Sunday, June 16, 2024
spot_img
Homeজাতীয়যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতিবিরোধী সম্মেলন: কী বলবে বাংলাদেশ?

যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতিবিরোধী সম্মেলন: কী বলবে বাংলাদেশ?

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় আজ (সোমবার, ১১ ডিসেম্বর) শুরু হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী সম্মেলন। এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনার (অনুসন্ধান) মোছা. আছিয়া খাতুনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্মেলনে পাঠিয়েছে দুদক। সম্মেলন চলবে ৫ দিন ব্যাপি। জাতিসংঘের ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম অফিস এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। দুই বছর অন্তর এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজক দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র এবার দুর্নীতি বিরোধী সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। দশম ‘সেশন অব কনফারেন্স অব স্টেটস পার্টিজ অব ইউএন কনভেনশন এগেইনস্ট করাপশান’ শীর্ষক সম্মেলনে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার আসিয়া খাতুন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মো: মাহবুব হোসেনসহ অন্য কর্মকর্তারা এখন আটলান্টায় অবস্থান করছেন। যদিও আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ অংশ নিচ্ছেন। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের প্রকার-পদ্ধতি নিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় করবেন। গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চ মর্যাদার এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের নেতৃত্বে শক্তিশালী একটি প্রতিনিধি দলের অংশ গ্রহণই ছিলো প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো দুর্নীতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান,অর্জন ও বিসর্জন তুলে ধরার জন্য পাঠানো হয়েছে দুদকে নবনিযুক্ত কমিশনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলকে।

‘জাতিসংঘের ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম অফিস’ তত্ত্বাবধানে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র এবারের সম্মেলনের আয়োজক হিসাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে বিশ্ব নেতাদের সমবেত করছে। মার্টিন লুথার কিংয়ের নগরী আটলান্টায় জর্জিয়া ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস সেন্টারে অনুষ্ঠেয় এই সম্মেলন হচ্ছে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুর্নীতিবিরোধী সম্মেলন। প্রতি দুই বছর অন্তর দেশগুলো তাদের দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন করছে তা মূল্যায়নের জন্যে এই বৈঠকে মিলিত হয়। একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে সহযোগিতার মাধ্যমে কীভাবে আরও জোরদার করা যায় এই আলোচনাও সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

‘দ্য ইউএন কনভেনশন এগেইনস্ট করাপশন’ দুর্নীতি প্রতিরোধে একমাত্র সর্বজনীন আইনগত বাধ্যতামূলক চুক্তি। বিশ্বের ১৯০টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। কনভেনশনটি ভিয়েনায় আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হয় । ২০০৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাশ করা হয়। চলতি বছরে এটি ২০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) ধারণা সূচকে বিশ্বে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর পর্যায়ে রয়েছে। টিআই ছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নগামী। দুর্নীতিকে বাংলাদেশের একটি ক্রমাগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিশ্বের গ্রহণযোগ্য র‌্যাঙ্কিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বাংলাদেশ নিয়মিতভাবেই বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়।
০০১ সালের হিসেবে, সরকারি খাতে দুর্নীতি ছিল ‘স্থানীয়, দীর্ঘস্থায়ী, এবং সর্বব্যাপি। কিন্তু ২০২২ সালের টিআই’র ধারণা সূচকে ১৮০টি দেশের পাবলিক সেক্টরের মধ্যে ১০০ স্কেলে স্কোর করা হয়েছে। যাতে বাংলাদেশ ২৫ স্কোর করেছে। স্কোর অনুসারে র‌্যাঙ্ক করা হলে, সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ স্থান ১৪৭তম। টিআইবি’র ধারণা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে, স্কোর এবং র‌্যাঙ্ক উভয় দিক থেকেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের আগের অবস্থানটি বাংলাদেশের।

বিভিন্ন দাতা সংস্থার চাপে ২০০৪ সালে একটি আইনের মাধ্যমে স্বশাসিত ও স্বাধীন ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু সৃষ্টির শুরু থেকেই এটির ওপর লক্ষ্যনীয় হয়ে ওঠে সরকারের নিয়ন্ত্রণ। দুর্নীতি দমন এবং প্রতিরোধে অনেকাংশে প্রতিষ্ঠানটি অকার্যকর বিবেচিত হয়। এ সত্য কমিশনের চেয়ারম্যানগণও প্রায়শই স্বীকার করেন। গত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখ করার মতো তেমন অর্জন পরিলক্ষিত হয় না। বরং এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, ঋণের নামে ব্যাংক লোপাট, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (লিজিং কোম্পানি, সিকিউরিটি কোম্পানি, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি) জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ তছরুপ,আমদানি-রফতানিতে ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচার, সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, উন্নয়ন প্রকল্প ও পাবলিক প্রকিউরমেন্টের মাধ্যমে অর্থ লোপাট, আয়কর ফাঁকি, কর প্রশাসন, সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন এমনকি বিচার প্রশাসনে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। এ বাস্তবতায় দুদককে দেখা যায় অনেকটা নির্বিকার ভূমিকায়। আলোচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণতো দূরে থাক কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় দুর্নীতির সহায়ক ভূমিকায়। আমলাতান্ত্রিক গহীন গহ্বরে বন্দী এ প্রতিষ্ঠানকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় প্রান্তিক পর্যায়ের খুচরা দুর্নীতি নিয়ে। বিচারে ‘শাস্তির হার’ বাড়তি দেখানোর প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় দুর্নীতিতে চুনোপুটিদের বিরুদ্ধে গৃহিত ব্যবস্থাসমুহ। দুদক বছরের পর বছর পার করছে এসব কর্মকাণ্ড দিয়েই। এমন প্রেক্ষাপটে চলতিবছর আগস্টে দুদক পরিদর্শন করেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈশ্বিক দুর্নীতি দমন বিভাগের সমন্বয়ক রিচার্ড নেফিউ। সে সময় দুদক তাকে সংস্থার আইন, বিধি, কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। দুদক কার্যালয় থেকে বেরিয়ে রিচার্ড নেফিউ কোনো মন্তব্য না করলেও বাংলাদেশ ত্যাগের আগে তিনি বলে যান, অন্যান্য উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশের মতো বাংলাদেশেও দুর্নীতি জীবনের একটি অংশ। নিয়মিত নাগরিকরা মৌলিক পরিষেবার জন্য এবং সারি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নিয়তি ঘুষ দেয়। কর্মকর্তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য ঘুষের ওপর নির্ভর করে।

দুর্নীতি নিয়ে এই যখন ধারণা-তখন দেশের র্নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, দুর্নীতি প্রশ্নে বর্তমান সরকার ‘জিরো টলারেন্স’। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সম্মেলনে নিশ্চয়ই বাংলাদেশের দুর্নীতি প্রসঙ্গ উঠবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জবাব কি হবে? দুর্নীতি দমন প্রশ্নে কোন বিষয়টিকে ফোকাস করবে প্রতিনিধি দল? এ প্রশ্ন করা হয় দুদক সচিব মো: মাহবুব হোসেনকে। জবাবে তিনি বলেন, অগ্রিম বলার মতো কিছু নেই।

আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে বাংলাদেশ তথা দুদকের কী অবস্থান এবং বক্তব্য থাকছে- জানতে যোগাযোগ করা হয় দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হকের সঙ্গে। একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠালেও কোনো জবাব আসেনি।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদিকদের বলেন, এ সম্মেলন থেকে অন্যান্য দেশ কীভাবে দুর্নীতি দমন করে তা শেখা যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্জন তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে। দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন আছে। যেমন দুদক ও বিএফআইইউ প্রতিষ্ঠা। এগুলোকে কার্যকর করতে হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments