Thursday, June 20, 2024
spot_img
Homeজাতীয়রিজার্ভ চুরির ৬ বছর: উদ্ধারে অগ্রগতি নেই

রিজার্ভ চুরির ৬ বছর: উদ্ধারে অগ্রগতি নেই

৬ বছর আগে ২০১৬ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে। সেইদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হ্যাকিংয়ের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে গচ্ছিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছিল। গত শুক্রবার ছয় বছর পূর্ণ হয়। কিন্তু ঘটনার ছয় বছর পরেও বেশির ভাগ অর্থ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত চুরি যাওয়া এ অর্থের মধ্যে ফেরত আনা গেছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বাকি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার (৫৬১ কোটি টাকা) আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।এমনকি অর্থ ফেরত দেয়ার আশ্বাসও মেলেনি।

এ ছাড়া তিন বছর আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হয়েছিল চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে খরচ হয়েছে ৩ কোটি টাকা। বর্তমানে এই খরচ আরও বেড়েছে। তবে খরচ বাড়লেও অর্জন শূন্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ওদিকে অর্থ উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে যে আইনি লড়াই চালাচ্ছে সরকার, তাতেও খুব একটা অগ্রগতি নেই। এদিকে নানা অজুহাতে ফরাসউদ্দিন তদন্ত কমিটির রিপোর্টও প্রকাশ করা হয়নি জনসম্মুখে। এতে ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে অভিযুক্ত ও জড়িতরা।
সূত্র জানায়, রিজার্ভ চুরি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টে যে মামলা করেছিল, তাও টেকেনি। তবে অর্থ ফেরত ও জড়িতদের শাস্তির জন্য স্টেট কোর্টে মামলা হয়েছে। কিন্তু অর্থ ফেরত পাওয়ার আশার আলো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ২০১৬ সালে কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরিকে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বকালের সবচেয়ে দুঃসাহসী সাইবার হামলার স্বীকৃতি দিয়েছে। এই টাকা চুরি করতে গিয়ে হ্যাকাররা ব্যবহার করেছে নকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, দাতব্য সংস্থা ও ক্যাসিনোর বিস্তৃত এক নেটওয়ার্ক। ২০১৬ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। পরের দু’দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাপ্তাহিক ছুটি। সেই সুযোগটাই নিয়েছিল উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা, যারা পেছনে থেকে চুরির কাজটি করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার বিবরণ বলছে, হ্যাকাররা নেসট্যাগ ও ম্যাকট্রাক নামক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে নেটওয়ার্কে ঢুকতে পেরেছিল। একদিন পরে চুরির তথ্য জানতে পারে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা গোপন রাখে আরও ২৪ দিন। আর বিষয়টি তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় চুরি যাওয়ার ৩৩তম দিনে।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা মো. মাসুদ বিশ্বাস বলেন, চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা থাকলেও কবে নাগাদ পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট কোর্টে মামলা চলছে। এখন আমাদের আর কিছু করারও নেই। সেখানে আমাদের আইনজীবী নিয়োগ করা আছে, এখন নির্ধারিত সময়ে সময়ে শুনানি হবে। এখন মামলার মাধ্যমেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। ফলে টাকা উদ্ধারে এখন আদালতের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে।

অবশ্য ঘটনার পর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল, পুরো অর্থ দুই-তিন বছরের মধ্যে ফেরত আনা সম্ভব হবে। চুরির প্রথম বছর শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের স্বেচ্ছায় দেয়া অর্থের বাইরে আর এক টাকাও উদ্ধার হয়নি। ফিলিপাইন থেকে অর্থ ফেরতে কোনো অগ্রগতি না থাকায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বাংলাদেশের মামলা চলছে।
জানা গেছে, রিজার্ভ থেকে চুরির অর্থ ফেরত দেয়ার জন্য শুরুর দিকে ফিলিপাইন ব্যাপক সহায়তা করেছিল। দেশটির বিভিন্ন সংস্থা তখন বাংলাদেশের পক্ষে ১২টি মামলা করে। তবে দেশটির সরকার পরিবর্তনের পর সেই তৎপরতায় ভাটা পড়ে। সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হয়নি। যে কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে তৃতীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করে বাংলাদেশ। প্রথমে ২০১৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটন সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে বাংলাদেশের পক্ষে একটি মামলা দায়ের করে নিয়োগকৃত ল’ ফার্ম কোজেন ও্থকনর। মামলায় ফিলিপাইনের পাঁচটি আর্থিক ও ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান, দেশটির ১২ জন, তিনজন চীনা নাগরিকসহ মোট ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ২০২০ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ওই আদালত জানিয়ে দেয়, মামলাটি তাদের কোর্টের এখতিয়ারাধীন নয়। তবে স্টেট আদালতে মামলা চলতে পারে বলে মত দেন ফেডারেল আদালত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৭শে মে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট আদালতে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, রিজার্ভ চুরির ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের মধ্যে ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার নিয়ে ফিলিপাইনের আদালতে কমপক্ষে ১২টি মামলা চলমান। এরমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ জব্দও করে রেখেছেন দেশটির আদালত। তবে এসব মামলার অগ্রগতি খুবই মন্থর। ফলে ফিলিপাইনের মামলার মাধ্যমে টাকা আদায়ের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক বা নিউ ইয়র্ক ফেডে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১০ কোটি টাকা চুরি হয়। এরমধ্যে বিভিন্ন সময়ে ফেরত আসে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এখনো চুরি হওয়া অর্থের ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ৫৬১ কোটি টাকা উদ্ধার হয়নি।

এদিকে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলেও বাংলাদেশেও কারও বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল সরকার। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রিজার্ভ চুরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অরক্ষিত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন দায়িত্বহীন। আর চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটানো হয় আন্তর্জাতিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক সুইফট সার্ভারের সঙ্গে স্থানীয় লেনদেনের নেটওয়ার্ক জুড়ে দিয়ে।

এদিকে রিজার্ভ চুরির বিষয়টি জানাজানি হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে ২০১৬ সালের ১৫ই মার্চ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। একইদিন বাংলাদেশ ব্যাংক মতিঝিল থানায় মামলা করে এবং পরের দিন মামলা হস্তান্তর করা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে। ফরাসউদ্দিন কমিটি কাজ শুরু করে ২০শে মার্চ থেকে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে, একই বছরের ৩০শে মে তদন্ত প্রতিবেদন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে পেশ করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার ফরাসউদ্দিন কমিটির সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এমনকি অনুসন্ধান শেষ করে অভিযোগপত্রও দেয়নি সিআইডি। এ কারণে দেশের মানুষ আজও জানতে পারেনি রিজার্ভ চুরি যাওয়ার নেপথ্যে কারা ছিল।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে দায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরের এমন ১৩ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে পুলিশ ওই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে এখন পর্যন্ত আট দেশের অন্তত ৭৬ ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা উচিত। প্রয়োজন হলে এই ঘটনা তদন্তে বিশেষজ্ঞ কিছু মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এই ঘটনার সঠিক তদন্ত করতে না পারলে বারবার এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনে (আরসিবিসি) খোলা ব্যাংক হিসাবে ৮ কোটি ১০ লাখ ১ হাজার ৬২৩ ডলার এবং শ্রীলঙ্কার শালিখা ফাউন্ডেশনের নামে আরও ২ কোটি ডলার স্থানান্তরের আদেশ দেয়া হলেও ইংরেজি ‘ফাউন্ডেশন’ বানানে ‘ও’ অক্ষরটি ছিল না। এই ভুল বানানের কারণে শালিখা ফাউন্ডেশনের নামে পাঠানো অর্থ স্থানান্তর হওয়ার আগেই আটকে যায়, যা পরে ফেরত আসে। কিন্তু ফিলিপাইনে পাঠানো চারটি হিসাবে অর্থ স্থানান্তর হয়ে যায়।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments