Sunday, March 3, 2024
spot_img
Homeধর্মযেসব মূলনীতির আলোকে তাবলিগের কার্যক্রম পরিচালিত হয়

যেসব মূলনীতির আলোকে তাবলিগের কার্যক্রম পরিচালিত হয়

বিশ্বজনীন শান্তি, মানবতার ধর্ম ইসলামকে ‘বিশ্বধর্মে’র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাবলিগের অবদান অপরিসীম। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজে ঘোষণা করেন ‘উপস্থিতগণ যেন অনুপস্থিত সবার কাছে আমার বাণী পৌঁছে দেয়’ (মুওআত্তা)।

তাঁর (সা.) আদর্শ  ও শিক্ষা প্রচার, প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইহ-পারলৌকিক মুক্তির উপায় তাবলিগ। উদ্দেশ্য হলো ইসলামী জাগরণের মাধ্যমে আত্মসংশোধন, ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা ও বিস্তরণ।

মাওলানা ইলিয়াস আলী (রহ.)-এর (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) প্রচেষ্টায় তাবলিগের বিজ্ঞানভিত্তিক জয়যাত্রার সফলতম উদ্যোগ ‘বিশ্ব ইজতিমা’। ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্কে, ১৯৪৮ চট্টগ্রামে, ১৯৫৮ নারায়ণগঞ্জে ইজতিমার পর ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা ময়দানে আয়োজিত ইজতিমায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ‘মুবাল্লিগ’ (তাবলিগে আত্মনিয়োগকারী) অংশগ্রহণের ফলে তা ‘বিশ্ব ইজতিমা’র পরিচিতি পায়। ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি বিশ্ব ইজতিমা টঙ্গীর তুরাগ নদের (কহর দরিয়া) উত্তর-পূর্ব তীরের ১৬০ একর জায়গায়, যা ২০১১ থেকে দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

তাবলিগের মৌলিক কাঠামোতে গুরুত্ব পায়—

১. কালেমা

২. নামাজ

৩. ইলম ও জিকর

৪. ইকরামুল মুসলিমিন (মুসলমানের সম্মান-সহমর্মিতা)

৫. সহিহ নিয়ত (কর্মের পরিশুদ্ধতা)

৬. তাবলিগ (ধর্মের প্রচার)।

এ ‘ছয় উসুলে’র (মূলনীতি) যথার্থ উপলব্ধি ও প্রকৃত ইসলামী জীবনবোধের জন্য আল্লাহর দেওয়া জান-মাল খরচ করে মসজিদে মসজিদে চল্লিশ দিন অবস্থান করাকে ‘চিল্লা’ বলে। জীবনে তিন চিল্লা, বছরে এক চিল্লা, প্রতি মাসে তিন দিন এ উদ্দেশ্যে ব্যয় করা জরুরি। সপ্তাহে দুটি ‘গাশত’ বা দ্বিনের দাওয়াতের জন্য ঘোরাফেরা, যার একটি নিজ মহাল্লায় এবং আরেকটি অন্য মহাল্লার মসজিদে। বাড়ি ও মসজিদে দৈনিক তালিমের আয়োজন এবং সব কাজে ‘মাশওয়ারা’ (পরামর্শ) করা।

প্রতিদিন অন্তত আড়াই ঘণ্টা ‘মেহনত-ফিকির ও সহবত’ বজায় রাখা এবং তিন দিনের ‘জামাআ’ত’ তৈরি করা তাবলিগকারীর কর্তব্য। এমন দায়িত্বের সমন্বয়কারীকে বলে ‘জিম্মাদার’। এমন তৎপরতাকে ‘তাবলিগের পাঁচ আমল’ এবং তাবলিগি একক বা পরিমাপকে ‘নিসাব’ বলে। এ ছাড়াও গ্রন্থ রচনা, সভা-সমাবেশ, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রয়াসগুলোও তাবলিগ, যার ‘বহুত ফায়দা’ আছে।

তাবলিগের নিজস্ব কিছু পরিভাষা রয়েছে, যেমন:

· ইজতেমা— মহাসমাবেশ।

· তাবলিগ— প্রচার করা, পৌঁছানো।

· আমির— দলনেতা।

· রাহবার— পথপ্রদর্শক।

· মামুর— আমিরের অনুসরণকারী।

· মুতাকাল্লিম— কথক।

· গাশত— ভ্রমণ, ঘোরাফেরা করা, ধর্মের বিশেষ প্রচারাভিযান।

· উমুমি গাশত- দলগতভাবে দ্বিনের দাওয়াতে গমন।

· খুসুসি গাশত— বিশেষ কাউকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য বের হওয়া।

· তাশকিল— গঠন, রূপদান, প্রচেষ্টা। অর্থাৎ ধর্মীয় কাজে উৎসাহ দেওয়া।

· তালিম— শিক্ষা (শিক্ষার আসর)।

· আম বয়ান— সবার উদ্দেশে বক্তৃতা।

· খাস বয়ান— বিশেষ কোনো শ্রেণির জন্য প্রদত্ত বক্তৃতা।

· ইকরাম— সম্মান দেখানো, সহযোগিতা, খেদমত করা।

· ইস্তেকবাল— অভ্যর্থনা।

· খেদমত— সেবা করা (জামাতের সাথিদের খাবারসহ বিভিন্ন আয়োজনে দায়িত্ব পালন)।

· মাশওয়ারা— পরামর্শ।

· সামানা— আসবাবপত্র।

· খিত্তা— টুকরা জায়গা, এলাকা (ইজতেমা মাঠের নির্ধারিত এলাকা)।

· চিল্লা— ৪০ দিনের জন্য বিভিন্ন মসজিদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়া।

· তিন চিল্লা— চার মাস মেয়াদে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়া।

· সাল— এক বছর আল্লাহর রাস্তায় কাটানো।

· জোড়— বিভিন্ন স্তরের সঙ্গীদের আঞ্চলিক বিশেষ সম্মেলন।

· শবগুজারি— তাবলিগের মারকাজে (আল্লাহর রাস্তায়) রাতযাপন।

· নুসরত— সাহায্য করা (বহিরাগত জামাতের কাজে সহযোগিতা করা)।

· উসুল— আদায় করা (তাবলিগি সফরের জন্য কাউকে বের করে আনা)।

· খুরুজ— তাবলিগের কাজে বের হওয়া।

· মোজাকারা— পরস্পর আলোচনা।

· তাকাজা— দ্বিনের বিভিন্ন প্রয়োজনে নিজের জান, মাল ও সময় ব্যয় করে ওই প্রয়োজন পূরণ করা।

বস্তুত তাবলিগের মাধ্যমেই ধর্মের অপব্যাখ্যা, ফতোয়াবাজি, জঙ্গিবাদ, অশিক্ষা, অপশিক্ষা, অর্ধশিক্ষা ও ধর্মান্ধতার অবসান সম্ভব। তাবলিগ একটি পরকালমুখী জাগতিক সেবামূলক ধর্মীয় কর্তব্য। একে ‘নবী ওয়ালা কাজ’ বলে। কেননা নবী-রাসুলগণের এমন দায়িত্ব শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মদীকেই (সা.) দেওয়া হয়েছে এবং এ জন্যই তারা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ‘খায়রা উম্মাত’ (সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি)। অন্যদিকে প্রিয় নবীর (সা.) নির্দেশ ‘একটি কথা হলেও তা আমার পক্ষ থেকে অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ (বুখারি)

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments