতা একেকজনের কণ্ঠস্থ ছিল।

আরবদের নিজেদের স্মৃতিশক্তির এতটাই গর্ব ছিল যে অনেক কবি তাঁদের কবিতাকে লিখে রাখাকে দোষণীয় মনে করতেন। কেউ কেউ লিখে রাখলেও এতে নিজের স্মৃতিশক্তির ত্রুটি প্রকাশের ভয়ে তা লুকিয়ে রাখতেন। (আল-আগানি ৬/৬১)

সাহাবিরা একে অন্যকে বিশ্বাস করতেন, তাঁদের সময় মিথ্যা ছিল না। উপস্থিত সাহাবি থেকে অনুপস্থিত সাহাবি পূর্ণ আস্থার সঙ্গে দ্বিন গ্রহণ করতেন। বারা ইবন আজেব (রা.) বলেন, আমাদের প্রত্যেকে রাসুল (সা.) থেকে হাদিস শ্রবণ করত না, আমাদের জায়গা-জমি ও ব্যস্ততা ছিল। তবে তখন মানুষ মিথ্যা বলত না, উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে বর্ণনা করত। (আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃষ্ঠা ২৩৫)

আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, ‘তোমাদের আমরা যা বলি, তা সব রাসুল (সা.) থেকে শ্রবণ করিনি, তবে আমাদের কতক কতককে বলত, কেউ কাউকে অপবাদ দিত না। ’ (আত-তাবকাত লি ইবন সাদ : ৭/২১)

সাহাবিরা যেরূপ পরস্পর মিথ্যা বলেনি, অনুরূপ তাবেঈনদের সঙ্গেও তারা মিথ্যা বলেনি। ইমাম বুখারি (রহ.) নিজ সনদে আবদুল্লাহ ইবন ইয়াজিদ খাতমি (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদের বারা ইবন আজেব (রা.) বলেছেন, আর তিনি মিথ্যাবাদী নয়, তিনি বলেছেন, আমরা নবী করিম (সা.)-এর পেছনে সালাত আদায় করতাম, যখন তিনি বলতেন : ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ আমাদের কেউ নিজের পিঠ নিচু করত না, যতক্ষণ না তিনি নিজ কপাল মাটিতে রাখতেন। ’ (বুখারি, হাদিস : ৮১১)

এখানে তাবেঈন আবদুল্লাহ ইবন ইয়াজিদ খাতমি (রহ.) সাহাবি বারা ইবন আজেব (রা.) সম্পর্কে বলেছেন: ‘তিনি মিথ্যাবাদী নন। ’ তাঁর এ কথার অর্থ সন্দেহ দূর করা নয়; বরং হাদিস শক্তিশালী করা ও সাহাবির সত্যায়ন করা। ইমাম খাত্তাবি (রহ.) বলেন, এ কথার অর্থ রাবিকে অপবাদ দেওয়া নয়, বরং বক্তার কথায় পূর্ণ আস্থা প্রকাশের জন্য আরবরা এরূপ বলে, যেমন আবু হুরায়রা (রা.) বলতেন : ‘আমি আমার সত্যবাদী ও সত্যায়িত বন্ধুকে বলতে শুনেছি। ’ ইবন মাসউদ (রা.) বলতেন : ‘সত্যবাদী ও সত্যায়িত সত্তা আমাকে বলেছেন। ’ এসব বাক্য দ্বারা সাহাবিরা যেভাবে নবী (সা.)-এর প্রতি আস্থা পোষণ করেছেন, একইভাবে তাবেঈনরা সাহাবিদের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেছেন, সন্দেহ দূর করার জন্য তা বলেননি; কারণ তারা সন্দেহ করতেন না।

নবী (সা.)-এর যুগে মুসলিম ও অমুসলিম কারো মাঝে মিথ্যার প্রচলন ছিল না, তবু মিথ্যা হাদিস রচনাকারীর জন্য নবী (সা.) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বক্তার সংবাদ গ্রহণ করার আগে আল্লাহ শ্রোতাদের যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই সাহাবিদের যুগে নবী (সা.)-এর বাণীতে কোনো ধরনের বৃদ্ধি ঘটেনি।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা তাঁদের অনন্য স্মৃতিশক্তি কোরআন ও হাদিস মুখস্থ করার কাজে লাগিয়েছিলেন, যাঁদের অন্তরে এ কথা বদ্ধমূল ছিল যে কোরআনের পরে হাদিসই হলো শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস।

নিচের ঘটনাটির দ্বারা সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতিশক্তির প্রখরতার একটি অনুমান করা যায় :  একবার মদিনার গভর্নর মারওয়ান আবু হুরায়রা (রা.), যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে ৫৩৭৪টি হাদিস বর্ণনা করেছিলেন, তাঁকে না জানিয়ে তাঁর স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাঁকে স্বীয় ঘরে দাওয়াত করেন। অতঃপর তাঁকে কিছু হাদিস শোনানোর জন্য আরজ করেন। মারওয়ান আগেই একজন লেখককে পর্দার আড়ালে আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসগুলো লেখার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। আবু হুরায়রা (রা.) বেশ কিছু হাদিস শোনালেন এবং লেখক তা লিখে রাখল। এক বছর পর আবার গভর্নর মারওয়ান আবু হুরায়রা (রা.)-কে দাওয়াত করেন এবং গত বছর বর্ণনাকৃত হাদিসগুলো পুনরায় শোনানোর জন্য আরজ করেন। আর এদিকে পূর্বের মতো এবারও ওই লেখককে আড়ালে থেকে গত বছর লিখিত হাদিসগুলোর সঙ্গে মেলাতে দায়িত্ব দিয়ে রাখলেন। আবু হুরায়রা (রা.) আগে বর্ণিত হাদিসগুলোই শোনাতে লাগলেন এবং লেখক আড়াল থেকে মেলাতে থাকল। শেষে দেখা গেল যে গত বছর বর্ণিত হাদিসগুলোয় কোনো বেশকম ও আগপিছ ছাড়া সম্পূর্ণটাই তিনি শুনিয়ে দিলেন। (তারিখে দিমাশক, ইবনে আসাকির ২০/৮৯, সিয়ারু আলমিন নুবালা ২/৫৯৮)

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments