Wednesday, February 1, 2023
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামযুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণ কী

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণ কী

আন্তর্জাতিক অঙ্গণ থেকে বাংলাদেশ বেশ বড় ধরনের একটি ধাক্কা খেয়েছে। পঞ্চাশ বছরে যা ঘটেনি, তা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞার আঘাত এসেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দফতর র‌্যাব এবং সংস্থাটির সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, র‌্যাব ও উক্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের সময় বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, যার বেশিরভাগই বিরোধীদলের সদস্য, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে ৭ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র এমনকি যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ কিছু দেশে প্রবেশ করতে পারবেন না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সম্পদ থেকে থাকলে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি ওয়ালি আদেয়িমু বলেছেন, এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়, যেসব দেশ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করে নিপীড়ন ও নির্যাতন চালানো হয়, সেসব দেশের ওপর। এ নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাজ্য ও কানাডার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দেয়া হয়। কূটনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলাদাভাবে বাংলাদেশের আরও কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেশের ভাবমর্যাদাকে যে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে তাতে সন্দেহ নেই। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জার বিষয়।

দুই.
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণুতা, আইনের শাসনের অভাবের কথা বলে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, আইনবিদ ও সচেতন মহল সমালোচনা করে আসছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকার তাদের মানবাধিকার বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জোর করে অপহরণ, গুম, বিচারবার্হিভূত হত্যাকাণ্ড এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন নিয়ে প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি বিরোধীদলের রাজনৈতিক অধিকার সীমিতকরণ, ভোট জালিয়াতি ও সংঘাত-সংঘর্ষ এবং ভোটারদের অনুপস্থিতির বিষয়গুলোও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কোনো উন্নতি হয়নি। শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাসহ দেশের সচেতন মহলও এসব বিষয় আগেও তুলে ধরেছে। তাদের এসব প্রতিবেদন, কথাবার্তা এবং সমালোচনা সরকার আমলে নেয়নি। উল্টো এসব ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। যার ফল হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিষেধাজ্ঞা আসা। এ নিষেধাজ্ঞা একটি সংস্থা ও কিছু কর্মকর্তার ওপর হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র এ নিষেধাজ্ঞা দিলেও তার মিত্রদেশগুলোরও এর প্রতিক্রিয়া অপুরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যে দেশকে যে চোখে দেখে, তারাও সে দেশকে একই চোখে দেখে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য মিত্র দেশ পরোক্ষভাবে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আমলে নেবে। এতে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা মানেই সে দেশটির বদনাম হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশও একইভাবে জানতে চাইবে এবং কারণগুলো জানার পর নিশ্চয়ই তাদের মনে ভালো ধারণা জন্মাবে না। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে সরকারের মন্ত্রীরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করা হচ্ছে, বছরে ৬ লাখের মতো মানুষ উধাও হয়ে যাচ্ছে, পুলিশের হাতে বছরে হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়Ñএমন পরিসংখ্যান তারা দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। সমস্যা হচ্ছে, ক্ষমতাধর কোনো দেশ যখন কারো ওপর ছড়ি ঘোরায়, তখন সে তার দোষ-ত্রুটি দেখে না। ‘বস্ ইস অলওয়েজ রাইট’ নীতি অনুসরণ করে তার মিত্ররাও তা নিয়ে কথা বলে না। তার কথা উপেক্ষা করার সুযোগ খুব কম থাকে। বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নকামী দেশের পক্ষে তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গণে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের প্রভাব এখনো নিরঙ্কুশ। কূটনীতিবিদরা বলছেন, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিক থেকে এক নম্বর শক্তি। এমনকি চীন ও রাশিয়া তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচিত হলেও বাস্তবে তারা এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে সমীহ করে চলে। সম্প্রতি রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে বিপুল সৈন্য মোতায়েন করলে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে শুধু অস্ত্রই পাঠায়নি, আরও বাড়াবাড়ি করলে সুইজারল্যান্ডে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে বিতাড়িত করা হবে বলে হুমকি দেয়। সুইজারল্যান্ডের সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দায় পড়বে, এ আশঙ্কায় রাশিয়া পিছু হটে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা খুবই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যতই বলি না কেন, এখন আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী, কারো কাছে হাত পাততে হয় না, তাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্র দেশগুলোর কিছু যায় আসে না। বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে আমাদের ঋণ রয়েছে এবং ঋণ নিতে হচ্ছে। এখনও আমাদের অর্থনীতি এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি যে, তাদের ঋণ ছাড়া চলতে পারে। হয়তো আগে যে হারে ঋণ নিতে হতো, এখন তার চেয়ে কম লাগে। ঋণ নিতে হবে না, এমন অবস্থায় আমরা উপনীত হইনি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা অন্য ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর কাজই হচ্ছে, দরিদ্র ও উন্নয়নকামী দেশগুলোতে ঋণ, দান-অনুদান দিয়ে তাদের ওপর ছড়ি ঘোরানো এবং বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা ও তার পক্ষে নেয়া। এ থেকে সহজে নিস্তার পাওয়ার সুযোগ সীমিত। ইতোমধ্যে আইএমএফ আমাদের রিজার্ভ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বৈদেশিক রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন ডলার বলা হলেও আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশ ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেখিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, প্রকৃত রিজার্ভ হবে ৩৯ বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া কয়েক মাস আগে আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ নেয়ার কথা বলেছে। সরকার তার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে। এতে সংস্থাটির খুশি হওয়ার কারণ নেই। এর সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রেরও বাংলাদেশের ওপর নাখোশ হওয়ার কারণ থাকতে পারে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি ও অগ্রগতির মহাসড়কে এবং আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পথে থাকায় বৈদেশিক ঋণ নেয়ার হার কমেছে। এটা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোর জন্য মনোবেদনার কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর পক্ষে বাংলাদেশকে তাদের হাতের মুঠোয় রাখা সম্ভব হবে না, এ আশঙ্কা তাদের মধ্যে থাকা অস্বাভাবিক নয়। ফলে বাংলাদেশকে তাদের পক্ষে রাখা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার। ইতোমধ্যে চীন, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, মায়ানমারের সাথে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। বলা যায়, এসব দেশ নিয়ে একটি ছায়া জোট গঠিত হয়েছে। চীনের এ প্রভাব বলয় ভারত যেমন মানতে পারছে না, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও মানতে পারছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান বিশ্বে চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ফলে চীনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে এশীয় প্রশান্ত মহাসগরীয় একটি সামরিক জোট করেছে। এই জোটে বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিগত কয়েক বছর ধরে নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কৌশলে তা এড়িয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে চলেছে, যা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ হচ্ছে না। আবার চীনের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে ব্যাপক উন্নয়নের অংশীদারিত্ব রয়েছে। চীনের তরফ থেকেও উক্ত জোটে বাংলাদেশের যুক্ত না হওয়ার বার্তা রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের পক্ষে নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়া যুক্তিযুক্ত। সমস্যা হচ্ছে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ হচ্ছে না। তাই সে বাংলাদেশকে চাপে রাখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

তিন.
যুক্তরাষ্ট্রের কাজই হচ্ছে, যাকে পছন্দ হয় তাকে কাছে ডেকে নেয়, যাকে পছন্দ হয় না তাকে দমানোর উদ্যোগ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্বী পছন্দ না করা তার চিরকালের রীতি। প্রতিদ্বন্দ্বীকে সে শত্রু মনে করে। এ জন্য তার বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা নেয়। চীন তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠায় এখন তার বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে উইঘুরে মুসলমানদের নির্যাতনের অভিযোগে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এতে মনে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র বুঝি মুসলমানদের প্রতি দারুণ সহমর্মী। আদতে তা নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বরবরই মুসলমানদের শত্রুজ্ঞান করে। তার সাথে মিত্র দেশগুলোও একই মনোভাব পোষণ করে। ইসলাম ও মুসলমানদের বদনাম দিতে সে কি না করেছে। বিপদগামী কিছু মুসলমান নিয়ে সন্ত্রাসী ও জঙ্গী গোষ্ঠী সৃষ্টি এবং তা দমানোর নামে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মুসলমান দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়ার ইতিহাস কারো অজানা নয়। নাইন-ইলেভেনে নিজেরাই টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে আল কায়দার ওপর দোষ চাপিয়ে তাদের নির্মূলে আফগানিস্তানে দুই দশক ধরে হামলা চালিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। ঠুনকো অজুহাতে ইরাকে যুদ্ধ চালিয়ে দেশটিকে ধ্বংস করেছে। আইএস যে তাদের সৃষ্টি তা এখন সবারই জানা। আইএস দমনের নামে সমৃদ্ধ সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে যেভাবে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে, তা ইতিহাসে বিরল। তার কথা মতো না চললে স্বৈরতন্ত্রের ছুঁতোয় বিভিন্ন মুসলমান শাসকদের উৎখাত এবং হত্যা করার নজির যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সৃষ্টি করেছে। ভূমধ্যসাগর দিয়ে যেসব লোক ইউরোপে পাড়ি জমায়, তাদের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হামলায় বিধ্বস্ত দেশগুলোর সাধারণ মানুষ এবং মুসলমান। অথচ নিজ ভূম ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি দেয়ার কথা তাদের ছিল না। যুক্তরাষ্ট ও তার মিত্ররা হামলা চালিয়ে এসব সমৃদ্ধ মানুষের আবাস-নিবাস ধ্বংস করে তাদের নিঃস্ব করেছে। আর দেখাচ্ছে, মুসলমানরা উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং তারা উন্নত বিশ্বে যাওয়ার জন্য উন্মুখ। মুসলমান দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ধ্বংস ও মুসলমান হত্যার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিকতা একটুও কাজ করেনি। তার মিত্র কিংবা অন্যান্য দেশও যুক্তরাষ্ট্রের এই মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলেনি। তাদের নিশ্চুপ থাকা নিয়ে এটাই প্রতীয়মান হয়েছে, সে যা করেছে, তা সঠিক। উগ্রবাদী হিন্দুরা প্রতিনিয়ত মুসলমানদের হত্যা-নির্যাতন করছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বিতাড়নের আইন করেছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র টুঁ শব্দটি করছে না। ইসরাইল যে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের গুলি করে হত্যা করছে, এ ব্যাপারেও কোনো কথা বলছে না। এসব দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে মুসলমান হত্যা ও নির্যাতনে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, যুক্তরাষ্ট্র স্ববিরোধী ও দ্বিচারি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

চার.
বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিকে উপেক্ষা করার সুযোগ সীমিত থাকায় আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক এবং আভ্যন্তরীণ বিষয়ে সতর্ক থাকা বাঞ্চনীয়। সে যাতে কোনো ইস্যুকে পুঁজি করতে না পারে, এমন সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী কূটনৈতিকভাবে মোকাবেলার ব্যবস্থা থাকলেও, কোনো দেশের গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা, সুশাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন সর্বোপরি শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে। এ সুযোগটিই যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে। অপ্রিয় হলেও সত্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সুযোগ আমরাই করে দিয়েছি। সরকার স্বীকার করুক বা না করুক, এটা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই যে, আমাদের দেশে সুশাসনের অভাব, আইনের শাসনের ত্রুটি, বাকস্বাধীনতার খর্বিত অবস্থা, গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণুতা, গুম-খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরাজনীতিকরণের প্রবণতা রয়েছে। দুঃখের বিষয়, সরকার এসবের তোয়াক্কা করেনি বা সচেতন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এসব বিষয় ধরার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সুযোগও নিয়েছে। বলয়ে যাবে বাংলাদেশ ঢুকতে না পারে, সে জন্য চাপ হিসেবে বেছে নিয়েছে নিষেধাজ্ঞাকে। এ প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের উচিৎ হবে, প্রথমে আভ্যন্তরীণ যেসব বিষয় নিয়ে দেশে এবং বিদেশে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে, সেগুলো নিরসনে উদ্যোগী হওয়া। দেশে গণতান্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতার পরিবেশ উন্নত করা। আন্তর্জাতিকভাবে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নীতি অবলম্বন করা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments