Tuesday, December 6, 2022
spot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসফটওয়্যারের ত্রুটি ঠিক করে ওপেনরিফ্যাক্টরি

সফটওয়্যারের ত্রুটি ঠিক করে ওপেনরিফ্যাক্টরি

এবারের ‘বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্র্যান্ট (বিগ) ২০২১’ প্রতিযোগিতায় দেশি-বিদেশি সাত হাজার স্টার্টআপের মধ্যে সেরা হয়েছে মার্কিন-বাংলাদেশি স্টার্টআপ ‘ওপেনরিফ্যাক্টরি’। পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছে এক লাখ মার্কিন ডলারের অনুদান। বিস্তারিত জানাচ্ছেন অনয় আহম্মেদ

শুরুটা যেভাবে

ওপেনরিফ্যাক্টরির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মুনাওয়ার হাফিজ এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিক মনজুর। দুজনেই নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় থেকেই বন্ধু। ২০১২ সালে মুশফিক যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের শিকাগোতে বন্ধু মুনাওয়ারকে দেখতে গিয়েছিলেন। মুনাওয়ার তখন পিএইচডি শেষ করে সবেমাত্র অবার্ন ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণায় নিরাপত্তা সমস্যা সমাধানের জন্য সফটওয়্যারের স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন করার সম্ভাব্যতা খুঁজে দেখছিলেন। শিকাগোর ডেভন শহরের এক রেস্টুরেন্টে ডিনার খেতে খেতে তাঁরা এই গবেষণার কাজ বাজারে নিয়ে আসার জন্য এক কম্পানি প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা-ভাবনাও করেন।

২০১৫ সালের শেষের দিকে মুনাওয়ার ও মুশফিক কম্পানিটি শুরু করার জন্য অনুদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের কাছে প্রস্তাব জমা দেন। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে পেয়ে যান দুই লাখ ২৫ হাজার ডলারের অনুদান। এরপর মুনাওয়ার চাকরি ছেড়ে নিজেদের ওপেনরিফ্যাক্টরিতেই পুরোদমে কাজ শুরু করেন। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে কম্পানিটি ‘ডেলাওয়্যার সি-কর্প’ (যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ডেলাওয়্যারে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান) হিসেবে নিবন্ধিত হয়। আর ২০১৭ সালের শুরুতে আরেকজন সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা চার্লি বেডার্ড তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁরা কোড রিফ্যাক্টরি বা কোড রিরাইটিং টেকনোলজির মাধ্যমে সফটওয়্যারটিকে বাগ বা ত্রুটি খুঁজে বের করে নির্মূল করার জন্য তৈরি করেছেন। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় ওপেনরিফ্যাক্টরির।

ইন্টেলিজেন্ট কোড রিপেয়ার

ওপেনরিফ্যাক্টরি মূলত কম্পিউটার সায়েন্সের একটি মৌলিক সমস্যা, অর্থাৎ সফটওয়ার কোডের সিকিউরিটি, ভালনারেবিলিটি, রিলায়েবিলিটি এবং কমপ্লায়েন্স বাগ বা ত্রুটি নিজেদের উদ্ভাবিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে উচ্চ নির্ভুলতার সঙ্গে খুঁজে বের করে। এরপর সেগুলো আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিক্স বা নির্মূল করে দেয়। সফটওয়্যার প্রগ্রামিংয়ের মতো জটিল কাজে অনেক ভুল হয়, যেটাকে বলা হয় ‘সফটওয়্যার বাগ’। বাজারে এখন যেসব বাগ ডিটেকশন টুলগুলো পাওয়া যায় সেগুলো ভুলভাল রিপোর্ট দিয়ে থাকে। ১০টি রিপোর্টের মধ্যে সাতটিই আসলে বাগ না। অনেক সময় জটিল বাগগুলো খুঁজেই পায় না। তাঁদের উদ্ভাবিত সফটওয়্যারটির নাম ‘ইন্টেলিজেন্ট কোড রিপেয়ার’ (আইসিআর)। বেঞ্চমার্ক টেস্টিংয়ে দেখা গেছে, এটি বাজারে পাওয়া অন্যান্য ডিটেকশন টুলের তুলনায় ৯ গুণ পর্যন্ত বেশি সুচারুভাবে সফটওয়্যার কোডের বাগ খুঁজে বের করতে সক্ষম। অন্যান্য টুল যেসব জটিল বাগ খুঁজেই পায় না, সেখানে তাঁদের সফটওয়্যারটি বেশ কার্যকর। শুধু তা-ই নয়, ইন্টেলিজেন্ট কোড রিপেয়ার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই বাগগুলোকে সফটওয়্যার কোড রান না করেই কোডের ভেতরেই ফিক্স করে দেয়। রিফ্যাক্টরির দাবি অনুযায়ী এটি বিশ্বের প্রথম সফটওয়্যার বাগ খুঁজে বের করার টুলস।

এটি ব্যবহার করে কম্পানিগুলো সময়মতো বাজেটের মধ্যে উচ্চ মানের সফটওয়্যার প্রকাশ করতে পারবে।

বর্তমানে তাঁদের জাভা এবং সি ল্যাঙ্গুয়েজের জন্য ‘ইন্টেলিজেন্ট কোড রিপেইয়ার’ সলিউশন আছে। সম্প্রতি তারা পাইথনের জন্য ‘ইন্টেলিজেন্ট কোড রিপেয়ার’ আলফা সংস্করণ প্রকাশ করেছে, যার পূর্ণ সংস্করণ আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিক নাগাদ বাজারে আসবে। ওপেনরিফ্যাক্টরির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সফটওয়্যার কম্পানিগুলো যেন দ্রুততম সময়ে এবং সাশ্রয়ীভাবে নির্ভুল সফটওয়্যার লিখতে পারে তা নিশ্চিত করা।

সেবা পাওয়া যাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে

ওপেনরিফ্যাক্টরির সেবাটি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই ব্যবহার করা যাবে। তাদের পণ্যটি মূলত দুইভাবে ব্যবহার করা যাবে। ছোট টিম বা এসএমইরা ক্লাউড মার্কেটপ্লেস থেকে ‘পে-অ্যাজ-ইউ-গো’ হিসেবে আইসিআর ব্যবহার করতে পারবে। আবার বড় প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ফি দিয়েও এটি ব্যবহার করতে পারবে। ‘পে-অ্যাজ-ইউ-গো’ মডেলটির সুবিধা হলো—আপনার যতক্ষণ দরকার শুধু ততটুকুর জন্যই পেমেন্ট করতে হবে। ওপেনরিফ্যাক্টরির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মুনাওয়ার হাফিজ বলেন, ‘কম্পানিটি শুরুর পর থেকে আমরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশের ১৭টিরও বেশি কম্পানির সঙ্গে জাভার জন্য আইসিআর পাইলট করেছি। এ ছাড়া বাংলাদেশের কিছু প্রযুক্তি কম্পানির সঙ্গেও চুক্তি করেছি।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, “আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মূলত দুইভাবে ভাগ করা যায়। প্রথমত, নতুন কিছু প্রগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ সাপোর্ট নিয়ে কাজ করতে চাই। ভবিষ্যতে অন্যান্য ল্যাঙ্গুয়েজ যেমন—পিএইচপি, জাভা স্ক্রিপ্টের জন্য ‘ইন্টেলিজেন্ট কোড রিপেয়ার (আইসিআর)’ বাজারে ছাড়ব। দ্বিতীয়ত, আইসিআর সার্ভিস বর্তমানে অ্যামাজন এডাব্লিউএস এবং মাইক্রোসফট অ্যাজিউরের মতো ক্লাউড মার্কেটপ্লেসে পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে গুগল ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ও অ্যাটলাশিয়ানের মতো ক্লাউড মার্কেটপ্লেসে পাওয়া যাবে। আগামী দিনগুলোতে আমাদের বাংলাদেশ টিমের আকার আরো বড় হবে। দেশেই আমাদের সব ডেভেলপমেন্ট কাজ করব। বাংলাদেশের মেধা দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন সফটওয়্যার কম্পানিকে সেবা দেব।”

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments