Monday, December 5, 2022
spot_img
Homeআন্তর্জাতিকযে কারণে চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠ হচ্ছে

যে কারণে চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠ হচ্ছে

পশ্চিমা চাপের মধ্যে চীন এবং রাশিয়া একে অপরের সাথে এমনভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে যা বিগত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। চীন ও রাশিয়া রাজনৈতিক জোটে যাচ্ছে কারণ পশ্চিমা চাপ ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের কাছাকাছি নিয়ে আসছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত সপ্তাহে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি অনলাইন ফোরামে মিলিত হয়েছিলেন। বৈঠকের পর উভয় নেতাই একে অপরের প্রশংসা করেন এবং পশ্চিমা হুমকির বিরুদ্ধে তাদের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের উপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০২২ সালের শুরুতে বেইজিংয়ে তাদের সামনাসামনি হওয়ার কথা রয়েছে।

পশ্চিমা চাপের মধ্যে চীন এবং রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হওয়া নিয়ে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ একটি প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়ঃ
চীন-রাশিয়ার সংযোগ স্নায়ু যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয় কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের (যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ধারাবাহিক এবং দৃঢ়) বিপরীতে সেটা ওঠানামা করেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-পশ্চিম ইউরোপ সম্পর্কের কারণে ন্যাটো (বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জোট এবং সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে স্থায়ী সামরিক চুক্তিগুলোর মধ্যে একটি) তৈরি হয়েছে, সেখানে মস্কো এবং বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের প্রতি সন্দেহজনক মনোভাব পোষণ করে আসছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় যখন দুটি রাষ্ট্রেই কমিউনিস্ট নেতৃত্ব ছিল তখনো পশ্চিমা জোটের বিপরীতে তারা  স্থিতিশীল সম্পর্ক উপভোগ করতে পারেনি, ১৯৬১ সালে তা ভেঙে যায়। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে, উভয় রাষ্ট্রই পুঁজিবাদী রূপ নিয়েছে।

বৃটিশ থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট এর সিনিয়র সহযোগী ফেলো রাফায়েলো প্যান্টুচি বলেন, “এখন অবধি, সাধারণ ধারণা হলো রাশিয়া এবং চীন এমন এক জোড়া দেশ যারা মূলত একসাথে কাজ করছে কিন্তু তারা একে অপরকে পছন্দ করে না। তারা একসাথে কাজ করতে নিজেদের বাধ্য মনে করছে বলেই তা করছে”।

“কিন্তু সেই অনুমান এখন আর সত্য নাও হতে পারে। আমি মনে করি, পরিবর্তন হয়েছে এটা যে, উভয় দেশই একরকম উপলব্ধিতে পৌঁছেছে যে, আসলে বিশ্ব এমনভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে যে চীন-রাশিয়া একদিকে এবং পশ্চিমা দুনিয়া অন্য দিকে,” প্যান্টুচি যোগ করেন।

নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন থেকে অকাস

চীন ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণে তারা প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া যে নিরাপত্তা (অকাস) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তার ফলে তারা সামরিক বিবেচনায় বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিশালী দেশের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে পারবে।

প্যান্টুচি সে দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “তারা (চীন-রাশিয়া) যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলছে তার কয়েকটি বেশ আকর্ষণীয়। তাই আমরা সম্প্রতি রাশিয়ানদের অকাস সম্পর্কে কথা বলতে দেখেছি। এটি এমন একটি চুক্তি যার সাথে রাশিয়ানদের কোন সম্পর্ক নেই এবং এটি রাশিয়ানদের জন্য মোটেও কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্র নয়। তবুও, বেশ কয়েকজন সিনিয়র রাশিয়ান কর্মকর্তা আছেন যারা বলছেন যে এটি বিশ্বের জন্য একটি খারাপ জিনিস। একই সময়ে আমরা চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন যেটা জার্মানি থেকে রাশিয়া গেছে, সেটা সম্পর্কে কথা বলতে দেখি। এটি এমন কিছু নয় যার সাথে চীনের সম্পর্ক আছে তারপরও চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে একটি মতামত প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে।”

পশ্চিমের জন্য চ্যালেঞ্জ?

মস্কো-ভিত্তিক ইউরেশিয়া বিশ্লেষক এসরেফ ইয়ালিঙ্কিলিলি বলেন, “চীন এবং রাশিয়া উভয়কে লক্ষ্য করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো দুটি রাষ্ট্রকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।  ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত স্নায়ু যুদ্ধের পর মস্কোর বৃহত্তম সামরিক মহড়াটি বেইজিংকে সাথে নিয়েই পরিচালিত হয়েছিল”।

প্যান্টুচি বলেন, “রাশিয়া ও চীন ইতিমধ্যেই পশ্চিমা জোটকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা স্পষ্টভাবেই পশ্চিমা জোটকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। কিন্তু তাদের চ্যালেঞ্জ জানানো নির্ভর করবে
বিশ্ব মঞ্চে তাদের অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে, কিছু জায়গায় যুদ্ধ ক্ষেত্র বাছাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে নয়”।

মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে সামরিক জোট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেন, “আমাদের এখন এমন প্রচেষ্টার প্রয়োজন নেই। তবে উভয় রাষ্ট্রই তাইওয়ান এবং ইউক্রেনের মতো জায়গায় একে অপরকে সমর্থন করে”।

সহযোগিতার অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ানরা চীনের শক্তিকে ভয় পায়। চীনের অর্থনৈতিক শক্তি যে কেবল কেবল পশ্চিমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় তা নয়, সেটা রাশিয়ানদেরও ভীত করে।

ইয়ালিঙ্কিলিলির যেমন বলেন, “দুটি দেশের মধ্যে স্থল সীমান্ত রয়েছে এবং পূর্ব রাশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কার্যকলাপ (বিশেষ করে সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায়) ক্রেমলিনের অভিজাতদের নার্ভাস করে তোলে। এই অঞ্চলগুলো অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছে প্রায় আত্মসমর্পণ করে ফেলেছে।। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ শুধু পশ্চিমাদের জন্যই হুমকি নয়, মধ্য এশিয়ায় মস্কোর আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে বলে সেটা রাশিয়ার জন্যও হুমকি”।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যও মস্কোর বিরুদ্ধেই বেড়েছে।

রাশিয়ানরা সর্বদা চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে উদ্বিগ্ন উল্লেখ করে প্যান্টুচি বলেন, “কিন্তু আমি মনে করি রাশিয়ানরা এমন কিছু পারে যা চাইনিজরা করতে পারে না। রাশিয়ানরা তাদের তুলনায় সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে অনেক বেশি ইচ্ছুক”।

তিনি বলেন, “শেষবার চীন কখন কোন দেশে আক্রমণ করেছিল তা কেউ মনে না করতে পারলেও, রাশিয়া গত এক দশকে দুবার তা করেছে। যদিও এটা সত্য যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রবলভাবে চীনের পক্ষে যায়, কিন্তু মস্কোর সামরিক শক্তি ক্রেমলিনকে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে রাশিয়ানদের প্রতি ‘অবিশ্বাস’ প্রশমিত করতে সাহায্য করে। ফলে, উভয় শক্তিই তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করতে থাকবে। তারা আরও কাছাকাছি হতে চলেছে। আমি মনে করি না পরস্পরের প্রতি তাদের খুব বিশ্বাস থাকবে। তবে আমি মনে করি তারা আরও কাছে আসবে। পশ্চিমের সাথে শত্রুতার কারণে সেই নৈকট্যটি মূলত তাদের একত্রে আবদ্ধ করবে।”

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments