Sunday, January 16, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামমোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা ও পিকে

মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা ও পিকে

গৌতম দাস

অসময়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও এর নেতা মমতা ব্যানার্জি নিয়ে আজকের প্রসঙ্গ। অসময়ে এ জন্য যে, এটি পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনের আগের বা অব্যবহিত পরের সময় একেবারেই নয়, যদিও একটি পৌরসভা (ওদের ভাষায় পুরভোট) নির্বাচন আসন্ন। তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব তেমন নেই। সাধারণত যতটুকু একটি পৌর নির্বাচনের থাকে, এবার তাও নেই। এর মূল কারণ গত মার্চ-এপ্রিলে মমতা শুধু নিজে ও দলকে তৃতীয়বার রাজ্যের ক্ষমতায় বিজয়ী হয়ে নিয়ে এসেছেন সে জন্য নয়। সে নির্বাচন ছিল হেভিওয়েট বিজেপিকে পুরো উৎখাত করে ফেলা। অথবা সারা ভারতের বিরোধীরা যখন মোদির সামনে শিশু বা বামন হয়ে যায়, কেবল সেখানে একা মমতা লড়ে প্রমাণ করে দিলেন, এক প্রধানমন্ত্রী মোদির ইমেজের ওপর দাঁড়ানো চালু এ দলটিও তার সামনে কিছুই না। ফলে কলকাতা রাজ্য নির্বাচনের আগে যে ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার ঝড় বিজেপি তুলেছিল, সেটিসহ মোদি বা বিজেপি কোনো কিছুকেই মমতা আস্ত রাখেননি। উপড়ে ফেলেছেন। এরপর যারা আগে-পরে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের এবার বিজেপি ছেড়ে আবার একমাত্র দল মমতার তৃণমূলেই ফেরতের হিড়িক পড়ে যায়; যেন সবাইকেই ফিরে যেতে হবে। এ ছাড়া কার আগে কে ফিরে জায়গা নেবে যেন এর প্রতিযোগিতাও শুরু করাতে পেরেছিলেন মমতা।

তবে বছরের শুরুতে মার্চ-এপ্রিল ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর উপনির্বাচন হয়ে গেছে অনেক আসনে; কারণ করোনার জন্য আটকে থাকা, শিডিউলে থাকা অনেক উপনির্বাচন দীর্ঘ দিন হতে পারেনি। সেখানে বিজেপি আরেক দফা আরো তুচ্ছ হয়ে যায়।

আসলে এখন পৌর নির্বাচনের গুরুত্ব আরো কম বা নেই; কারণ গত ৩০ সেপ্টেম্বরে এবার সুযোগ পেয়ে একসাথে সারা ভারতে অনেক উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর তা ছিল ভারতের ১৩টি রাজ্যের লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা মিলিয়ে মোট ২৮টি আসনে উপনির্বাচন। এতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন ছিল চারটি। আর ওদিন আরো তিন রাজ্যের তিন লোকসভা আসনে উপনির্বাচন হয়। রাজ্য তিনটি হলো – হিমাচল, মধ্যপ্রদেশ ও কেন্দ্রশাসিত রাজ্য দাদরা ও নগর হাভেলি; যাতে বিজেপি জিতেছিল কেবল মধ্যপ্রদেশের একটিতে; বাকি দুই রাজ্যে বিজেপি হেরে যায়। এ বছরের কলকাতায় মমতার রাজ্য নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর সেই জোয়ার এতই তীব্র হয়েছিল যে, এই উপনির্বাচনে ছয় মাসের ব্যবধানে এক লাখেরও বেশি ভোটে উল্টো বিজেপি প্রার্থীরা এবার হেরে যান। আর বিজেপি প্রার্থী প্রায় সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে মোদির এই হার গত সাত বছরের মোদির শাসনামলে এই প্রথম, যা তার বিজেপি দলসহ তাকে এই প্রথম সমূলে এত বড় আঘাত হেনেছে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়াও প্রথমে মনে করা হয়েছিল, মোদির ওপর এ আঘাত বোধহয় কেবল পশ্চিমবঙ্গেই। কিন্তু এখন একেবারেই পরিষ্কার, এটি ভারতজুড়েই বিরাট ছাপ ফেলেছে।

আসলে এটি এক ‘আন্ডার কারেন্ট’ যেখানে সেটি নদীর যত তলদেশে ততই সেখানে স্রোতের বেগ তত বেশি। অথচ পুরো ব্যাপারটা বাইরে থেকে তেমন বোঝাই যায়নি। কিন্তু কী সেটি?

বিজেপি বা মোদিবিরোধী সব বিরোধী দলের অভ্যন্তরেই প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত ও ক্ষোভ বর্তমান। এসব ক্ষুব্ধ ভগ্নাংশ বা গ্রুপগুলোতে অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত এতই তীব্র কিন্তু তারা দল ছাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সে দিকে ফায়সালার পথ বেছে নেবে, তা ঘটছিল না। সম্ভবত তাদের দ্বিধার মূল কারণ, এসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ ভেঙে বেরিয়ে যেতে চাইলেও তারা কোথায় যাবে কোন দিকে, এটি স্পষ্ট খুঁজে না পাওয়ায়ই তারা উদ্দেশ্যহীন হয়ে পুরনো নিজ দলের সাথে লেপ্টে থেকে গিয়েছিলেন।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে আজ এটি প্রমাণিত যে, তৃণমূলের মমতা হলেন সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক যার বাঁশির পেছনে ওসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ একেবারে সদলে এসে একের পর এক যোগদান শুরু করেছে এখন। আর তাতে রাতারাতি মমতার তৃণমূল দল এক আঞ্চলিক দলের পরিচয় থেকে বেরিয়ে সর্বভারতীয় দলের পরিচয় ধারণ করতে যাচ্ছে।

‘সর্বভারতীয় দল’ মানে কী
ভারতে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে মোট রাজ্যের সংখ্যা ২৮টি। কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সব রাজ্যেই বা বেশির ভাগ রাজ্যেই উপস্থিতি বা কমিটি থাকলে সাধারণত চলতি অভ্যাসে তাকে ‘সর্বভারতীয়’ দল বলে বোঝানো হয়ে থাকে। তবে স্বভাবতই এটি আইনি বা নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত সংজ্ঞা নয়। কমিশনের মতে, কতগুলোর শর্তের একটি পূরণ করলেই সেটি ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদা লাভ করে থাকে কিংবা সময়ে সময়ে নির্বাচন কমিশন এই মর্যাদা কোনো দল প্রাপ্ত বা কেড়ে নেয়া হলো বলে ঘোষণা দিয়ে থাকে।

যেমন এমন এক শর্ত হলো, দলটাকে ভারতের যেকোনো তিন রাজ্য থেকে লোকসভার (কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে যেটা) নির্বাচনে মোট ভোটারের কমপক্ষে ২ শতাংশ পেতে হবে। অথবা দলটিকে লোকসভা বা বিধানসভা (রাজ্য সরকার গঠনের লক্ষ্যে) নির্বাচনে যেকোনো চার বা ততোধিক রাজ্য থেকে মোট ভোটের ৬ শতাংশ পেতে হবে। আর সাথে আরো চারটি লোকসভা আসন জিততে হবে। অথবা দলটিকে চার রাজ্যের যেকোনো একটিতে ‘রাজ্য দল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হবে।

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে কমিশন ঘোষিতভাবে ভারতে আটটি ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল আছে যদিও সম্প্রতি এদের চারটির অবস্থা খারাপ যে, সম্ভবত তারা নয়া রিভিউয়ে বাদ পড়বে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস কখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল নয় যদিও গত ২০০১ সালের রাজ্য নির্বাচনের সময় থেকে তৃণমূল খুবই কঠোর চেষ্টা শুরু করেছে। আর আগামী বছর মানে সারা ২০২২ সালে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এগুলো হলো – গোয়া, মনিপুর, উত্তরখণ্ড, পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশ। এতে একমাত্র উত্তর প্রদেশের নির্বাচন হবে মে মাসে আর বাকি চারটি নির্বাচনই হবে মার্চ মাসের বিভিন্ন সময়ে। বাংলা ভাষায় এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিধানসভার নির্বাচন’ বলে পরিচিত। ইংরেজিতে ‘লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’ বা সংক্ষেপে শুধু ‘অ্যাসেম্বলি’ বলার চল আছে।

সার কথাটা হলো, তৃণমূল কংগ্রেস এখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত নয়। তৃণমূল মূলত আঞ্চলিক দল মানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যভিত্তিক দল।

তাহলে ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিলের নির্বাচনের পর এবার তৃণমূলকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও হইচই ওঠার কারণ কী?

এক কথায় বললে, পশ্চিমবঙ্গের গত এপ্রিল নির্বাচন হয়েছিল মোদির নামে, মোদির সুনাম বা ক্রেডিটকে দেখিয়ে, সামনে রেখে। এমনকি বিজেপি দলের চেয়েও মোদির নাম এগিয়ে রাখা হয়ে থাকে সবসময় ঠিক যেমন সাত বছর ধরে বিজেপি একা মোদির নাম ও ক্রেডিটের উপরে নির্বাচন করে যাচ্ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এতে কলকাতায় এমন প্রপাগান্ডা ঝড় তারা তুলেছিল যেন নির্বাচনের পরে সারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ছাড়া ‘আর কোনো দল থাকছে না।’ ফলে অন্যান্য দল থেকে সুযোগসন্ধানীদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায় যে, নিজ নিজ দল ছেড়ে কার আগে কে বিজেপিতে যোগ দেবে। অথচ ফলাফল প্রকাশ পেলে দেখা গেল, কিছুই সত্য নয়, সব প্রপাগান্ডা। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টিতে জিতেছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি পায় ৭৭টি আসন। তাও আবার সেই ৭৭ এখন ৭২ হয়ে গেছে। আর ওই পাঁচজন তৃণমূলে ফেরত গেছেন।

শুধু তা-ই নয়, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোটের সাথে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ‘সেক্যুলার ফ্রন্ট’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পীরজাদার দল একটা আসন পাওয়া ছাড়া ওই পুরো দল ও জোট এবার আর কোনো আসন পায়নি। অনেকে এটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, এটি ২০১৯ সালের সিপিএমের নিজ কর্মের শাস্তি বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। কেন?

সিপিএমের বামফ্রন্ট ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেসের সাথে জোট করে নির্বাচন লড়ে আসছে। কিন্তু যেহেতু মমতাই তাদের ৩০ বছরের সাজানো দুর্গ ২০১১ ভেঙে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন, তাই মমতার দলই তাদের প্রধান শত্রু ও বিরোধী তা আজও এরা মনে করে থাকে। তাতে ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতায় যে দলই থাক। কিন্তু এখানে ফাঁকিটা হলো ক্ষমতাসীন মোদি কমিউনিস্টদের ভাবধারা অলক্ষ্যে এবং এ কথা মুখে না বললেও সিপিএমের দোস্ত হয়ে উঠেছেন। এরই চরম অবস্থাটা আমরা দেখে ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনে। তারা বিজেপির সাহায্য নিয়ে মমতা উৎখাতের পরিকল্পনা করে ভোটকেন্দ্রে বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়েছিল। এ কৌশল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো বয়স্ক নেতারা পছন্দ না করলেও সেবার তারা পাত্তা পাননি। আর তাতে হঠাৎ বিজেপি তিন আসন থেকে এক লাফে ১৮ আসন লাভ করেছিল যেখানে মোট আসন ৪২টি আর তৃণমূল একাই প্রায় সবটা পেয়ে থাকে। এ কারণেই ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে একটি সিটও না পাওয়াকে সিপিএমের কর্মের শাস্তি বলা হচ্ছে। এ ছাড়া তারা পীরজাদাকে জোটের সাথে নিয়ে মূসলমান ভোট ভাগ করতে চেয়েছেন, যাতে বিজেপির সুবিধা হয়। কিন্তু মুসলমান ভোটাররাই সব রুখে দেন, তারা ভোট ভাগ হতে দেননি। মমতার এত আসন পাওয়া বা বাম-কংগ্রেস সাথে পীরজাদার জোট মাত্র একটিই আসন পাওয়ার ঘটনাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।

এ তো গেল শুধু পশ্চিমবঙ্গের হিসাব, সাথে এখন তৃণমূলের বিস্তৃতি বাইরের রাজ্যেও। সর্বভারতীয় দল হিসেবে তৃণমূল নিজের নতুন কমিটি সাজিয়ে নিয়েছে। আর এতে একেক করে অন্যান্য রাজ্যের দলের নেতাকর্মীরা যোগ দেয়া শুরু করেছেন; যার মধ্যে গোয়া আর ত্রিপুরা সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে।

এবার গত সপ্তাহে মমতা দিল্লি সরকারি সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে এর ফাঁকে নিজ দলের শুভযাত্রার অনেক কাজ করে এসেছেন, যাতে অন্তত তৃণমূলকে এখন এক সর্বভারতীয় দল মনে হয়। আসলে বিভিন্ন দল থেকে মমতার দলে যোগদান করতে আসছেন; এরই এক অনুষ্ঠান ছিল এবারের মুখ্য আকর্ষণ। যেসব রাজ্য থেকে পুরনো দল ছেড়ে নেতারা (সাবেক বা বর্তমান) এমপিরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন এদের মধ্যে আছেন উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে; বলা হচ্ছে হিন্দি বলয়ের তিন সাবেক সাংসদ কীর্তি আজাদ, অশোক তনওয়ার ও পবন বর্মা যোগ দিয়েছেন। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখছে, “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমেই নিজেকে মোদিবিরোধী শিবিরের ‘মুখ’ করে তুলছেন।”

আসলে এটিই হলো মমতার মুখ্য মেসেজ; অর্থাৎ মোদিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট গড়তে গেলে এর সম্ভাব্য নেতা কে কে হতে পারেন – এই বিচারে মমতা নিজেকে সর্বভারতীয় নেতার ইমেজ দিয়ে রাখতে চাইছেন। কিন্তু কেন এটা?

প্রশান্ত কুমার বা পিকে
রাজনীতিতে কনসালটেন্সি বা একালের ভোটযুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে প্রফেশনাল এক্সপার্ট নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনে পরিকল্পনা করে ভোটে নামা শুরু হয়েছে ভারতে। ভারতের রাজনীতি ষোলোআনাই নির্বাচননির্ভর। তাই ভারতে রাজ্যের বা কেন্দ্রের নির্বাচনের আগেই কেবল রাজনীতি করো। বাকি সময় দলের বাতি ধরে রাখলেই হবে। এই হলো ভারতের রাজনীতি। ফলে দলের হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করা, লড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে যেহেতু এটি ‘পরিচালনা’ মানে ডিরেকশন বা নির্দেশনা দেয়া; কাজেই ব্যাপারটা আসলে একটা ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক কাজ যার এক বাংলা করতে পারি পরিচালনা বা ম্যানেজ করা বা সামলানো। কাজেই এটি তো ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট নিয়োগ। তাই না?

বিহারের প্রশান্ত কুমার (পিকে) হচ্ছেন আপাতত ভারতের একমাত্র পলিটিক্যাল কনসাল্ট্যান্ট। এটি আসলে জনমত যাচাই, পাবলিক মনোভাব আগাম বোঝা, নির্বাচনে ভোটারদের মুখ্য আশা কী, কী হলে তারা খুবই খুশি হবে, দলের সবচেয়ে খারাপ দিক কোনটা, এর পজিটিভ-নেগেটিভ সব জেনে নেয়া ইত্যাদি; এসব কাজের জন্য একেবারে স্যাম্পল ডাটা সংগ্রহ করে গবেষণা স্টাডিতে নেমে পড়া; আর সে স্টাডির ফলাফল অনুসারে দলকে পরিচালিত হতে, নড়াচড়া করতে নির্দেশ দেয়া। পিকে এর আগে পেশাদার কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে জাতিসঙ্ঘে এমন স্টাডি গবেষণার কাজ করতেন। এরপর কী খেয়ালে সেসব ছেড়ে এ কাজে নেমে এসেছেন। এ পর্যন্ত কোনো দলের পক্ষে পরামর্শদানের চুক্তি করে সে দলকে হারতে দেননি তিনি। ফলে এটি তার ভালো রেকর্ড। এককালে বিজেপিকেও এমন পরামর্শ দিয়েছেন। কংগ্রেসকেও। বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষমতাসীন রাজ্য সরকারকেও। এমন অনেক রাজ্যকেই। মমতার সাথে সম্পর্কের শুরু ওই ২০১৯ সালে; সেবারের কেন্দ্রের নির্বাচনে খারাপ ফলাফলের পর থেকেই মমতা পিকেকে নিয়োগদান করেছিলেন; যার ফলাফল পরেরবার মমতার ২০২১ নির্বাচনে মোদি হারানোর জয়জয়কার। কিন্তু এর পর থেকেই কেন্দ্রের নির্বাচনে মমতার দলের পক্ষে নেমে পড়া, নতুন চুক্তি হাতে নেন পিকে। আনন্দবাজারের ভাষায় এটি ‘ভোট-কুশলীর কাজ’। শব্দটা ইংরেজি স্ট্রাটেজিস্ট শব্দটার বাংলা কৌশলী আর সেখান থেকে ব্যক্তি কুশলী। এটি কুশল বিনিময়ের কুশল নয়। আসলে, এটি প্রকৌশল লিখতে যে কৌশল শব্দ ব্যবহার করি সেই কৌশল থেকে কৌশলী হবে।

গত মে মাস থেকে কাজে নেমেই পিকে ‘বিরোধী জোটের ঐক্য’ গড়া দিয়ে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। ঘোষণাও করেছিলেন, কংগ্রেসকে সাথে নেয়া ছাড়া এ কাজ শুরু করার মানে নেই; এ ধরনের বক্তব্যও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মাথাতেই অগ্রগতি না দেখে এবার আবিষ্কার করেন যে, খোদ কংগ্রেস দল ও এর অভ্যন্তরীণ বর্তমান দশাই সব সমস্যার উৎস। আর এর পর থেকেই তিনি প্রকাশ্যেই কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো কী তা বিভিন্ন ঘটনার সময় প্রকাশ্যেই তুলে ধরতে শুরু করেন। ইঙ্গিত দিতে থাকেন কংগ্রেস যোগ্য দল নয়; তাই সে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। এর পরই তিনি মমতাকে নেতা হিসেবে ‘প্রজেক্ট’ করা শুরু করে দেন। খুব সম্ভবত তারই পরিকল্পনায় মমতার এবারের দিল্লি সফর।

ঘটনা যতটুকুই যা ঠিক হোক বা না; বাস্তবতা হলো পিকের কৌশলে মমতাবিরোধী জোট গড়তে এখনো অগ্রসর হতে পারেন আর না পারেন, মমতাই যে কিছু করার ক্ষমতা রাখেন, এই ইমেজ তিনি (পিকের মাধ্যমে) চার দিকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন, সন্দেহ নেই। এরই সোজা মানে হলো, পিকে সঠিকই ধরেছেন, মোদিবিরোধী দল বা কর্মীরা কোন নেতা, কোন পরিকল্পনা, কোন দল ও জোট ইত্যাদি, এমন সব কিছু আছে এটি যে খুঁজে ফিরছে – তা পিকে ধরে ফেলেছেন। ফলে বিভিন্ন দল ও গ্রুপে তারা যে এখন বের হয়ে আসবে, সাহস করবে, মমতাকে দেখে তারা পথ খুঁজে পেয়েছে মনে করবে তা ফল দেয়া শুরু করেছে। আর এ কাজটি করতেই রাহুল বা সোনিয়ার নেতৃত্বের কংগ্রেস আনফিট, সেটিই সম্ভবত প্রমাণ হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বাংলা ট্রিবিউনে তাদের কলকাতা প্রতিনিধি লিখেছেন, ‘একের পর এক উইকেট পড়ছে কংগ্রেসে। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। অন্য দিকে বাংলার বুকে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া তৃণমূল আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে দেশে বিজেপিবিরোধী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে। আঞ্চলিক দলের তকমা ঝেড়ে তৃণমূল এখন সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পথে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে মোদিবিরোধী জোটে সোনিয়া, রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কা নন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন মুখ্য। এমনটিই বলছে রাজনৈতিক মহল। তবে কী ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর ‘মহামিশন ২০২৪’-এর গেমপ্ল্যানকে লক্ষ্য করে এখন দিল্লি দখলের পথে মমতা!”

কথা সঠিক; এখন পর্যন্ত যে দলটা সবচেয়ে বেশি ভেঙে দলে দলে নেতাকর্মী বের হয়ে তৃণমূলে যোগ দিচ্ছে এদের বেশির ভাগই পুরনো কংগ্রেস দলের।

তবে অতি উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই।

আপাতত মনোযোগে পর্যবেক্ষণই আমাদের কাজ বোধ করি!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments