Wednesday, April 17, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামরিজার্ভ বাঁচাতে টাকায় বৈশ্বিক লেনদেন নিয়ে ভাবা উচিত

রিজার্ভ বাঁচাতে টাকায় বৈশ্বিক লেনদেন নিয়ে ভাবা উচিত

আবু আহমেদ

চারদিকের অবস্থা ভালো না। সারা বিশ্বেই অর্থনীতি খারাপ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। লোকসংখ্যা অনেক বেশি।

বিজ্ঞাপনএখানে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সহজেই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এ জন্য সময় থাকতে আমাদের কোমর শক্তভাবে বাঁধতে হবে। অর্থাৎ খরচ কমানোয় সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে, সাম্প্রতিককালে আমাদের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও আমদানি ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসছে। একসময় শ্রীলঙ্কার ভালো রিজার্ভ ছিল। সেটা শেষ হতে এক বছরের বেশি সময় লাগেনি। তাই আমাদেরও খুব চিন্তা-ভাবনা করে ব্যয় করতে হবে। যে ব্যয়টা না করলেই নয়, শুধু সেটাই করতে হবে।

এখন সময়টা হচ্ছে টিকে থাকার। আমাদের টিকে থাকতে হবে এবং টিকে থাকার প্রক্রিয়ার মধ্যে দরিদ্র লোকদেরও রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে যা যা করা উচিত, তার মধ্যে কিছু পদক্ষেপ সরকার এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে। যেমন—আমদানি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—এগুলো যথাসময়েই নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয় নিয়েও ভাবা দরকার। এসব খাতে বরাদ্দের ব্যাপারে আরো কঠোর হওয়া উচিত এবং জবাবদিহিমূলক পদ্ধতি দাঁড় করানো উচিত। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ভ্রমণের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা দরকার। বিশেষ করে সংকট না কাটা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেন বছরে একবারের বেশি বিদেশে যেতে না পারেন, সে ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ ডলারের চাহিদা বাড়ার পেছনে ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণ বড় ভূমিকা রাখে।

এসব পদক্ষেপের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হতে পারে বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে ডলারের পাশাপাশি কিছু পরিমাণে টাকার ব্যবহার শুরু করা। আমাদের যেসব শক্তিশালী বন্ধু রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি, তাদের দিয়ে কাজটা শুরু করা যেতে পারে। যেমন—ভারত একটি। এরই মধ্যে ভারত এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে। তারা বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে কিছু পরিমাণে রুপির ব্যবহার করছে। যেমন—রাশিয়া-ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনে রুবল ও রুপির হিসাব খোলা হয়েছে এবং তারা রাশিয়াকে রুপিতে অর্থ পরিশোধ করছে। আবার রাশিয়াও ভারতকে রুবলে অর্থ পরিশোধ করছে। শুধু রাশিয়া নয়, যাদের সঙ্গে ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সঙ্গেও ভারত কিছু পরিমাণে রুপিতে অর্থ পরিশোধের পথে হাঁটছে।

এ কাজটি বাংলাদেশেরও করা উচিত। অর্থাৎ আমরা ভারতীয় রুপি গ্রহণ করব আমাদের রপ্তানির বিপরীতে এবং তারা আমাদের টাকা গ্রহণ করবে তাদের রপ্তানির বিপরীতে। ভারত আমাদের কাছ থেকে যা ক্রয় করে, তার চেয়ে সাত থেকে আট গুণ বেশি আমরা তাদের কাছ থেকে ক্রয় করি। আমি বলছি না যে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের পুরোটাই টাকা-রুপিতে লেনদেন করতে হবে। আমার পরামর্শ হচ্ছে, একটা মাত্রা পর্যন্ত বাংলাদেশি টাকা যাতে তারা পেমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করে। আমরা যদি ভারতের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে টাকা-রুপি ব্যবস্থাটি চালু করতে পারি, তাহলে ডলারের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে। এটাই আসল কথা। এটা সুসম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই সম্ভব। এর মধ্য দিয়ে আরেকটি জিনিস ঘটবে। তাতে টাকার চাহিদা সৃষ্টি হবে এবং টাকার মান বাড়বে। আর ডলারের ওপর চাপটাও কমে আসবে।

একই প্রচেষ্টা চালানো যেতে পারে চীনের সঙ্গেও, যাতে দুই দেশের বাণিজ্যের একটা অংশ ইউয়ান-টাকায় লেনদেন হবে। পাকিস্তানের সঙ্গেও রুপি ও টাকায় লেনদেনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তাদেরও একই সমস্যা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেই। আমাদের একই সমস্যা, রিজার্ভ কমে আসছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ ভারত ও চীনের সঙ্গে শুরু করতে পারে। এরপর যাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব সুদৃঢ়, তাদের সঙ্গে এটা শুরু করব। এই উদ্যোগে ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে; যদিও দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে ভারতের যে বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে তা ডলারভিত্তিক নয়। সেটা হচ্ছে ডুয়াল কারেন্সি বা ইরানির রিয়াল ও ভারতীয় রুপি বিনিময়।

বাংলাদেশ বিষয়টি চেষ্টা করে দেখতে পারে। শুরুতে হয়তো আমাদের অনেকেই ততটা গুরুত্ব দেবে না। কিন্তু যেখানে গুরুত্ব পেতে পারি, তাদের সঙ্গে অন্তত চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। তাহলে আমাদের বাণিজ্যের একটা অংশ, অন্তত ২০ শতাংশও যদি আমরা টাকায় পরিশোধ করতে পারি, সেটাই হবে আমাদের জন্য বিরাট সাফল্য। এ জন্য সুদৃঢ় রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা লাগবে, ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাসহ সব ধরনের প্রভাবক কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো টাকার মান ধরে রাখা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নরও এটা বলেছেন। সরকার যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, তাহলে টাকার মূল্যমান অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। সেটা ধরে রাখার জন্য টাকার চাহিদা সৃষ্টির উপায়গুলো কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে ঘোষিত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিটি আমি মনে করি ঠিকই আছে। এর একটা ক্ষতিকর দিক হলো, এতে বিনিয়োগের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে, বিনিয়োগ কমে যাবে। কিন্তু কিছুটা হলেও টাকার মূল্যমান ধরে রাখা যাবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও তাই বলা আছে। নতুন গভর্নর মহোদয়কে এ বিষয়ে তীক্ষ নজর রাখতে হবে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, অর্থনীতিতে এটা হবে না, সেটা হবে—এই ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করা যাবে না। এটা মোটেও উচিত হবে না। আমাদের সবাইকেই এটা মাথায় রাখতে হবে। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে, বিপদ আসন্ন—এই ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টির ক্ষতিকর দিকটা হলো, এতে যেসব মানুষের কাছে টাকা আছে তাঁরা তা লুকাতে থাকবেন, ধরে রাখতে চাইবেন, ডলার কেনা চালিয়ে যাবেন, আর্থিক খাতে নানা রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। মোটকথা সুচিন্তিত ও সুশৃঙ্খল উপায়ে নীরবে সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে খুব কৌশলে বাংলাদেশকে অগ্রসর হতে হবে।

আমি সব সময় বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তার সরকারি খাতে খরচ কমানো উচিত এবং এই মুহূর্তে এটা বেশি করে করা উচিত। বেসরকারি খাতেও তাই। বেসরকারি খাতে বাজারভিত্তিক পদ্ধতিতে যতটা সম্ভব খরচ কমানো উচিত। আমার আন্তরিক পরামর্শ হচ্ছে, সময় থাকতে আমরা যদি আমাদের কোমরের বেল্ট টাইট না করি, সরকারি ও বেসরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থায় না থাকি, তাহলে এখন বিশ্ববাজারে যে অস্থিতিশীলতা চলছে—খাদ্যশস্যের দাম বাড়ছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, দেশে দেশে রিজার্ভ কমে যাচ্ছে, সেই অস্থিতিশীলতা থেকে আমরা রেহাই পাব না। তাই সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশকে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছর সময়টা পার করার জন্য যা যা করার দরকার সেসব প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

আরেকটি কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে যে সরকার অফিসের কাজের সময় কমাতে চাচ্ছে। এটা আমার কাছে ভালো কিছু মনে হচ্ছে না। কারণ অফিস সময়ের সঙ্গে বেসরকারি খাতের অর্থনীতির সংযোগ রয়েছে। সরকার যদি অফিস সময় বা কর্মদিবস কমায়, তাহলে বেসরকারি খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া লকডাউন জাতীয় কিছু চিন্তা করাও উচিত হবে না। বরং আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আগামী দুই মাসের রপ্তানি গতিবিধি খুব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য। তাই অফিস সময় না কমিয়ে আমাদের বরং অফিসের ব্যয় কমানো এবং নতুন নতুন কেনাকাটা ও নতুন নতুন প্রস্তুতি ব্যয় বরাদ্দ (এস্টাবলিশমেন্ট অ্যালোকেশন) থেকে বিরত থাকা উচিত।

এসব কাজ যদি করা যায়, তাহলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিষয়টা হচ্ছে, যদি টাকাকে সস্তা করে ফেলা হয়, তাহলে আমাদের জন্য বিপদ। তখন মূল্যস্ফীতি আরো বেগবান হবে। ডলার কিনতে হবে আরো অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে খুব সাবধানে চলতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে কৌশলী হতে হবে। বাংলাদেশ যদি নিজের অবস্থান ও হাতিয়ারগুলো কাজে লাগাতে পারে, তাহলে এই অঞ্চলের অন্যান্য অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ওপরে থাকবে—এমনটা আশা করা যায়। কিন্তু খারাপ হতে বেশি সময় লাগে না—এটাও মনে রাখতে হবে। জনগণের মধ্যে যদি হতাশার উদ্রেক হয়, সেটা হবে আরো বিপজ্জনক।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments