Tuesday, May 17, 2022
spot_img
Homeলাইফস্টাইলসর্বত্র ঢিলেঢালা স্বাস্থ্যবিধি, লাগামহীন সংক্রমণ

সর্বত্র ঢিলেঢালা স্বাস্থ্যবিধি, লাগামহীন সংক্রমণ

দেশে করোনার ধরন ডেল্টা ও সুপার ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের দাপটে সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে। টানা চার দিন শনাক্ত রোগী ১৫ হাজারের ওপরে রয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ (ছয় দিন) ধরে রোগী শনাক্তের হার ৩০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

এই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৩ দশমিক ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশে করোনা শনাক্তের পর থেকে এটিই একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্তের হারের রেকর্ড। এর আগে ডেল্টা ধরনে গত বছরের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময়েও এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।

এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সর্বত্র ঢিলেঢালা স্বাস্থ্যবিধির কারণেই মূলত এই মুহূর্তে সংক্রমণ এক রকম লাগামহীন হয়ে পড়েছে। ওমিক্রনে মৃত্যুঝুঁকি ডেল্টার তুলনায় কম হওয়ায় সর্বত্রই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ কার্যকরভাবে বাস্তাবায়নের তাগিদ দেন তারা।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৪৬ হাজার ২৬৮টি নমুনা পরীক্ষায় ১৫ হাজার ৪৪০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এর আগে ২০২১ সালের ১৪ জুলাই শনাক্তের হার ছিল ৩২ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা এতদিন সর্বোচ্চ ছিল।

যদিও মহামারির শুরুতে ২০২০ সালের ৮ মার্চ যখন প্রথম দেশে করোনা রোগী ধরা পড়ে, সেদিন ৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩ জনের করোনা শনাক্তের কথা জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শনাক্তের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। তবে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কম হওয়ায় সেটি রেকর্ডে ধরা হয়নি।

ইউজিসি অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, এই মুহূর্তে যে হারে করোনা বাড়ছে, তার মূল কারণ হলো জনগণের স্বাস্থ্যবিধি না মানা। এ ব্যপারে একেবারেই গাছাড়া ভাব সবার। আবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিধিনিষেধ দেওয়া হলেও তা মানানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেই। সবাই যে যার মতো করে চলছে।

তিনি বলেন, আমরা বারবার বলছি, নিজেদের সুরক্ষা নিজেদের কাছেই। কিন্তু সেটা কেউ মনে করছে না। এখন আবার বলব, মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মানা উচিত। এটি জনগণের নাগরিক দায়িত্ব। এতে ব্যক্তি নিজে, পরিবার ও সমাজ সবাই ভালো থাকবে। আর না মানলে সরকারের উচিত এটি বাস্তবায়নে বাধ্য করা। অন্ততপক্ষে সবাই যেন সঠিক নিয়মে মাস্ক পরে সেটি নিশ্চিত করা। না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। পাশাপাশি যারা টিকা নেননি তারা যেন দ্রুত টিকা নেন। স্বাস্থ্য বিভাগ সেটা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। মনে রাখতে হবে করোনা থেকে বাঁচতে হলে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন ও টিকা নেওয়া-এই দুটি হলো একমাত্র পথ।

শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো করোনাবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মহামারি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগে গত মঙ্গলবার ১৬ হাজার ৬৬ জন রোগী শনাক্তের খবর এসেছিল। যা মহামারির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বুধবার ১৫ হাজার ৫২৭ জন এবং বৃহস্পতিবার ১৫ হাজার ৮০৭ জনের শনাক্তের খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটের সময়, গত বছরের ২৮ জুলাই ১৬ হাজার ২৩০ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছিল, মহামারির মধ্যে সেটাই সর্বোচ্চ। এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩০৮ জনে।

২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে ৮ জন পুরুষ এবং ১২ জন নারী। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন ৫ জন, চট্টগ্রামে ৯ জন, রাজশাহী ও সিলেটে দুজন করে এবং বরিশাল ও ময়মনসিংহে ১ জন করে মারা গেছেন। ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৩২৬ জন। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন মোট ১৫ লাখ ৬২ হাজার ৩৬৯ জন।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, এখন দেশে আক্রান্তদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশই ওমিক্রনের রোগী। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের একটি অংশ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যাবে। এখনই সতর্ক না হলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে হাসপাতালে জায়গা দিতে সমস্যা হবে। সবাইকে শতভাগ বিধিনিষেধ মানতে হবে। সেই অনুযায়ী, সবখানে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। যদি কেউ মাস্ক না পরে, তাহলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাকে জরিমানা করা হবে, জেলও হতে পারে।

সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ অনুযায়ী, উন্মুক্ত স্থানে যে কোনো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বন্ধ থাকবে। দোকানপাট, শপিংমল ও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং হোটেলসহ সব জনসমাগমস্থলে বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। কোনো মসজিদ-মন্দির বা রাজনৈতিক সমাবেশ মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। গণপরিবহণে যাত্রী নেওয়া ও সব ধরনের বাহনের চালক ও সহকারীরা টিকা নেওয়া ও সনদ থাকতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন উপেক্ষিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের স্পাইক প্রোটিন মিউটেশনের ফলে এরা মানুষের কোষে সহজে যুক্ত হতে পারে। ফলে বেশিসংখ্যক আক্রান্ত করে। এমনকি যাদের দুই ডোজ বা বুস্টার নেওয়া আছে তারও আক্রান্ত হচ্ছে। ধরনটির স্পাইক প্রোটিনগুলোর এত বেশি পরিবর্তন হয়েছে যে, মানুষের কোষে যে রিসেপ্টর (কোষের যে স্থানে ভাইরাস যুক্ত হয়) থাকে সেখানে দ্রুত সংক্রামিত করছে।

তবে ধরনটি ফুসফুস সংক্রামিত করতে না পারায় তুলনামূলকভাবে মৃত্যু কম হচ্ছে। ওমিক্রনের বৈশিষ্ট্যের কারণে এটা হচ্ছে। শিশুদের ক্ষেত্রেও এটা আগের মতোই আছে। ফলে শিশুরা কম আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের ঝুঁকিও কম। কিন্তু যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হচ্ছে। তাতে শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক সবার সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে।

দেশে সংক্রমণের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি মাসের ১২ জানুয়ারি মোট সংক্রমণ ১৬ লাখ ছাড়ায়। কিন্তু ওমিক্রন ও ডেল্টা পাল্লা দেওয়ায় সংক্রমণের ফলে মাত্র ১৩ দিনের মাথায় গত ২৫ জানুয়ারি আরও এক লাখ রোগী শনাক্ত হয়। তার আগে এক লাখ রোগী শনাক্তে সময় লেগেছিল সাড়ে চার মাস।

গত ৩১ আগস্ট মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছিল। এ হিসাবে প্রায় সাড়ে তিন মাস সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পর দেশে নতুন রোগী ও শনাক্তের হার আবারও জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলছে। গত প্রায় চার সপ্তাহ ধরে যে হারে রোগী বাড়ছে, তাত সংক্রমণ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৪৪০ জন। মৃত্যু হয়েছে আরও ২০ জনের। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে শনাক্তে মোট ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭১ জন ও মৃতের সংখ্যা ২৮ হাজার ৩০৮ জনে দাঁড়াল।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণের ঘোষণা দেয় সরকার। এরপর প্রায় দুই বছর ধরে চলা সংক্রমণের চিত্র কয়েক দফা ওঠানামা করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ আকার ধারণ করেছিল গত বছরের জুন ও জুলাই মাসে।

এরপর আগস্টের দিকে সংক্রমণ কমতে শুরু করে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও চলে আসে। তবে বিদায়ি বছরের শেষদিকে ফের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। চলতি জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।

এ ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের ৬ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্ত রোগী হাজার ছাড়ায়। তার চার দিনের মাথায় ১০ জানুয়ারি শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২৬ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্ত রোগী ১৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল গত বছরের ২৮ জুলাই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ওমিক্রন প্রথম শনাক্তের ঘোষণা আসে ১১ ডিসেম্বর। ওই মাসেই আইসিডিডিআরবির ল্যাবে ওমিক্রন শনাক্তে কিছুসংখ্যক নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাতে শুধু ঢাকা শহরের ৭৭ জন করোনা রোগীর মধ্যে পাঁচজনের ওমিক্রন ধরা পড়েছিল। অন্যগুলো ছিল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এরপর থেকে দুই ধরনের আধিপত্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সংক্রমণ পরিস্থিতি ফের উদ্বেগ ছড়াচ্ছে।

সংক্রমণ চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ এখনো ঊর্ধ্বমুখী। কবে নাগাদ এটি পিক (সর্বোচ্চ চূড়ায় গিয়ে স্থিতিশীল) পর্যায়ে পৌঁছাবে তা বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের ৮৫ ভাগই টিকা নেননি। এমনকি করোনায় মারা যাওয়াদের বেশিরভাগেরও টিকা নেওয়া ছিল না।

ওমিক্রন দাপটের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক রোগী বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) একটি গবেষণা পরিচালনা করে। সেখান বলা হয়, খোদ ঢাকা শহরেই করোনার তিনটি সাব টাইপ রয়েছে। গবেষণায় পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ২৮ শতাংশ করোনায় আক্রান্ত। আর আক্রান্তদের মধ্যে ওমিক্রন ছিল ৬৯ শতাংশের দেহে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের ৮৫ ভাগই টিকা নেননি। এমনকি করোনায় মারা যাওয়াদের বেশিরভাগেরই টিকা নেওয়া ছিল না। ইতোমধ্যে সরকারি হাসপাতালের ২৫ শতাংশ বিছানায় রোগী ভর্তি রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ ঘটেছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা ৮০ শতাংশই পজিটিভ। যাদের বেশিরভাগই করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনে আক্রান্ত।

বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী যুগান্তরকে বলেন, এটা স্পষ্ট যে, ওমিক্রনের কারণে করোনা বাড়ছে। ধরনটি ডেল্টার চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ পরিমাণে বেশি সংক্রামক হওয়ায় দ্রুত ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে কেউ কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। ফলে অতিমাত্রায় বাড়ছে। কোনো ভাইরাসের যখন মিউটেশন হয়, তখন তার চরিত্র বদলায়। তখন উপধরন তৈরি হয়। সেগুলো জীবকোষের ভেতর দ্রুত প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সেটা ফুসফুসে পৌঁছাতে পারে না। সর্দি-কাশি, নাক দিয়ে পানি ঝরা, গলাব্যথা উপসর্গ দেখা দেয়। যেটাতে মানুষের মৃত্যু কম হয়। এতে মানুষের মধ্যে ভীতি কম থাকে। কাজেই এখন দ্রুত ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে করোনার সুনামি বলছে। ফলে যে কোনো সময় এটি ভয়ংকর হতে পারে। এ কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments