Saturday, January 28, 2023
spot_img

সব কিছুই নতুন

নতুন ম্যাকবুক প্রো

ইন্টেল ছেড়ে নিজস্ব ডিজাইনের ‘এম’ সিরিজ প্রসেসর ব্যবহার শুরু করার পর অ্যাপলের ল্যাপটপগুলো রয়েছে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এবার উন্মোচন করা হলো এম সিরিজের নতুন দুটি প্রফেশনাল মানের প্রসেসর—‘এম২ প্রো’ ও ‘এম২ ম্যাক্স’। নতুন প্রসেসরগুলো আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ শক্তিশালী—এমনটা দাবি করছে অ্যাপল। নতুন প্রসেসরগুলো নিয়ে বাজারে আসা নতুন ম্যাকবুক প্রোগুলোর খোঁজখবর জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

অ্যাপলের আর্ম আর্কিটেকচারভিত্তিক প্রসেসর সিরিজ ‘অ্যাপল সিলিকন এম’ যখন প্রথম ২০২০ সালের শেষে বাজারে আসে অনেক ব্যবহারকারী ও প্রযুক্তি গবেষকরা, সেটা কতটুকু কাজের হবে তা নিয়ে ছিলেন সন্দিহান। ল্যাপটপে আর্ম প্রসেসর ব্যবহারের চেষ্টা অ্যাপলের প্রায় এক যুগ আগেই মাইক্রোসফট করেছিল, তাদের সারফেস আরটি হাইব্রিড ট্যাবলেট-ল্যাপটপে ব্যবহৃত হয়েছিল ‘এনভিডিয়া টেগ্রা প্রসেসর’। আর্মে চলার মতো সফটওয়্যারের অভাবে সারফেস আরটি শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল, টেগ্রার সিপিউ পারফরম্যান্সে চরম ঘাটতি তো ছিলই।

‘অ্যাপল এম১’, ‘এম১ প্রো’ ও ‘এম১ ম্যাক্স’ প্রসেসরগুলো শুধু যে ইন্টেলভিত্তিক ম্যাককে পারফরম্যান্স ও ব্যাটারিলাইফে ছাড়িয়ে গেছে তা-ই নয়, সফটওয়্যারের ঘাটতিও প্রথম ছয় মাসেই সমাধান করে ফেলেছে অ্যাপল। ফলে ২০২১ ও ২০২২ সালের পুরোটাই অ্যাপলের ম্যাকবুক সিরিজ ল্যাপটপ বাজারের তুঙ্গে থেকেছে। এবার অ্যাপল তাদের ‘এম২ প্রো’ ও ‘এম২ ম্যাক্স’ প্রসেসর করেছে উন্মোচন, সঙ্গে ম্যাকবুক প্রো ১৪ ইঞ্চি ও ১৬ ইঞ্চি মডেলে এনেছে বেশ কিছু নতুন ফিচার। এ ছাড়া এম২ প্রো প্রসেসর সমৃদ্ধ নতুন ম্যাক মিনিও উন্মোচন করেছে তারা।

প্রসেসরগুলোর নতুনত্ব

অ্যাপল ‘এম২ প্রো’ এবং ‘এম২ ম্যাক্স’-এর আর্কিটেকচার কাছাকাছি, বলা যায় ‘এম২ প্রো’-এর সঙ্গে বাড়তি কিছু কোর ও ফিচার যুক্ত করলেই সেটা ‘এম২ ম্যাক্স’। দুটি প্রসেসরেই থাকছে ১২টি সিপিউ কোর। যার মধ্যে আটটি কোর পারফরম্যান্সের জন্য তৈরি, চারটি কোর ব্যাটারিসাশ্রয়ী। প্রসেসরগুলো তৈরি করা হয়েছে টিএসএমসির ৫ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে। ‘এম২ প্রো’তে থাকছে ১৯টি জিপিউ কোর এবং ১৬ বা ৩২ গিগাবাইট পর্যন্ত ইউনিফাইড মেমোরি, যা র‌্যাম ও ভির‌্যাম দুটি কাজেই ব্যবহৃত হবে। অ্যাপলের দাবি, তাদের ইউনিফাইড মেমোরি বাজারের সব ল্যাপটপের চেয়ে সবচেয়ে কম শক্তি ব্যবহার করে সবচেয়ে দ্রুত কাজ করতে সক্ষম, সেকেন্ডে ২০০ গিগাবাইট ডাটা রিড ও রাইট করা যাবে। ‘এম২ ম্যাক্স’-এ ইউনিফাইড মেমোরির পরিমাণ আরো বেশি, সর্বোচ্চ ৯৬ গিগাবাইট পর্যন্ত। জিপিউ কোরের পরিমাণও দ্বিগুণ, ৩৮টি পর্যন্ত কোর পাবে ‘এম২ ম্যাক্স’। ‘এম২ প্রো’ এবং ‘এম২ ম্যাক্স’ পাচ্ছে নতুন ১৬ কোরের নিউরাল ইঞ্জিন, যার কাজ মেশিন লার্নিং ও ইমেজ প্রসেসিং করা। এ ছাড়া প্রো-রেস ৪২২ এবং এইচ২৬৪ এনকোডার-ডিকোডার মিডিয়া ইঞ্জিন থাকছে দুটি প্রসেসরেই, তবে ‘এম২ ম্যাক্স’-এ মিডিয়া ইঞ্জিন দুটি নয়, থাকবে চারটি। ফলে ল্যাপটপগুলো অনায়াসে ৪কে বা ৮কে রেজল্যুশনের প্রফেশনাল ভিডিও নিয়ে কাজ করতে পারবে ব্যাটারির ওপর বাড়তি চাপ না ফেলেই। অ্যাপল জানিয়েছে, এম২ প্রো’তে ‘এম১ প্রো’-এর চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি ট্রানজিস্টর রয়েছে, যা ‘এম১ প্রো’-এর চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। ফলে অবশ্য এবারের চিপের আকৃতি আগের চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়ার কথা, তাপ উৎপাদনও হতে পারে বেশি। সেটা অবশ্য ব্যবহারকারীদের হাতে ডিভাইস না পৌঁছানো পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এর পরও এম২ প্রো বা ম্যাক্স, কোনোটিই বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী ল্যাপটপ প্রসেসর নয়। সে মুকুটের দাবিদার, ‘ইন্টেল কোর আই৯ ১৩৯০০এইচএক্স’। সিঙ্গলকোর পারফরম্যান্সে এম২ সিরিজের সমান এবং মাল্টিকোরে এগিয়ে আছে প্রায় ৪০ শতাংশ, কেননা সে প্রসেসরে আছে ১৪টি কোর এবং ৩২টি থ্রেড।

তবে এম২ প্রো ও ম্যাক্স যেখানে এগিয়ে আছে, সেটা ব্যাটারিলাইফ। অ্যাপলের দাবি অন্তত ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সাধারণ ব্যবহারে ব্যাটারিলাইফ পাওয়া যাবে, আর বেশি লোডে কাজ করলে আট ঘণ্টা। ইন্টেলের প্রসেসর এ ক্ষেত্রে অ্যাপলের কাছেও নেই, এএমডির রাইজেনও নয়। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরও অ্যাপলের ‘ম্যাকবুক প্রো’-ই ল্যাপটপ বাজারে রাজত্ব করবে। কেননা ল্যাপটপের ব্যাটারিলাইফ ও হিট ব্যবহারকারীদের কাছে পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি জরুরি, যে ল্যাপটপ চার্জারের সঙ্গেই সারা দিন লাগিয়ে রাখতে হয় সেটা ডেস্কটপই বলা যায়। তবে গেমিং ল্যাপটপের স্থান এম২ ম্যাক্সও নিতে পারবে না সেটা বলে দেওয়াই যায়, ম্যাকওএস এখনো গেমিংয়ে উইন্ডোজ থেকে বহু দূর পিছিয়ে আছে।

মূলত ভিডিও এডিটিং, ছবি সম্পাদনা, কোডিং আর সিনেমা ৪ডিতে করা এনিমেশন ও স্পেশাল ইফেক্টসের দিকে নজর দিয়েই প্রসেসরগুলো তৈরি করা হয়েছে, সেটা স্পষ্ট। অ্যাপল সরাসরি দেখিয়েছে কিভাবে নতুন ম্যাকগুলো আগের ইন্টেল মডেলের চেয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ দ্রুত এডোবির সব অ্যাপ, সিনেমা ৪ডি বা ফাইনাল কাট চালাতে পারবে বা এক্সকোডে লেখা সফটওয়্যার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দ্রুত কমপাইল হবে ‘এম১ প্রো’ সিরিজের তুলনায়। গেমিং বা এআই ও ডাটাবেইসের মতো কাজের জন্য ল্যাপটপগুলো বিশেষায়িত করা হয়নি। যদিও ম্যাকের ব্যবহার এসব সেক্টরে এমনিও নেই।

নতুন ম্যাকবুক প্রো

গত বছরের মতো এবারও, ১৪ ইঞ্চি ও ১৬ ইঞ্চি—দুটি সাইজে বাজারে আসছে নতুন ম্যাকবুক প্রো। দুটি সাইজেই চাইলে ‘এম২ প্রো’ বা ‘এম২ ম্যাক্স’ প্রসেসর ব্যবহার করা যাবে, তবে অ্যাপল বলছে ‘এম২ ম্যাক্স’-এর জন্য ১৬ ইঞ্চি মডেলেটিই ব্যবহার করা উচিত। বড়সড় ল্যাপটপে ব্যাটারিও বড় থাকবে আর তাপ সরানোর ব্যবস্থাও হবে আরো কার্যকর। আগের বছরের মডেলের সঙ্গে বাহ্যিক ডিজাইনে কোনো তফাত এবার নেই। তবে হার্ডওয়্যারে কিছু পার্থক্য আছে। যেমন : এবারের মডেলগুলো থান্ডারবোল্ট ৪ পোর্টের মাধ্যমে ৪কে রেজল্যুশনের মনিটরে ২৪০ হার্জ রিফ্রেশ রেটের সিগন্যাল পাঠাতে পারবে। প্রয়োজনে ব্যবহারকারীরা ৮কে রেজল্যুশনের ডিসপ্লেও যুক্ত করতে পারবেন বলে জানিয়েছে অ্যাপল, যদিও ৮কে মনিটর এখনো বাজারে পাওয়া কঠিন। বোঝাই যাচ্ছে অ্যাপল চাইছে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘদিন ডিভাইসগুলো ব্যবহার করুক, তাদের আগের নীতির সম্পূর্ণ উল্টো এ মনোভাব। এ ছাড়া নতুন মডেলগুলোতে থাকছে ওয়াই-ফাই ৬ই, যা ইন্টারনেট বা লোকাল নেটওয়ার্কের গতি বাড়াবে বহুগুণ। তবে বর্তমানে ওয়াই-ফাই ৭ সমৃদ্ধ ডিভাইসও বাজারে আছে, সেদিক থেকে পিছিয়ে থাকছে অ্যাপল। নতুন ল্যাপটপগুলো আগের মডেলের চেয়ে অন্তত এক থেকে তিন ঘণ্টা ব্যাটারিলাইফ দেবে বলে জানা গেছে, যদিও সেটা ব্যাটারির সাইজ বৃদ্ধির জন্য নাকি প্রসেসরের শক্তি সাশ্রয় বাড়ার ফলাফল, সেটা পরিষ্কার নয়। সম্ভাবনা বেশি প্রসেসর আগের চেয়েও কম শক্তি ব্যয় করবে, ব্যাটারির সাইজ থাকছে আগের মতোই।

নতুন মডেলগুলোর রংও থাকছে আগের মতো চারটিই। মূল্য ১৪ ইঞ্চি ম্যাকবুক প্রোয়ের শুরু হচ্ছে এক হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে, আর ১৬ ইঞ্চি মডেলের মূল্য শুরু দুই হাজার ৪৯৯ ডলার থেকে। দুটি মডেলেরই সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোর সিপিউ, ১৬ কোর জিপিউ, ১৬ গিগাবাইট ইউনিফাইড মেমোরি এম২ প্রো সিপিউ এবং ৫১২ গিগাবাইট স্টোরেজসমৃদ্ধ সংস্করণ থেকে। অর্ডার করা যাবে এখনই, ব্যবহারকারীদের হাতে পৌঁছাবে ২৪ জানুয়ারি থেকে।

ম্যাক মিনি

অ্যাপলের সবচেয়ে কম দামি ডেস্কটপ কম্পিউটার—‘ম্যাক মিনি’। প্রথা ভেঙে এবার অ্যাপল নিজেদের প্রফেশনাল প্রসেসর এম২ প্রো এতে ব্যবহার করছে, সাধারণত সবচেয়ে বেসিক মডেলের প্রসেসর মিনিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ব্যবহারকারীরা চাইলে ৮ কোর সিপিউ, ১০ কোর জিপিউসমৃদ্ধ এম২ বা ১২ কোর সিপিউ এবং ১৯ কোর জিপিউ সমৃদ্ধ এম২ প্রো প্রসেসরের মধ্যে বাছাই করে ম্যাক মিনি কিনতে পারবেন। এতে করে অবশ্য ম্যাক স্টুডিওর প্রয়োজনীয়তা কোথায়, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কেননা এর আগে এম১ প্রো সিরিজের প্রসেসর শুধু ম্যাক স্টুডিওতেই ব্যবহার করা হয়েছিল। হয়তো ‘এম২ ম্যাক্স’ ও ‘এম২ আল্ট্রা’ সিপিউ দিয়ে নতুন ম্যাক স্টুডিও তৈরি করা হবে, যদিও সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। আবার নতুন ম্যাক প্রোয়ের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে এ বছরই বাজারে আসার, সে ক্ষেত্রে ‘এম২ প্রো মিনি’ ও ‘এম২ আল্ট্রা প্রো’-এর মাঝখানে ‘এম২ ম্যাক্স’ সমৃদ্ধ ম্যাক স্টুডিওর দরকার আছে কি না সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। নতুন ম্যাক মিনিতেও থাকছে ৪কে ২৪০ হার্জ বা ৮কে ৬০ হার্জ ডিসপ্লে ব্যবহারের সুবিধা ও ওয়াই-ফাই ৬ই ইন্টারনেট। মূল্য এম২ প্রসেসর সংস্করণের জন্য শুরু ৫৯৯ ডলার থেকে, পাওয়া যাবে ২৪ জানুয়ারি।

অন্যান্য

নতুন হোমপড স্পিকারও বাজারে এনেছে অ্যাপল, যদিও সেখানেও নতুনত্ব নেই ডিজাইন বা সাউন্ডে। এভাবে ডিজাইন ও ফিচারে ঘাটতি রেখে নতুন মডেল প্রকাশ করা অ্যাপলের সিগনেচার হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা হয়তো কম্পানিটির ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। মূল্য ধরা হয়েছে ২৯৯ ডলার। পাওয়া যাবে ফেব্রুয়ারি থেকে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments