Thursday, June 20, 2024
spot_img
Homeধর্মশান্তি প্রতিষ্ঠায় নবীদের সমঝোতা ও সন্ধি

শান্তি প্রতিষ্ঠায় নবীদের সমঝোতা ও সন্ধি

ইসলামের সার্বিক নীতিমালা ইহকালীন ও পরকালীন শান্তির জন্যই প্রণীত হয়েছে। জান্নাত সেই শান্তির চূড়ান্ত স্তর। সেটিই মুসলমানদের মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট মানুষের কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর জীবনও স্বর্গে পরিণত হয়। নবী-রাসুলরা মানুষকে এই শান্তির পথ দেখিয়েছেন। তাঁরাই মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন। মানুষকে করেছেন চিরশান্তির পথিক আর পৃথিবীকে পরিণত করেছেন শান্তির আবাসে। সব নবী পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করেননি। যাঁরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাঁরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন। শান্তি রক্ষার প্রয়োজনে পরমতসহিষ্ণুতা, ধৈর্য, ক্ষমা, সমঝোতা ও ভালোবাসার পথ অবলম্বন করেছেন।

দাউদ (আ.)-এর পরমতসহিষ্ণুতা : দাউদ (আ.) ও সুলাইমান (আ.)-এর একটি ঘটনা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং স্মরণ করো দাউদ ও সুলাইমানের কথা, যখন তারা বিচার করছিল শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে; তাতে রাত্রিকালে প্রবেশ করেছিল কোনো সম্প্রদায়ের মেষ; আমি প্রত্যক্ষ করছিলাম তাদের বিচার। এবং আমি সুলাইমানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং  তাদের প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আমি পর্বত ও বিহঙ্গকুলকে অধীন করে দিয়েছিলাম—তারা দাউদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত; আমিই ছিলাম এই সময়ের কর্তা।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৭৮-৭৯)

আয়াতে বর্ণিত বিষয়টি হলো—দুজন লোক দাউদ (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হয়। তাদের একজন মেষের মালিক এবং অন্যজন শস্যক্ষেত্রের মালিক। শস্যক্ষেত্রের মালিক মেষের মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল, মেষযূথ রাতে তার শস্য নষ্ট করে দিয়েছে। (মেষযূথের মূল্য বিনষ্ট শস্যক্ষেত্রের সমান ছিল) দাউদ (আ.) রায় দিলেন যে মেষযূথের মালিক তার সব মেষ শস্যক্ষেত্রের মালিককে অর্পণ করবে। রায় নিয়ে বাদী ও বিবাদী দাউদ (আ.)-এর আদালত থেকে বের হলে দরজায় দাউদ (আ.)-এর পুত্র সুলাইমান (আ.)-এর সঙ্গে তাদের দেখা হয়। তিনি তাদের কাছ থেকে রায়ের আদ্যোপান্ত শোনেন। অতঃপর সুলাইমান (আ.) বলেন, ‘আমি রায় দিলে এর চেয়ে উত্তম হতো এবং উভয় পক্ষ উপকৃত হতো।’ তারপর তিনি পিতাকে বিষয়টি জানালেন, আপনি মেষযূথ শস্যক্ষেত্রের মালিককে দিয়ে দিন। সে এগুলোর দুধ ও পশম দ্বারা উপকৃত হোক। আর ক্ষেত মেষযূথের মালিককে দিয়ে দিন, সে তাতে চাষাবাদ করে ফসল উৎপাদন করুক। যখন শস্যক্ষেত্র মেষযূথের বিনষ্ট করার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে তখন শস্যক্ষেত্র ক্ষেতের মালিককে আর মেষযূধ মেষযূথের মালিককে ফেরত দিন। দাউদ (আ.) খুশি হয়ে উভয় পক্ষকে ডেকে তা কার্যকর করেন। এভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা হলো। সবাই খুশি হলো।

ইউসুফ (আ.)-এর ধৈর্য ও ক্ষমা : ইউসুফ (আ.) মিসরের খাদ্যমন্ত্রী এবং পরে সেখানকার বাদশাহ হয়েছিলেন। ওই সময় সে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষ দূরদূরান্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের কেনান এলাকা থেকে খাদ্যসামগ্রী লাভের আশায় ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরাও মিসরে আসে। হাজির হয় ইউসুফ (আ.)-এর দরবারে। প্রায় ৩০ বছর আগে যে ভাইয়েরা তাঁকে কূপে ফেলে দিয়েছিল তারা আজ অসহায় হয়ে খাদ্য ক্রয় করতে এসেছে। তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে ইউসুফ (আ.) মিসরের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু ইউসুফ (আ.) ঠিকই তাদের চিনতে পেরেছেন। কিছু নাটকীয়তার পর পরিচয় দিয়ে তাদের ক্ষমা করে দেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায়—‘ইউসুফ (আ.) বলেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সব দয়ালুর চেয়ে অধিক দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯২)

ইউসুফ (আ.) প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পিতা-মাতা ও ভাই-বোন নিয়ে শান্তির আবাস গড়েন। পরস্পর প্রতিহিংসার স্থলে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিধি সম্প্রসারণ করেন।

রাসুল (সা.)-এর সমঝোতা ও ভালোবাসা : রাসুল (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়। তিনি মদিনায় পরস্পরবিরোধী চিন্তা, সংস্কৃতি ও ধর্মানুসারীদের একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ঐকমত্যে উপনীত করতে সচেষ্ট হন। তিনি সবাইকে একটি লিখিত চুক্তির অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন। এ চুক্তিই ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত।

কাজেই বলা যায়, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও দেশপ্রেমে ঐকমত্যের আলোকেই ইসলামী রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গোত্র-উপগোত্রে বিভক্ত জাতি শান্তিপূর্ণ জীবন ফিরে পায়। মহান আল্লাহ রাসুল (সা.)-কে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে তিনি সাথিদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিতেন। আল্লাহ বলেন, ‘এবং কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো, অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।’  (সুরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

ষষ্ঠ হিজরিতে রাসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে ওমরাহ পালন করতে মক্কায় রওনা হয়েছিলেন। মক্কার অদূরে পৌত্তলিক কুরাইশদের বাধার মুখে সন্ধি করে ফিরে আসেন, যা ইতিহাসে ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। বাহ্যত এটিকে পরাজয় মনে হলেও মহান আল্লাহ একে ‘প্রকাশ্য বিজয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়।’

(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১)

আসলে হয়েছেও তা-ই। হুদাইবিয়ার সন্ধিই মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করে। এভাবেই রাসুল (সা.) সংঘাত পরিহার করে সমঝোতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments