Thursday, February 22, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামমার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে হালকাভাবে নেবেন না : ট্র্যাক টু এবং ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোম্যাসি...

মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে হালকাভাবে নেবেন না : ট্র্যাক টু এবং ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোম্যাসি ফলো করুন

বাংলাদেশের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে খামোখা পানি ঘোলা করা হচ্ছে। যেটা হয়েছে, সেটা তো হয়েই গেছে। সেটিকে খণ্ডন করা কি অত সোজা? এটি খণ্ডানো যাবে, যদি যে আইনের অধীনে এই স্যাংশন দেওয়া হয়েছে সেই আইনটি বাতিল করা যায়। সেটি বাতিল করতে হলে কমপক্ষে ৫১ জন মার্কিন সিনেটরের সমর্থন প্রয়োজন। সেই ৫১ জন সিনেটর পক্ষে থাকলে তো এই স্যাংশনই আসতো না। এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপ্তি এবং ব্যাপকতা বুঝতে হলে ম্যাগনিটস্কি আইন (Magnitsky Act) সম্পর্কে মিনিমাম ধারণা থাকতে হবে। সেদিকে না গিয়ে কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি ডব্লিউ মিকসের একটি উক্তিকে নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যাখ্যা করে সেটি প্রচার করা হয়েছে। মি. মিকসের উক্তি, ক্ষমতা এবং স্ট্যাটাস বুঝতে হলে মার্কিন সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদের (House of Representative) গঠন ও ক্ষমতা সম্পর্কেও মিনিমাম জ্ঞান থাকতে হবে। আমি এখন যদি সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ, ম্যাগনিটস্কি অ্যাক্ট এগুলো বোঝাতে যাই, তাহলে আর সেটি পত্রিকার কলাম থাকবে না, হবে একটি গবেষণা পত্র। তাই আমি সরাসরি মূল বিষয়ে যাচ্ছি।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি র‌্যাবের ৭ জন সাবেক ও বর্তমান সিনিয়র অফিসার এবং খোদ র‌্যাবের ওপর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং ট্রেজারি অফিসের (অর্থ মন্ত্রণালয়) স্যাংশনকে কেন্দ্র করে গ্রেগরি ডব্লিউ মিকসের একটি মন্তব্য প্রচার করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস। বাসসের ঐ খবর অনুযায়ী মি. মিকস নাকি বলেছেন যে, ‘আমরা (অর্থাৎ আমেরিকা) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছি না।’ আরো নিষেধাজ্ঞা আসছে কিনা, এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা অন্যদের কথা অনুযায়ী কিছু করবো না। আমরা সব কিছু ভালভাবে যাচাই করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।
এ ব্যাপারে দৈনিক মানবজমিনে গত ৩ ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। মি. মিকস কংগ্রেসনাল বৈদেশিক কমিটির চেয়াম্যান। ম্যাগনিটস্কি আইনটি স্বাক্ষর করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ২০১২ সালে। এই আইনের অধীনে সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন ২০১৭ সালে। আদেশ নং ১৩৮১৮। সেই নির্বাহী আদেশের অধীনেই গত ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে চীন, উত্তর কোরিয়া, বার্মা (মিয়ানমার) এবং বাংলাদেশের ১০টি সংস্থা এবং ১৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের একটি সংস্থা (ঊহঃরঃু) এবং ৭ জন সিনিয়র অফিসার রয়েছেন। সংস্থাটি হলো র‌্যাব এবং ঐ ৭ ব্যক্তি হলেন র‌্যাবের বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তা। এই নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যাপারে কংগ্রেসম্যান মিকসের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং এখনও নেই।
তাছাড়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই স্যাংশন ছিল দ্বিদলীয়। ডেমোক্রাটিক পার্টির ৫ জন এবং রিপাবলিক্যান পার্টির ৫ জনÑ মোট ১০ জন সিনেটর গত বছরের আগস্ট মাসে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি যৌথ স্বাক্ষর সম্বলিত চিঠি দেন। সেই চিঠির ভিত্তিতেই নিষেধাজ্ঞার আদেশ তৈরি হয় এবং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেখানে স্বাক্ষর দেন।
এতক্ষণ ধরে আমি যে পটভূমি বর্ণনা করলাম, তার একটিই উদ্দেশ্য। আর সেটি হলো, পাঠকদের সঠিক চিত্র প্রদান। এখানে সরকারি দল বা বিরোধী দলের কোনো প্রশ্ন নেই। এখানে গ্রেগরি মিকস কীভাবে দৃশ্যপটে এলেন? ঘটনাটি বড় মজার। নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায় তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি সভার আয়োজন করা হয়। কুইন্স এলাকায় অনেক বাংলাদেশি বাস করেন।
॥দুই॥
ঐ সভার দর্শক এবং শ্রোতার অধিকাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। ঐ সভায় কংগ্রেসম্যান মিকস কী বক্তব্য রেখেছেন সে সম্পর্কে কংগ্রেসম্যানের তরফ থেকে কোনো বিবৃতি আসেনি। এর পরিবর্তে বাংলাদেশ দূতাবাসের তরফ থেকে মি. মিকসের বক্তব্য বলে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। ‘মানবজমিন’ দাবি করেছে যে, মি. মিকসের ২৬ মিনিটের বক্তৃতার একটি অডিও ক্লিপ তাদের হাতে এসেছে। ঐ অডিও ক্লিপ শুনলে বোঝা যায়, কংগ্রেসম্যানের বক্তব্য খণ্ডিতভাবে এবং ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের ভেতরে এবং বাইরে একটি সুবিধাবাদী মহল আরও কিছু অফিসার এবং পলিটিশিয়ানদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মি. মিকসের বক্তৃতা এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে ঐ ধরনের কোনো বক্তব্য ছিল না।’
আমেরিকার নিম্ন কক্ষ অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদের (ঐড়ঁংব ড়ভ জবঢ়ৎবংবহঃধঃরাব) ওয়েবসাইটে এ সম্পর্কে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিবৃতিতে যা বলা হয় মার্কিন নিম্ন কক্ষের বিবৃতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মার্কিন বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যুতে গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি অ্যাক্ট’ অনুসারে র‌্যাবের সাবেক এবং বর্তমান সদস্যদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে দৃঢ় সমর্থন দিয়েছেন দেশটির কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ও পররাষ্ট্র বিষয়ক হাউজ কমিটির চেয়ারম্যান গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস। মিকস বলেন, ‘গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি অ্যাক্ট অনুসারে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের বিষয়ে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাকে আমি দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানাচ্ছি।’ ঐ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয় তা নিশ্চিত করতে আমি আগ্রহী।’
মার্কিন আইন সভার রয়েছে দুটি কক্ষ। একটি উচ্চ কক্ষ। নাম সিনেট। অপরটি হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ (প্রতিনিধি পরিষদ)। এটি নিম্ন কক্ষ। আমেরিকার জনসংখ্যা ৩৩ কোটি। নিম্ন পরিষদ বা হাউজের সদস্য সংখ্যা ৪৩৫। প্রতিটি রাজ্যে হাউজের আসন সংখ্যা নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার আসন সংখ্যা ৫৫। কারণ এই রাজ্যটির জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ৭টি রাজ্য, যথা আলাস্কা, দেলওয়ারে, মন্টানা, ভারমন্ট, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা এবং ইয়োমিং- এই প্রত্যেকটি রাজ্যের আসন সংখ্যা ১টি করে। কারণ, তাদের জনসংখ্যা অত্যন্ত কম। পক্ষান্তরে উচ্চকক্ষ বা সিনেটের আসন সংখ্যা ১০০। ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রত্যেকটির আসন সংখ্যা জনসংখ্যা নির্বিশেষে ২। অর্থাৎ ৩৩ কোটি লোকের প্রতিনিধি হলেন ১০০ জন সিনেটর। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিনিধি পরিষদের চেয়ে সিনেট অনেক শক্তিশালী। মার্কিন সংবিধানে প্রতিনিধি পরিষদের চেয়ে সিনেটকে অনেক বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সেই সিনেটের ১০ জন সদস্যের সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশের র‌্যাব এবং তার ৭ জন বর্তমান ও প্রাক্তন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাইডেন স্যাংশন দিয়েছেন। সেখানে প্রতিনিধি পরিষদের একজন সদস্যকে নিয়ে মহল বিশেষ মাতামাতি করেছিলেন। সেই সদস্যও এখন বলছেন যে, তিনি স্যাংশন দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন।
॥তিন॥
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বাংলাদেশের স্বার্থেই জরুরি। কিন্তু এ ব্যাপারে কতিপয় মন্ত্রী যখন কঠোর মন্তব্য করছেন, তখন সেটি সমস্যা সমাধানের কোনো পথ বলে মনে হচ্ছে না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর আমেরিকা বাংলাদেশকে যে জিএসপি সুবিধা দিয়েছিল সেটি ২০১৩ সালে বাতিল করা হয়েছে। ঐ সুবিধা পুনর্বহাল করা হবে বলে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা অসংখ্যবার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন ২০২২ সাল। ৯ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু জিএসপি সুবিধা আজও ফেরত আসেনি। বর্তমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে সরকারি নেতারা যত সহজ মনে করেছিলেন, আজ দুই মাস হতে চললো, সরকার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন যে, বিষয়টি তত সহজ নয়। সব কিছুকে অস্বীকার করা বা বিষয়টিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মনোভাব অত উঁচু লেভেলের কূটনীতিতে চলে না। মার্কিন প্রশাসন তো বলেই দিয়েছে যে, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতল মাঠে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় সেদিকে তারা নজর রাখবে। ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি গত ২৭ জানুয়ারি বলেছেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগ্রহ রয়েছে। চলমান ঘটনা প্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইইউ।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি ডেইলি স্টার অনলাইনে ফলাও করে যে খবর ছাপা হয়েছে তার শিরোনাম, ‘দেশে এনফোর্সড ডিস অ্যাপেয়ারেন্স শব্দই তো নেই।’ এই কথাটি বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। তিনি হারিস আলীর কথা বলেছেন। কেউ কি কোনো দিন বলেছে যে, হারিস আলী (আলী নয়, চৌধুরী) গুম হয়েছেন? ইন্ডিয়ার হোটেলে ইন্ডিয়ানরা যাকে ধরলো বলে তিনি উল্লেখ করেছেন, তখন তো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশেই ছিলেন না। সেই সময়কার পত্র পত্রিকা ঘাঁটুন, সব জানতে পারবেন।
আসলে এভাবে হবে না। প্রথমে ‘ট্র্যাক টু’ ডিপ্লোম্যাসি ফলো করুন। তারপর ‘ট্র্যাক ওয়ান’। এছাড়া সমাধানের আর কোনো পথ আছে বলে তো মনে হয় না।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments