Saturday, July 20, 2024
spot_img
Homeলাইফস্টাইলসচেতনতায় ক্যান্সারমুক্ত জীবন

সচেতনতায় ক্যান্সারমুক্ত জীবন

বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যু হয় যেসব রোগে তার প্রথম তিনটির একটি হলো ক্যান্সার। বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ১২ লাখ। প্রতিবছর দুই লাখ মানুষ এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় দেড় লাখ। প্রতিবছর সারা বিশ্বে ক্যান্সারে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায় তার এক-তৃতীয়াংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ জন্য চাই সচেতনতা।

ক্যান্সার কী?

ক্যান্সার এক ধরনের অসংক্রামক ব্যাধি, যে রোগে মানুষের শরীরে অস্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন ও বৃদ্ধি হয়ে থাকে। আমাদের শরীরে কোষ বিভাজনের উদ্দেশ্য হলো মাতৃকোষ থেকে নতুন কোষ সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমে শরীরের বৃদ্ধি, ক্ষয় পূরণ ও দেহের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত হয়। শরীরে একদিকে যেমন কোষ বিভাজনের ব্যবস্থা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে একে নিয়ন্ত্রণে রাখারও ব্যবস্থা। কোনো কারণে এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে শরীরে অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন হতে থাকে। তখন শরীরে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া ও শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। এ অবস্থাটিই হলো ক্যান্সার।

ক্যান্সার কি কোনো একক রোগ?

অনেকেই ক্যান্সার বলতে বিশেষ একটি রোগ বলে ধরে নেন। কিন্তু ক্যান্সার কোনো একক রোগ নয়। এটি সমষ্টিগত রোগের একক সাধারণ নাম। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ও বিভিন্ন কোষে ক্যান্সার হতে পারে। একেক রকম ক্যান্সারের ধরন, কারণ ও উপসর্গ একেক রকম। রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি, চিকিৎসা, রোগের ভয়াবহতা ও পরিণতিও ভিন্ন ভিন্ন।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের ক্যান্সারের প্রকোপ দেখা যায়। বাংলাদেশে পুরুষের মধ্যে ফুসফুস, প্রস্টেট, মুখগহ্বর, কলোরেক্টাল, পাকস্থলী, লিভার ক্যান্সারের হার বেশি।

নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখ, স্তন, মুখগহ্বর, থাইরয়েডের ক্যান্সার বেশি।

ক্যান্সারের ভয়াবহতা নির্ভর করে এর ধরন এবং কতটুকু জায়গা ছড়িয়েছে তার ওপর।

ক্যান্সার কেন হয়?

ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে বেশ কিছু বিষয়কে ক্যান্সারের সম্ভাব্য কারণ বা ফ্যাক্টর বলে ধরে নেওয়া হয়। এগুলোকে ক্যান্সারের উদ্দীপকও বলা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষায় ক্যান্সারের উদ্দীপককে বলে ‘কারসিনোজেন’। ক্যান্সারের বেশ কিছু উদ্দীপক রয়েছে। যেমন—

♦ রেডিয়েশন ও আলট্রাভায়োলেট রে।

♦ কৃত্রিম রং, কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, বেনজিনজাতীয় রাসায়নিক পদার্থ, এসবেস্টস, কীটনাশক ও বায়ুদূষণ।

♦ আফলাটক্সিন।

♦ কিছু ক্ষেত্রে জীবাণু; যেমন—হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, হার্পিস ভাইরাস, এইচআইভি, এইচ পাইলরি ইত্যাদি।

♦ তামাক ও অ্যালকোহল।

♦ ভেজাল খাবার ও খাবারের প্রিজারভেটিভ।

♦ উচ্চ ক্যালরিযুক্ত, অস্বাস্থ্যকার, ট্রান্সফ্যাটযুক্ত (যেমন—ফাস্ট ফুড) খাবার।

♦ অতিরিক্ত ওজন।

♦ নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন।

লক্ষণ

যেহেতু ক্যান্সার কোনো একক রোগ নয়, তাই এটির লক্ষণও বিভিন্ন ক্যান্সারভেদে ভিন্ন ভিন্ন। তবে সামষ্টিকভাবে কিছু লক্ষণকে ক্যান্সারের সাধারণ বিপত্সংকেত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। সেগুলো হলো—

♦ হঠাৎ শরীরের ওজন কমতে শুরু করেছে, কিন্তু তার তেমন কোনো ব্যাখ্যা নেই।

♦ রক্তস্বল্পতা ও ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া।

♦ অস্বাভাবিক দুর্বলতা।

♦ মলমূত্র ত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন হওয়া। যেমন—কিছুদিন ডায়রিয়া আবার কিছুদিন কোষ্ঠকাঠিন্য।

♦ বেশ কিছুদিন ধরে (দুই সপ্তাহের বেশি) জ্বর, যা অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য সাধারণ চিকিৎসায় সারছে না।

♦ খুসখুসে কাশি, যা ঠিক যাচ্ছেই না।

♦ শরীরের কোথাও কোনো পিণ্ড বা চাকার উপস্থিতি।

♦ ভাঙা কণ্ঠস্বর, যা কোনো চিকিৎসায় ভালো হচ্ছে না।

♦ তিল বা আঁচিলের সুস্পষ্ট পরিবর্তন।

♦ শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ।

ওপরের এই লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হতে হবে। দ্রুত চিকিৎসকের শরণ নিতে হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে রোগের কারণ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ওপরের লক্ষণগুলো সতর্কসংকেত মাত্র। এই লক্ষণগুলো থাকলেই ক্যান্সার হয়েছে—এমনটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না।

ক্যান্সার প্রতিরোধে করণীয়

ক্যান্সার প্রতিরোধে নিচের অভ্যাসগুলো রপ্ত করতে হবে—

♦ নিয়মিত ব্যায়াম ও কায়িক পরিশ্রম করা।

♦ পরিমিত স্বাস্থ্যকর আহার।

♦ নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত যৌনজীবন।

♦ শাক-সবজি, ফলমূল ও বিভিন্ন ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া।

♦ অধিক ক্যালরি ও ফ্যাটযুক্ত খাবার পরিহার করা।

♦ ধূমপান, তামাক ও মদ্যপান পরিহার করা।

♦ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নিয়ম অনুযায়ী ক্যান্সার স্ক্রিনিং করা।

♦ হেপাটাইটিস, এইচপিভির ভ্যাকসিন সময়মতো নিয়ে নেওয়া।

♦ বিপত্সংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।

ক্যান্সার চিকিৎসার চ্যালেঞ্জ

ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সময়ে রোগটি নির্ণয় না হওয়া। রোগ যখন বেশি দূর ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই চিকিৎসায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। চিকিৎসা সম্পর্কে অহেতুক ভীতি ও সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা।

ক্যান্সারের চিকিৎসা হলো মূলত সার্জারি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। প্রায় সব ধরনের ক্যান্সারেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এই চিকিৎসাগুলোই দেওয়া হয়। কখনো যেকোনো একটি, কখনো একাধিক চিকিৎসা পালা করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা করতে হয়। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলক বেশি। এর ব্যয়ও সাধারণ চিকিৎসার চেয়ে বেশি। চিকিৎসার এই উচ্চব্যয় ক্যান্সার চিকিৎসার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সঙ্গে আছে অপচিকিৎসার দৌরাত্ম্য। এসব চ্যালেঞ্জ দূর করতে হলে সরকার, বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন ও ব্যক্তিকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ক্যান্সার ভালো হয় না—এমন একটি ধারণা রয়েছে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে। অথচ শুরুর দিকে ধরা পড়লে বেশির ভাগ ক্যান্সারকেই ভালো করা সম্ভব।

আমরা করব জয়

বিশ্বে প্রতিবছর ৮০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ মারা যায় বিভিন্ন রকম ক্যান্সারে। প্রতিরোধের ব্যবস্থা না নিলে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে ২০৩০ সালের মধ্যে। প্রতিবছর সারা বিশ্বে ক্যান্সারে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায় তার এক-তৃতীয়াংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পৃথিবীতে তামাক না থাকলে ৭১ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সার এবং ২২ শতাংশ অন্যান্য ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। তাই প্রতিরোধই হওয়া উচিত ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান পদক্ষেপ। ক্যান্সার চিকিৎসায় মনোবল ধরে রাখাটা খুব জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিতে হয় বলে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তাই ক্যান্সার রোগীকে মানসিক সহায়তা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রতিরোধ ও সূচনায় ক্যান্সার নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও সামাজিক সচেতনতা জরুরি।

ক্যান্সার পরিচর্যায় বৈষম্য দূর করি

২০০০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে বিশ্ব ক্যান্সার সামিট আয়োজিত হয়। সেখানেই ঠিক হয় এই দিনটি বিশ্ব ক্যান্সার দিবস বা বিশ্ব ক্যান্সার সচেতনতা দিবস বা বিশ্ব ক্যান্সার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হবে। এর পর থেকে প্রতিবছর নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। নানা আয়োজনে বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়।

এ বছর ক্যান্সার দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘ক্যান্সার পরিচর্যায় বৈষম্য দূর করি।’ ২০২২ সাল থেকে তিন বছরের জন্য এই প্রতিপাদ্য গ্রহণ করা হয়েছে।

লেখক : রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা

একনজরে

♦ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বে প্রতিবছর ৮২ লাখ মানুষ ক্যান্সারে মারা যায়।

♦ ২০২০ সালে মারা গেছে এক কোটি মানুষ।

♦ পৃথিবীতে যেসব রোগে মানুষ মারা যায় সেসবের মধ্যে ক্যান্সার রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

♦ এই মারণব্যাধিতে আক্রান্তদের মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক।

♦ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখ ক্যান্সার রোগী রয়েছে। প্রতিবছর দুই লাখ মানুষ এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং দেড় লাখ মৃত্যুবরণ করে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments