Tuesday, May 17, 2022
spot_img
Homeধর্মসাআদ ইবনে উবাদাহ (রা.): বেশির ভাগ যুদ্ধে যাঁর হাতে ইসলামের পতাকা ছিল

সাআদ ইবনে উবাদাহ (রা.): বেশির ভাগ যুদ্ধে যাঁর হাতে ইসলামের পতাকা ছিল

সাআদ ইবনে উবাদাহ (রা.) ছিলেন মদিনার বিখ্যাত খাজরাজ গোত্রের বনু সাইদাহ শাখার সন্তান এবং কিংবদন্তি নেতা ও বাইআতুল আকাবায় রাসুল (সা.) কর্তৃক মনোনীত নাকিব। তিনি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সব যুদ্ধে শরিক ছিলেন। আর সব যুদ্ধে আনসারদের পতাকা ছিল তাঁর হাতে। (আল-ইসতিআব ২/৫৯৪)

সাআদ (রা.) দাদা দুলাইম ছিলেন খাজরাজ গোত্রের সবচেয়ে বড় নেতা। মদিনার জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল। তবে তিনি ছিলেন পৌত্তলিক। সাআদ (রা.)-এর পিতা উবাদাহ ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তসূরি। পিতার মতো একইভাবে জীবন কাটিয়ে ছেলে সাআদের জন্য ক্ষমতা ও নেতৃত্বের আসন প্রতিষ্ঠিত করেন। সাআদ জাহেলি যুগেই কামিল (যথাযোগ্য) উপাধি লাভ করেন। তাঁর আরবি লেখা ছিল সুন্দর, চমৎকার। তিনি ছিলেন আরবসমাজের একজন শ্রেষ্ঠ সাঁতারু ও দক্ষ তীরন্দাজ। (আল-ইসতিআব ২/৫৯৫; উসদুল গাবাহ ২/২০৫)

হিজরতের এক বছর আগে নবুয়তের ত্রয়োদশ বছর আকাবার শেষ বাইআতের সময় সাআদ ইবনে উবাদাহ ইসলাম গ্রহণ করেন।

যুদ্ধ-জিহাদে বলিষ্ঠ ভূমিকা

উহুদ যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুজাহিদিনরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে কয়েকজন সাহাবি জীবন বাজি রেখে রাসুল (সা.)-কে কাফিরদের হামলা থেকে রক্ষা করেন। তাঁদের মধ্যে সাআদ (রা.)ও একজন। খন্দক যুদ্ধে আনসারদের ঝাণ্ডা, খাইবার যুদ্ধে তিনটি ঝাণ্ডার একটি ঝাণ্ডা, মক্কা বিজয়ের দিন খোদ রাসুল (সা.)-এর ঝাণ্ডাটি এবং হুনাইন যুদ্ধে খাজরাজ গোত্রের ঝাণ্ডা তাঁর হাতে ছিল। মোট কথা, রাসুল (সা.)-এর ওফাত পর্যন্ত ছোট-বড় প্রায় সব অভিযানে ছিল তাঁর অংশগ্রহণ এবং ছিলেন আনসারদের ঝাণ্ডাবাহী। মদিনার ইহুদি গোত্র বনু নজিরের অবরোধকালে তিনি নিজ খরচে মুজাহিদিনের মাঝে খেজুর বণ্টন করেন। অনুরূপভাবে বনু কুরাইজার অবরোধকালে রসদপত্র সরবরাহ করেন। ষষ্ঠ হিজরি সনে রাসুল (সা.) গাবা অভিযানে যাওয়ার সময় সাআদকে ৩০০ সদস্যের একটি বাহিনীর আমির বানিয়ে মদিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে রেখে যান। তিনি সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। তা ছাড়া রাসুল (সা.) যখন ‘জিকারাদ’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন, তখন সাহায্যের জন্য মদিনায় খবর পাঠান। সাআদ ১০টি উট বোঝাই করে খেজুর পাঠান। রাসুল (সা.)-এর এই বাহিনীতে সাআদ (রা.)-এর ছেলে ‘কায়স (রা.) ছিলেন একজন অশ্বারোহী সৈনিক। তিনি পিতার প্রেরিত উট ও খেজুর রাসুল (সা.)-এর নিকট পেশ করলে রাসুল (সা.) ইরশাদ করলেন, কায়স, তোমার পিতা তোমাকে অশ্বারোহী সৈনিকরূপে পাঠিয়েছে, মুজাহিদিনের সাহায্যে পাঠিয়েছে এবং নিজে মদিনাকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পাহারা দিচ্ছে। অতঃপর দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, সাআদ ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহম করুন! সাআদ ইবনে উবাদাহ কতই না ভালো মানুষ।

সাদের হাত থেকে পতাকার পালা-পরিবর্তন!

মক্কা বিজয়ের দিনও আনসারদের পতাকা ছিল সাআদ (রা.)-এর হাতে। সেদিন তিনি আবু সুফিয়ানের কাছাকাছি এসে তাঁকে লক্ষ্য করে চিৎকার দিয়ে বলেন, “আজ তুমুল যুদ্ধ হবে। আজ ‘হারাম’ (কাবা-চত্বর ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চল) হালাল (রক্তপাত বৈধ) হয়ে যাবে। আজ কুরাইশরা লাঞ্ছিত হবে।”

উল্লেখ্য, আবু সুফিয়ান (রা.)-এর আগে মুসলমান হয়ে গেছেন। সাআদ (রা.)-এর এমন হুংকারে আবু সুফিয়ান (রা.) ভয় পেয়ে গেলেন। বিষয়টি রাসুল (সা.)-কে জানালেন। জনৈক মুহাজির রাসুল (সা.)-এর কাছে আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, না-জানি সাআদ প্রতিশোধস্পৃহায় কী করে বসে! তাই আপনি তার কাছ থেকে পতাকাটি নিয়ে নিন। রাসুল (সা.) তাত্ক্ষণিক আলী (রা.)-কে বলেন, জলদি যাও! সাদের হাত থেকে পতাকাটি নিয়ে তার ছেলে কায়েসের হাতে দাও। আলী (রা.) তা-ই করলেন। কিন্তু যে আশঙ্কা সাদের ক্ষেত্রে ছিল, সে একই আশঙ্কা দেখা দিল তাঁর ছেলের ক্ষেত্রেও। তখন রাসুল (সা.) পতাকাটি কায়েসের হাত থেকে নিয়ে জুবাইর ইবনে আউওয়াম (রা.)-এর হাতে দিলেন।

সাকিফায়ে বনি সাইদাহ

সাআদ ইবনে উবাদাহ (রা.)-এর বাড়ি ছিল মদিনার বাজারসংলগ্ন। তাঁর ঘরের সঙ্গেই ছিল খাজরাজ গোত্রের সাইদাহ শাখার মানুষের মালিকানার একটি সাউনি, যা সাকিফায়ে বনি সাইদাহ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। তা আনসারদের পরামর্শগৃহ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর খলিফা নির্বাচনের জন্য সাহাবায়ে কেরাম এখানেই জমায়েত হয়েছিলেন এবং আবু বকর (রা.)-কে খলিফা নিযুক্ত করেছিলেন। ওই পরামর্শসভায় সাআদ (রা.) আনসারদের মর্যাদা, অবদান ও রাসুল (সা.)-এর সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদির দিক তুলে ধরে এক সারগর্ভ ভাষণ দিয়েছেন।

খলিফা নির্বাচন বিষয়ে সেদিন আনসার-মুহাজিরদের মধ্যে কিছুটা মতানৈক্য হয়েছিল। আবু বকর (রা.) হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ এক ভাষণ শেষে খলিফা নির্বাচনের জন্য প্রস্তাব করলেন ওমর (রা.) ও আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রা.)-এর নাম। পাল্টা প্রস্তাব এলো আনসার ও মুহাজিরদের পৃথক পৃথক খলিফা নির্বাচনের। এ নিয়ে শুরু হলো শোরগোল। তখন ওমর (রা.) এই মতানৈক্যের অশুভ পরিণতি আশঙ্কাবোধ করে তাত্ক্ষণিক আবু বকর (রা.)-কে বলেন, আপনি হাত দিন! আমরা আপনার হাতেই বাইআত হচ্ছি। এই বলে তিনি বাইআত হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে মুহাজিররা বাইআত হলেন। অতঃপর আনসাররাও বাইআত হয়ে গেলেন।

ওমর (রা.)-এর খেলাফতের প্রথম দিকে সাআদ (রা.) মদিনা থেকে সিরিয়া চলে যান। সেখানে রাজধানী দামেশকের নিকটবর্তী হাওরান নামক স্থানে আমরণ বসবাস করেন। (আত-তাবাকাতুল কুবরা ৭/২৭৪; আল-ইসতিআব ২/৫৯৯)

সাআদ ইবনে উবাদাহ (রা.) ১৫ হিজরি সনে ওমর (রা.)-এর খেলাফতের দুই বছর ছয় মাসের মাথায় দামেশকের হাওরানে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments