Monday, May 20, 2024
spot_img
Homeধর্মসত্যের অন্বেষা

সত্যের অন্বেষা

পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াত ও ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের একটি ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলতে চাচ্ছি। ইসলাম সত্যের অনুসরণের যে শিক্ষা দিয়েছে তা পৃথিবীর কথিত সভ্য মানুষের সত্যের অনুসরণ থেকে অনেক ঊর্ধ্বের। পবিত্র কোরআন ও নবীজি (সা.)-এর আদর্শ আমাদের সামনে সত্যের কিছু মূলনীতি পেশ করেছে। একদিকে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর অনুগ্রহে তাদের প্রতি আপনি কোমল হৃদয় হয়েছেন।

যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার পাশ থেকে সরে পড়ত। ’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোরো এবং তাদের প্রতি কঠোর হও। ’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৭৩)

অর্থাৎ যারা মিথ্যার অনুসারী তাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করুন। কেননা তারা নম্র আচরণের যোগ্য নয়। প্রথম আয়াতে সাধারণভাবে উত্তম আচরণ, উদার দৃষ্টি, ধৈর্য-সহ্য, বিনম্র স্বভাব, সুন্দর বাক্যালাপ ও মুগ্ধকর বাচনভঙ্গির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলাম প্রচারকের জন্য এসব গুণকে আল্লাহর অনুগ্রহ বলা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় আয়াতে হক ও বাতিল, সত্য ও মিথ্যা, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সংঘাতের কথা বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, যতটা কঠোর হওয়া যায় হও। কেননা এটাই ন্যায়ানুগ এবং নৈতিকতার দাবি। বরং সুরা কালামের ৯নং আয়াতে যে নম্রতা হক ও সত্য পথ থেকে বিপরীত, যা মানুষকে ন্যায়ের পথ সরিয়ে দেয় তাকে ‘মুদাহানাত’ বা তোষামোদ বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একদল অবিশ্বাসী এসে বলল, আসুন! আমরা পরস্পরের সঙ্গে একটি আপসে আসি। আপনি মানুষকে যা কিছু শেখাতে চান শেখান। আপনি শুধু আমাদের মূর্তিগুলো ও তাদের উপাসকদের বিরুদ্ধে কিছু বলবেন না। বিনিময়ে আমরা আপনাকে সম্পদে পরিপূর্ণ করে দেব; বরং আপনি হেজাজের বাদশাহ হতে চাইলে আমরা তাও মেনে নেব। কিন্তু যিনি শুধু মরু আরবের নয়; বরং সমগ্র জগতের হিদায়াতের বাদশাহ হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেছেন তিনি তাদের কথাই কিভাবে সত্য থেকে বিরত থাকবেন। তিনি কুণ্ঠাহীন উত্তর দিলেন, যদি তোমরা আমার হাতে চন্দ্র-সূর্য এনে দাও, তবু আমি সত্য ছাড়া আর কিছুই আমার জন্য গ্রহণ করব না।

আল্লাহ তাদের এই সন্ধি প্রস্তাব ও নম্রতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা চায় আপনি তাদের তোষামোদ করলে, তারাও আপনার তোষামোদ করবে। ’ (সুরা কালাম, আয়াত : ৯)

অর্থাৎ অসত্যের অনুসারীরা চায় আপনি যদি সত্য প্রচারে নমনীয় হন, তবে তারাও আপনার সঙ্গে নম্র ব্যবহার করবে। অথচ কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি রেখে কখনোই ঈমানের দাওয়াত দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘আপনি বিশ্বাসীদের অনুসরণ করবেন না। ’ যারা সত্য ও ন্যায়ানুগ বিষয়ের অনুসরণ করে না। মক্কার কুরাইশ নেতাদের মতো আজ আমাদের সামনে একটি গোত্রপূজারী ও শক্তিশালী দল আছে, যারা চায় আমরা সত্য প্রকাশ, কল্যাণের আহ্বান ও ন্যায়ের দাবিতে নরম হবো এবং বিনিময়ে তারাও আমাদের সঙ্গে নরম আচরণ করবে। যেভাবে আবু তালিবের বাড়িতে কুরাইশ সরদাররা সত্যের আহ্বানকারীকে বলেছিল, তিনি যেন সব কিছু বলেন; কিন্তু তাদের মূর্তির সমালোচনা করবে না। তেমনি আমাদেরও বলা হচ্ছে তোমরা সব বলবে; কিন্তু আমাদের সেসব মূর্তির বিরুদ্ধে কিছু বলবে না, যা আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজেদের দাসে পরিণত করছে। এটাই সন্ধির শর্ত। আমরা বলতে চাই, সত্যিই যদি আমরা এসব ছেড়ে দিই, তাহলে এরপর আমাদের কাছে আর কি থাকবে? প্রকৃতপক্ষে সত্য ত্যাগ করার পর আমাদের কাছে মিথ্যা, অসততা ও কুফর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। কোরআনের ভাষায়—‘সত্যত্যাগের পর বিভ্রান্তি ছাড়া কী?’

আবু বকরের অন্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ছিল, কিন্তু ঈমান ছিল না। ফলে তিনিও বললেন, এতে কি ক্ষতি যদি তুমি তাদের মূর্তির সমালোচনা না করো? বর্তমানে আমাদের প্রিয়জনদের ভেতর অনেককে দেখা যায় একই রকম বলতে শোনা যায়—যাদের অন্তরে সত্যের উপস্থিতি থাকলেও এমন ঈমানি শক্তি নেই, যার কারণে তারা সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করতে পারবে। সম্ভবত এর কারণ হলো, তাদের অন্তরে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর আনুগত্য ও ইসলামী শিক্ষার কারণে আসেনি, বরং তারা অন্যের দেখাদেখি এবং স্বাধীনতাকামী মানুষের পিছু পিছু এখানে এসেছে। ফলে আপসকামিতার ইচ্ছা তাদের উদ্বেলিত করেছে অথবা কুফরি শক্তি দ্বারা তারা প্রভাবিত হয়েছে। তা না হলে তারা বিপদ ও পরীক্ষার চিন্তায় ভয় পাচ্ছে। তাদের প্রবঞ্চিত মন ও ঈমানের দুর্বলতা তাদের বলে, এতে কি সমস্যা? শেষ পর্যন্ত সন্ধিও তো একটি সমাধান। রাজনীতিতে নরম ও গরম উভয় দিক আছে। কাজের জন্য প্রথমটি সুযোগ। যদি আমরা না-ই থাকি, তবে আমাদের কিছুই থাকবে না। উত্তম হলে মাথা ঠাণ্ডা রেখে আপস-রফা করে ফেলা এবং নম্রতা অবলম্বন করা, যেন তারাও নম্রতা অবলম্বন করে। ঠিক যেমন বলা হয়েছে, ‘তারা চায় আপনি তাদের তোষামোদ করুন, তবে তারাও আপনার তোষামোদ করবে। ’ আমার নির্বোধ বন্ধুরা জানে না, আপস করতে হয় সত্যের অস্তিত্ব রক্ষা করে, সত্যকে বিলীন করে নয়। নম্রতার অর্থ হলো কোনো কঠোরভাবে না করা, সত্য বিসর্জন নম্রতা নয়। যদি কিছু দেওয়ার থাকে তবে সত্যের সঙ্গেই দেওয়া হোক। সত্য আড়াল করে তারা কি দিতে চায়? কোনো জিনিসের গেলাফ আপনি পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু অন্য কোনো জিনিস দিয়ে তা পাল্টাতে পারেন না; যদি জিনিসটির প্রতি সত্যই আপনার ভালোবাসা থাকে। সত্যের পথে ভয় পাওয়ার অর্থ হলো নদীতে নেমে কাপড় ভেজার ভয় করা। কেউ চাইলেই কি আপনি আগুন নিয়ে খেলবেন? হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত কয়লা নেবেন? আরামপ্রিয়রা পথ চলতে চায়; কিন্তু পায়ে কাঁটা ফোটাতে চায় না।

ভালো করে জেনে নিন, আপনারা যাকে সত্যের মৃত্যু মনে করেন, তা সত্যের জন্য ‘আবে হায়াত’। যদি আপনার আঁচলে সত্যের বীজ থাকে, তবে তা আপনি জমিনের বুকে অর্পণ করুন। সম্ভব হলে নিজের কয়েক ফোঁটা রক্ত তার ওপর ছড়িয়ে দিন। এটাই তার জন্য ‘নতুন জীবন দান’ হবে। এরপর আপনার দায়িত্ব শেষ। এরপর মহান আল্লাহই সেই ক্ষেতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তা ফলে-ফুলে সুশোভিত করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন! তিনি পরম দয়ালু। আমরা তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং তাঁর ওপরই ভরসা করলাম। অতি শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে কে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে। ’ (সুরা মুলক, আয়াত : ২৯)

তামিরে হায়াত থেকে

মুফতি আবদুল্লাহ নুরের ভাষান্তর

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments