Friday, December 2, 2022
spot_img
Homeধর্মমানবকল্যাণে ঈমানদারের সম্পদ

মানবকল্যাণে ঈমানদারের সম্পদ

একটু ভাবুন, স্থির মনে ভাবুন! আপনার বিশ্বাস হলো, আমরা এমন এক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রভুর বান্দা, যিনি চোখের খেয়ানত ও বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা গোপন কথাও জানেন। এরপর এই দৃশ্যটি কল্পনা করুন যে আপনি কোনো ওয়াকফ সম্পদের মুতাওয়াল্লি, কোনো অর্থকরী সংগঠনের দায়িত্বশীল ও কোষাধ্যক্ষ, কোনো দল বা সংগঠনের নীতিনির্ধারক, কোনো জাতীয় তহবিলের দায়িত্বশীল, তখন সেই তহবিলের প্রতিটি পয়সার ব্যাপারে আপনি কত চিন্তিত থাকেন? যেন অপচয় বা অপাত্রে ব্যয় না হয়। কেননা সমুদয় অর্থ জাতির আমানত—না জানি তা কত পরিশ্রমে পূঞ্জীভূত করা হয়েছে এবং আপনাকে তার রক্ষক বানানো হয়েছে। এই কোষাগারে ধনীদের অর্থ যেমন আছে, তেমনি দরিদ্র্য ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষের অর্থও আছে। এখন যদি একটি পয়সাও নষ্ট হয়, আল্লাহ না করুন যদি তা ব্যক্তিগত কাজে খরচ হয়, তখন অপচয়কারী ও খেয়ানতকারী নিজের মেধা ও মিষ্টি মুখ দিয়ে হিসাব গ্রহণকারীকে সন্তুষ্ট করে দেবে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস হলো, একদিন এমন আসবে, যেদিন নিশ্চিতভাবে এমন হিসাব গ্রহণকারী করবেন, যিনি প্রতিটি অণু-রেণুর খবর রাখেন। যদি আমরা কোনো ত্রুটি করি তাহলে তাকে কি জবাব দেব?

আপনার হাতে যে অর্থ-সম্পদ আছে, আপনি পরিশ্রম করে যা উপার্জন করেছেন আপনি তার সার্বভৌম মালিক নন এবং আপনি তা যাচ্ছে-তাইভাবে খরচও করতে পারবেন না। আপনার সমুদয় সম্পদ, এমনকি আমার জীবন ও মেধা-যোগ্যতা জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহর হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এটা অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রমাণপত্রে লেখা আছে, যা কখনো অস্বীকার করা যায় না। আয়াতটি আবার পড়ে নিন ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে—এর বিনিময়ে।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১১)

আপনার জীবন ও সম্পদ আল্লাহ কিনে নিয়েছেন। মুসলিম হিসেবে আপনি যদি বিষয়টি বিশ্বাস করেন তবে আপনি আপনার সম্পদ যেখানে খুশি ব্যয় করতে পারেন না। সম্পদ আপনি সেখানেই ব্যয় করতে পারবেন, যেখানে ক্রয়কারীর সম্মতি আছে। যেমন আপনার নিজের, সন্তান-সন্তুতি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা। অথবা ক্রয়কারীর নামে মাদরাসা-মসজিদ নির্মাণ করা। অন্য কোনো ধর্মীয় ও জাতীয় কাজে খরচ করা।

এখন চিন্তা করুন, আপনি দরিদ্র ও অসহায়, এতিম ও বিধবাদের জন্য কী করেছেন? নিজের কাজের পর্যালোচনা করুন। ভাবুন! সন্তানের জন্মদিন, আকিকা অনুষ্ঠানে, বড় সন্তানের বিয়েতে কত অপব্যয় করেছেন। শুধু বিয়ের কার্ড চাপাতে কত টাকা ব্যয় করেছেন। এই খরচগুলো সুনিশ্চিতভাবে সম্পদ ক্রয়কারীর (আল্লাহর) ইচ্ছার বিপরীত। তিনি তো আপনার কাছ থেকে সম্পদ ক্রয় করে আপনাকে তার রক্ষক ও পাহারাদার নিযুক্ত করেছেন। আমার কথাগুলোকে নিছক ওয়াজ মনে না করে বুকে হাত রেখে চিন্তা করে দেখবেন। ওপরে উল্লিখিত আয়াতটি আবার পাঠ করবেন আর চিন্তা করবেন হিসাব কিভাবে দেবেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন যখন মানুষের হিসাব নেওয়া হবে, তখন মানুষ পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক পা-ও সামনে আগাতে পারবে না। প্রথম প্রশ্ন হলো জীবন কোন কাজে, কোন ব্যস্ততায় কেটেছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো যৌবন কোথায় কাটিয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছ? তৃতীয় ও চতুর্থ প্রশ্ন হবে সম্পদের ব্যাপারে। সম্পদ কোথা থেকে, কিভাবে অর্জন করেছ এবং কোন কাজে ও কোনভাবে তা ব্যয় করেছ? পঞ্চম প্রশ্ন হবে যা জানতে তার কতটা আমল করেছ? (সুনানে তিরমিজি)

আয়াতের প্রথম অংশ ‘মুমিনের জীবন’ কথাটির ব্যাখ্যা পাওয়া যায় উল্লিখিত হাদিসে। মুমিনের জীবন তথা তার শক্তি, সামর্থ্য, কর্মশক্তি, বাকশক্তি, চিন্তা ও মেধাশক্তি, বংশ ও আভিজাত্য সব কিছুই আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। সুতরাং শারীরিক শক্তি ও যোগ্যতা ক্রয়কারী আল্লাহর মর্জিমতো ব্যয় করতে হবে। এখন আপনি চিন্তা করে দেখুন! আপনার সামর্থ্য ও যোগ্যতার কতটুকু আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় হয়। আর কতটুকু অর্থহীন ও মন্দ কাজে ব্যয় হচ্ছে। অন্যের ক্ষতি করতে, অন্যের দোষ-ত্রুটি প্রচার করতে, অন্যের ওপর অপবাদ আরোপ করতে, অন্যকে অপদস্থ করতে ব্যয় করছেন। দেশ ও জাতির নির্মাণে কতটা শক্তি-সামর্থ্য ও মেধা ব্যয় হচ্ছে এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কতটা ব্যয় হচ্ছে। একইভাবে আল্লাহ প্রদত্ত মেধা-যোগ্যতা, চিন্তাশক্তি ও প্রতিভা প্রবৃত্তি পূজা, ভোগ-বিলাসে ব্যয় হয় এবং কতটা ক্রয়কারীর নির্দেশমতো দেশ ও জাতির কল্যাণে, মুসলিমদের জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠায়, বিবাদ মীমাংসায় ব্যয় হচ্ছে।

আপনি যে এলাকায় বসবাস করেন, সেখানে মুসলিম পরিবার কয়টি? তাদের কতজন নামাজ আদায় করে? রোজা রাখে? কতজন সন্তানদের দ্বিনি শিক্ষা দেয়, শরিয়তের অনুগত হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে, এ ব্যাপারে আপনি আপনার সামর্থ্যের কতটুকু ব্যয় করেছেন? আপনি যদি বিষয়গুলো মেনে চলেন, তবে আপনি জাগ্রত। আপনার দায়িত্ব হলো অন্যদেরও জাগিয়ে তোলা। তাদের পথ দেখানো যারা পথ চেনে না। তাদের সতর্ক ও সচেতন করা আপনারই দায়িত্ব।

তামিরে হায়াত থেকে আবরার আবদুল্লাহর ভাষান্তর

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments