নয়াদিল্লী প্রতিনিধি: প্রধানমন্ত্রী ময়ূর নিয়ে মেতে থাকলেও দেশের অর্থনীতির সংকট ভয়ানক আকার নিয়েছে। গত মঙ্গলবার রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরেছে। দেশের অর্থমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং শাসকদলের নেতারা যদিও সংকটের কথা স্বীকার করতে চাইছেন না, কিন্তু রিজার্ভ ব্যাংকের রিপোর্ট উল্টো কথা বলছে। অর্থনৈতিক মন্দা চলছিলই। বেকারি বাড়ছিলই। তার মধ্যে মহামারি মারাত্মক আঘাত করেছে। রিজার্ভ ব্যাংক রিপোর্টে বলা হয়েছে, অতীতে যে মহান্দা দেখা গিয়েছিল সেই সংকটকেও ছাড়িয়ে যাবে করোনার মহামারি থেকে তৈরি এই আর্থিক বিপর্যয়। অর্থনীতির সার্বিকভাবে জোগান ও চাহিদার কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ছে। ভারতে মানুয়ের আয় কমে যাওয়ায় কীভাবে চাহিদা কমে শিল্পে সংকট নেমে এসেছে তাও উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাসে রিজার্ভ ব্যাংকের সমীক্ষায় দেখা গেছে, শহরে চাহিদা বিপুল হারে হ্রাস পেয়েছে। যাত্রীবাহী গাড়ির বিক্রি ২০২০-২১ প্রথম ত্রৈমাসিকে গত বছরের যা বিক্রি হয়েছে তার ৫ ভাগের ১ ভাগে দাঁড়িয়েছে। মোটর সাইকেল বিক্রি গত বছরের বিক্রির মাত্র ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মহামারিতে বিমান পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। আনলকের সময়ে জুলাইতে রিজার্ভ ব্যাংক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে নিত্য ভোগ্যপণ্যের বিক্রিও বিপুল হারে কমেছে শহরাঞ্চলে। শিল্পে মূলধনী পণ্যের উৎপাদন কমেছে ৩৬.৯ শতাংশ হারে। এছাড়া মূলধনী পণ্য আমদানি কমেছে ২৪.৪ শতাংশ হারে। নির্মাণ শিল্প থমকে গেছে। এতে ব্যবহৃত ইস্পাতের চাহিদা একই সময়ে কমেছে ২৯ শতাংশ হারে। সিমেন্টের চাহিদা কমেছে ৬ শতাংশ হারে। রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়েছে, চাহিদা কমায় উৎপাদন কমেছে। সার্বিকভাবে এতে মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার (জিডিপি) হ্রাস পেয়ে অধোগতির হার বাড়ছে। এদিকে মন্দায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে মোদি জমানায় বারে বারে সুদের হার কমিয়েছে রিজার্ভ ব্যাংক। এক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক নীতির বদল ঘটেছে। সুদের হার পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের উপর আগে জোর দিয়ে তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতে ধাপে ধাপে সুদের হার কমানো হয়েছে। গত বছরে চার দফায় ৪ শতাংশের উপর সুদ কমানো হয়েছে। অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে জোর না দেওয়ায় মহামারিতে সবকিছুর চড়া হারে দাম বেড়ে চলছে।
এই অবস্থায় প্রয়োজন ছিল সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেদিকে নজর দিচ্ছে না। মোদী সরকার মহামারিতে অর্থনীতি চাঙা করতে যে প্যাকেজের ঘোষণা করেছিল তাকে বহরে যতই বড় করে দেখানোর চেষ্টা হোক আসলে তা যে পর্যাপ্ত নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কেন্দ্রীয় সরকার করোনা মহামারি মোকাবিলার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে অপরিকল্পিত লকডাউন করে দেশের মানুষের রুটিরুজির ওপরে চরম আঘাত নামিয়ে এনেছে। একদিকে করোনা সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে, মানুষ বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাচ্ছেন। অন্যদিকে দেশের প্রায় ১৪ কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছে। এই দূর্যোগের মধ্যেও কর্পোরেট মুনাফা অক্ষুন্ন রাখতে মোদী সরকার শ্রম আইনে শ্রমিকদের অধিকারগুলি খারিজ করে দিচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক মন্দার বোঝা চেপে বসছে দেশবাসীর ঘাড়ে। এই অবস্থায় সিপিআই (এম) দাবি করেছে, জনস্বাস্থ্যে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে যাতে মহামারি মোকাবিলা করে মানুষকে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া যায়। আয়করের আওতার বাইরে থাকা সব দেশবাসীকে আর্থিক সাহায্য ও রেশনের মাধ্যমে খাদ্য দিতে হবে। কর্মসংস্থান প্রকল্পগুলোতে বেশি করে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে, পিএম কেয়ারসের নামে টাকা লুট বন্ধন্ধ করে সব টাকা মহামারি মোকাবিলায় খরচ করতে হবে, ইত্যাদি ১৬ দফা দাবিতে সিপিআই (এম) সপ্তাহব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করল দেশজুড়ে। এই দাবিগুলোর মধ্যেই রয়েছে বামপন্থী বিকল্প, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে বাঁচানোর বিকল্প রাস্তা, মানুষকে বাঁচানোর একমাত্র রাস্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English