Tuesday, May 17, 2022
spot_img
Homeধর্মমাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির ইসলাম গ্রহণ ও শিক্ষাজীবন

মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির ইসলাম গ্রহণ ও শিক্ষাজীবন

পৃথিবীর বুকে যেসব মনীষীরা নিকষ কালো আঁধার বিদূরিত করে আলো ছড়িয়েছেন, তাদের প্রতি যুগের পর যুগ পার হয়ে গেলেও আগ্রহী মানুষের কৌতূহলের শেষ থাকে না। 

আগ্রহী মানুষ জানতে চায়, এত বড় মহিরুহ হয়ে ওঠার পেছনে মূল রহস্য কোথায়? সে কৌতূহলের জায়গা থেকে আগ্রহী পাঠকরা চষে বেড়ান ইতিহাসের হাজারও পৃষ্ঠা। সন্ধান করতে থাকেন তার রহস্য। কখনও কখনও তারা পেয়ে যান তাদের সফলতার রহস্য আবার কখনও বা ফিরে যেতে হয় ব্যর্থ হয়ে। 

মনীষীদের জীবনের যেসব বিষয়ের প্রতি মানুষের বিশেষ কৌতূহল কাজ করে তার মধ্যে তাদের শিক্ষাজীবন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কারণ সাফল্যের পেছনে মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষা। তাই স্বভাবতই এ দিকটির প্রতি মানুষের থাকে দুর্বার আকর্ষণ। 

বিষয়টি কৌতূহলিদ্দোপক হলেও এর জন্য উপযোগী উপাদান কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না। এমন বইয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যেখানে মনীষীদের শিক্ষাজীবনের বিষয়টি সবিস্তারে উঠে আসে। 

আমাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে, আমাদের আজকের আলোচিত মনীষী মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি রাহিমাহুল্লাহ নিজেই তার শিক্ষাজীবনের সংক্ষিপ্ত অথচ চমৎকার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। আমরা পাঠকের সামনে তার শিক্ষাজীবনের অংশটি তার জবানিতেই হাজির করতে চাই।

মাওলানা লিখেছেন তার অসাধারণ গ্রন্থ ‘আত তামহিদে’ (পৃষ্ঠা: ১৬২) লিখেন, ‘আমার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় ১২৯৫ হিজরী/১৮৭৮ সনে। গণিত, এলজেবরা, ইউক্লিড এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস ছিল আমার প্রিয় বিষয়বস্তু। এসব বিষয়ে সাধারণত স্কুলগুলোতে যা পড়ানো হয়, আমি এর চেয়ে অনেক বেশি পড়েছি। এসব বিদ্যায় আমি পাণ্ডিত্য অর্জন করি। আরবি সাহিত্যের প্রাথমিক বইপত্র মাত্র এক বছরে আমি পাঠ করেছি। উর্দু ভাষায় লিখিত যত বই আমার হাতে এসেছে আমি সবই পড়েছি।

ইসলাম সম্পর্কে আমার পড়াশোনা

১৩০১ হিজরী/১৮৭৮ সনে শায়খ ওবায়দুল্লাহ মালিরকোটলি (যিনি হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছিলেন) কর্তৃক লিখিত ‘তুহফাতুল হিন্দ’ নামক বইটি আমার দৃষ্টিগোচর হয়। আমি বইটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। এক পর্যায়ে বইটি গভীরভাবে অনুধাবন করলাম। এভাবেই আল্লাহ তাআলা আমাকে ইসলামের আকিদা-বিশ্বাসের প্রতি পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাসের সৌভাগ্য দান করলেন। 

আমি গোপনে পবিত্রতা, নামাজ, রোজা ইত্যাদি শরিয়তের মৌলিক বিধানগুলো শিখতে শুরু করলাম। এ সময়েই আমি মহান সংস্কারক শায়খ ইসমাইল শহিদের (রহ.) লেখা ‘তাকবিয়াতুল ঈমান’ অধ্যয়ন করার সুযোগ পাই। এছাড়া শায়খ মুহাম্মাদ বিন বারাকাল্লাহ লাহোরির (রহ.) লেখা ‘আহওয়ালুল আখেরাহ’ও পাঠ করি।

ইসলাম গ্রহণ

আমি যখনই একা থাকার সুযোগ পেতাম সঙ্গে সঙ্গে ইবাদতে নিমগ্ন হয়ে যেতাম। বিশেষত রাতের অন্ধকারে আমি একাকী নামাজ আদায় করতাম। সে ইবাদত এবং মুনাজাতে এমন তৃপ্তি পেতাম এরপর সেরকম স্বাদ আর তৃপ্তি খুব কমই অনুভব হয়েছে। আমি ১৩০৪ হিজরী মোতাবেক ১৮৮৭ সালে কিছু রোজাও রাখি। এরপর ঘরের সদস্যরা টের পেয়ে যাওয়ার আশংকায় রোজা রাখা ছেড়ে দেই।

এরপর আমার ইসলাম গ্রহণের প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠল। কিন্তু আমি ঘরবাড়ি ছেড়ে হিজরত করার নিয়ম জানতাম না। এসময় আমি হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের সে বিখ্যাত দুআ ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমিন’ বারবার পাঠ করতে থাকি। 

এরপর ১৩০৪ হিজরী যিলকদ মাসে মোতাবেক ১৮৮৭ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখে আল্লাহ তাআলা আমার জন্য হিজরতের পথ তৈরি করে দিলেন। আমি গোপনে নিজের ঘর এবং শহর ছেড়ে বের হয়ে গেলম। সিন্ধে গিয়ে আমি আমার ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলাম। নিজের নাম রাখলাম ওবায়দুল্লাহ। এ সময় আমার বয়স ছিল ১৬ বছর।

শিক্ষাজীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়

আমি যখন ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করা শুরু করি তখন সিন্ধু এবং মুলতানের কিছু শিক্ষকের কাছে নাহু-সরফ তথা আরবি ব্যাকরণের পাঠ গ্রহণ করি। এ সময় আমি হযরত মাওলানা আবুস সিরাজ গোলাম মুহাম্মদ দিনপুরির সান্নিধ্যে ছয় মাস অবস্থান করি।

দারুল উলুম দেওবন্দে

এরপর আমি উপমহাদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষার পীঠস্থান দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্দেশে যাত্রা করি। সেখানে গিয়ে ভর্তি হই ১৩০৫ হিজরীতে মোতাবেক ১৮৮৮ সালে। সেবছর আমি আল্লামা ইবনুল হাজিবের লেখা কাফিয়া পাঠ করলাম। 

যখন আমি ‘শরহে জামি’ কিতাবের পাঠগ্রহণ শুরু করলাম, দারুল উলুম দেওবন্দের একজন বিদগ্ধ শিক্ষকের কাছ থেকে অধ্যয়নের পদ্ধতি শিখে নিলাম। তার সাহায্যে আমি সংক্ষিপ্ত সময়ে অধ্যয়ন করার এমন এক যোগ্যতা অর্জন করি যে, একটি শাস্ত্রের একের পর এক বই আমার আর শিক্ষকদের কাছে পড়ার প্রয়োজন বাকি থাকেনি।

আমি ‘তুহফাতুল হিন্দ’ এবং ‘তাকবিয়াতুল ঈমানে’ পড়েছিলাম, মূর্খ মুসলিমদের মধ্যেও হিন্দুদের বহু পৌত্তলিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে। তারপর যখন আমি সিন্ধুতে সাইয়েদুল আরেফিনের সান্নিধ্যে গেলাম, দেখলাম তারা হানাফি। এ জাতীয় কুসংস্কার থেকে তারা বেঁচে থাকেন। 

একইভাবে আমি আহলে হাদিসদের একটি দলকে দেখলাম তারা এ কুসংস্কারগুলোর বিরোধিতায় বাড়াবাড়ি করে থাকে। তারা কাছাকাছি এলাকা থেকে সাইয়েদুল আরেফিনের মসজিদে আসত। রুকুতে যাওয়ার সময় তারা হাত উত্তোলন করত। উচ্চস্বরে কেরাতের নামাজগুলোতে তারা সজোরে আমিন বলত।

আমি লক্ষ্য করলাম উভয় দলই শিরক-বিদআতের খণ্ডনে এবং মাওলানা ইসমাইল শহিদের (রহ.) সম্মান ও মর্যাদার বিষয়ে একমত ছিল। এরপর যখন আমি মুলতানের মুজাফফরগড় কোটলা অঞ্চলে গেলাম সেখানে হানাফিদের একটি দলকে দেখলাম তারা এসব কুসংস্কারে নিমজ্জিত। এরা মাওলানা ইসমাইল শহিদকে প্রচণ্ড ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে।

এরপর যখন আমি দারুল উলুম দেওবন্দে আসলাম, দেখলাম তারা সাইয়েদুল আরিফিনের আদর্শের কাছাকাছি। অর্থাৎ তারাও হানাফি মতাদর্শের। মাওলানা ইসমাইল শহিদকে তারা স্মরণ করে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে। এভাবে এ দলের সাথে মেলামেশার পর আমার এ বিষয়ে প্রশান্তি অর্জিত হয়ে যায়।

দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা অধ্যয়ন

এরপর আমি দর্শন এবং যুক্তিবিদ্যা শিক্ষায় মনোনিবেশ করলাম। এ উদ্দেশ্যে আমি রামপুর এবং কানপুর সফর করলাম। ওখানে মুফতি লুৎফুল্লাহ এবং মাওলানা আবদুল হক খাইরাবাদির ছাত্রদের মতো বিদগ্ধ ব্যক্তিদের কাছে যুক্তিবিদ্যা এবং দর্শনশাস্ত্রের পাঠ গ্রহণ করলাম। 

এ উদ্দেশ্য অর্জন করতে গিয়ে আমি ছয়মাস দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে অনুপস্থিত থাকলাম। এরপর ১৩০৭ হিজরী মোতাবেক ১৮৮৯ সালে আমি আবার দেওবন্দে ফিরে আসলাম।

আমি অধিকাংশ শিক্ষককে দেখতাম তারা নিরেট বুদ্ধিবৃত্তিক শাস্ত্রগুলোতেও বিভিন্ন কিতাবের টীকা ও ভাষ্যগ্রন্থগুলোর উপর নির্ভর করেন। এরা দর্শনের কঠিন বিষয়গুলোর সমাধানকল্পে নিজেদের চিন্তা[১]বুদ্ধিকে বিশেষ কাজে লাগান না। 

সত্যি বলতে কি, আমি আমার এ ধরণের শিক্ষকদের কাছ থেকে উপকৃত হয়েছি অনেক কম। বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনে আল্লাহ তাআলা আমাকে দু’কারণে বেশি উপকৃত করেছেন।

এক: আমি চিন্তা-ভাবনা এবং বুদ্ধির ব্যবহারকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছিলাম।

দুই: আমি গণিত খুব ভালোভাবে শিখেছিলাম। বিভিন্ন বই অধ্যয়ন করার পদ্ধতি আমি খুব ভালো করে রপ্ত করেছিলাম।

এ কারণেই আমি এ সমস্ত বিষয়ে কারও অন্ধ অনুকরণ করিনি। এদের কাছে কিছু বিষয় এজন্য সর্বস্বীকৃত মনে করা হতো যে, তারা তাদের সম্মানিত শিক্ষকদের লিখিত টীকা-টিপ্পনির ব্যাপারে খুব ভালো ধারণা রাখত। অবশ্য আমি মাওলানা আব্দুল হক খাইরাবাদির ছাত্রদেরকে অন্যদের থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান পেয়েছি।

ফিকহের মূলনীতি অধ্যয়ন

যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের পাঠ শেষ করে আমি মনোনিবেশ করলাম ইলমে কালাম ও উসুলে ফিকহের প্রতি। এ শাস্ত্রগুলোর প্রাথমিক এবং বুনিয়াদী শিক্ষা অর্জন করি দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষকদের কাছে। এদের মধ্যে ছিলেন শায়খ আবুত তাইয়িব আহমদ বিন শাইখুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুভি। তিনি ছিলেন দারুল উলুমের সম্মানিত পরিচালক।

হজরত শাইখুল হিন্দের সান্নিধ্যে

এরপর আমি হযরত শাইখুল হিন্দের কাছে ‘আত তাওযিহ’ ও ‘আত তালওয়িহ’ অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম। ক্লাসের মধ্যে আমি তার কাছ থেকে মাঝে মাঝে দৈনিক দু’চারটি বাক্য এমন শুনতাম, যেগুলো টীকা ও ভাষ্যগ্রন্থগুলোতে পাওয়া যেত না। পরে যখন আমি এ বাক্যগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতাম তখন আমার খুব প্রশান্তি অর্জিত হতো। 

এভাবেই মূলত আমার কাছে শাইখুল হিন্দের মর্যাদা ও মূল্য বাড়তে থাকল। এরপর ধীরে ধীরে আমার এ ধারণার পরিবর্তন ঘটতে লাগল যে, ‘‘আমি কিতাব সমাধানের জন্য ব্যক্তিগত অধ্যয়নের উপরই নির্ভর করব’’। এ ধারণা আমি আমার শিক্ষকদের দেখে আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছিলাম।

হযরত শাইখুল হিন্দকে দেখার পর আমার বিশ্বাস হয়ে গেল, এমন মর্যাদাবান মহান শিক্ষকের কাছেই আমার জ্ঞান এবং চিন্তার সমৃদ্ধি অর্জন করা উচিত। আমি নিজের ওপর শাইখুল হিন্দের সান্নিধ্য গ্রহণকে আবশ্যক করে নিলাম। 

আমি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিদায়া’ তার কাছে পড়েছি। আরবি অলংকার শাস্ত্রের বিখ্যাত কিতাব ‘মুতাওয়াল’ এবং তাফসিরে বাইযাবিও তার কাছে অধ্যয়ন করেছি। ‘শারহুল মাওয়াকিফ’, ‘মুসাল্লামুস সুবুত’ ‘আল ইতকান ফি উলুমিল কুরআন’ এ কিতাবগুলোর কঠিন জায়গাগুলো তার কাছ থেকে সমাধান করে নিয়েছি।

১৩০৭ হিজরী মোতাবেক ১৮৯০ সালে আমি বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম। আমার সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ আমার ওপর ভীষণ খুশি প্রকাশ করলেন। এদের মধ্যে মাওলানা সাইয়েদ আহমদ দেহলভিও ছিলেন। শিক্ষকবৃন্দ আমাকে অত্যন্ত উচ্চস্তরে সাফল্য লাভের সার্টিফেকেট লিখে দিলেন। এরকম সনদ দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাসে মাত্র কয়েকজনকে দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল আমার প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ।

ইমাম কাসেম নানুতুভিকে অধ্যয়ন

যখন আমি ফিকহের মূলনীতিশাস্ত্রও কালামশাস্ত্রের বইপত্র পড়ে শেষ করলাম তখন আমি শাইখুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুভির বইপত্র অধ্যয়ন করা শুরু করলাম। আমার মনে হলো আমি যেন এখানে আমার হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান বস্তু পেয়ে গেছি। এ কিতাবগুলো পাঠ করার পর আমার সিনা খুলে গেল। হৃদয় প্রশস্ত হয়ে গেল।

এ কিতাবগুলোর কারণে আমার বহু দুর্বোধ্য বিষয় সমাধান হয়ে গেল। কারণ শাইখুল ইসলাম কাসেম নানুতুভি (রাহি.) নিজের চিন্তা প্রকাশ করার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত কোন শব্দ লিখতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রচলিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোন বিষয় থেকে নিজের কথার যুক্তি উপস্থাপন না করেন। 

তিনি তার বইপত্রে উল্লিখিত দুর্বোধ্য বিষয়াদি বোঝানোর জন্য গণিতশাস্ত্রের নীতিমালার আলোকে বিভিন্ন উদাহরণ পেশ করতেন। তিনি তার দলিলের ভূমিকা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আগের আলিমদের থেকে এমন বিষয় একেবারে উল্লেখ করতেন না, যেটা তাদের পরিভাষা জানা ছাড়া বোঝা কঠিন। 

তিনি সাবলীল উর্দু ভাষায় এমন বিশুদ্ধভাবে কথা বলতেন যে, এর জন্য কোন টীকা কিংবা ব্যখ্যাগ্রন্থের প্রয়োজন হতো না। হযরত নানুতুভি অত্যন্ত সুদৃড় দলিল-প্রমাণ ও যুক্তির আলোকে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও মুশরিকদের বিভিন্ন কুসংস্কার খণ্ডন করতেন।

আমি যেহেতু হিন্দুদের কিছু বিশ্বাস ও রীতিনীতি সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত, তাই এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমার অনুভব হতো মাওলানা নানুতুভির উল্লিখিত যুক্তি-প্রমাণ আমার হৃদয়ের গহীনে প্রবেশ করছে। 

মোটকথা মাওলানা নানুতভির বইপত্র অধ্যয়নের বরকতে দার্শনিক, কালামবিদ, নাস্তিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আরোপিত নানা সংশয়-সন্দেহ থেকে আমি মুক্তি পেয়ে যাই।

আমি আমার সমসাময়িক বন্ধুদের দেখতাম, তারা মাওলানা নানুতুভির বইপত্র তো খুব ভালোবাসতেন, কিন্তু সেগুলো পাঠ করতেন না। কারণ হলো, তারা গণিত জানতেন না। তারা এরকম বইপত্র পাঠ করার সামর্থ্য রাখতেন না, যেখানে বইয়ের কলেবর ২০০ পৃষ্ঠার মতো; অথচ কোন অধ্যায় বা কোন পরিচ্ছেদ নেই। 

আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ যে, আমার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। আমার ধারাবাহিক বিষয় এবং লম্বা বিষয়বস্তু পড়ার অভ্যাস ছিল। এ কারণেই আমি মাওলানা নানুতুভির বইপত্র থেকে ইলমের এক বিশাল ভান্ডার আত্মস্থ করেছি। 

এ সময়েই আমি শাইখুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতুভির জীবনের বিভিন্ন ঘটনা আমার শিক্ষকদের কাছে শুনতে থাকি। বিশেষত আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হযরত নানুতুভির সুযোগ্য সন্তান মাওলানা আহমদ বিন মাওলানা কাসেম নানুতুভির (দারুল উলুম দেওবন্দের সম্মানিত মুহতামিম) কাছ থেকে তার বহু ঘটনা আমি শুনি। 

তিনি প্রতিদিন হযরত নানুতুভির জীবনের কোন না কোন ঘটনা বলতেন। সে ঘটনাবলী থেকে আমি অনুমান করেছিলাম, হযরত নানুতুভির শিক্ষক ও গুরু মাওলানা মামলুক আলি নানুতুভি তার দূরদর্শিতার আলোকে বুঝতে পেরেছিলেন ‘মাওলানা নানুতুভি মাওলানা ইসমাইল শহিদের মতো হবেন’। 

তাই আমি মাওলানা ইসমাইল শহিদের পর মাওলানা কাসেম নানুতুভিকে আমার নেতা ও ইমাম মানি। আমি এতে ভীষণ গর্বিত।

হাদিস শাস্ত্রের পাঠ

১৩০৮ হিজরী মোতাবেক ১৮৯০ সালে আমি হাদিস শাস্ত্রের প্রতি মনোনিবেশ করলাম। সে হিসেবে ‘জামে তিরমিযি’র একটি বড় অংশ আমি আমার সম্মানিত শিক্ষক হযরত শাইখুল হিন্দের কাছে পাঠ করেছি। সুনানে আবু দাউদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির কাছে পড়েছি। এভাবেই আমি এক দল বিদগ্ধ আলিমের কাছে হাদিস শাস্ত্রের পাঠ গ্রহণ করেছি। 

তবে আমি এতটুকু বলতে চাই, আমার শায়খ ও উস্তাদ হজরত শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দি আমার শিক্ষকদের ধারায় বাবার মতো। বাকি শিক্ষকগণ আমার চাচা ও দাদাদের মতো। 

ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রাহিমাহুল্লাহ) ‘ইযালাতুল খাফা’য় লিখেন, ‘আমার শায়খ আবু তাহের কুর্দি আল মাদানি আমাকে বলেছেন, তার উস্তাদ শায়খ হাসান আল উজায়মি আল মাক্কি একবার বললেন, ‘‘আমি আমার শিক্ষক ঈসা আল মাগরিবিকে একবার জিজ্ঞেস করলাম, কোন ছাত্র একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষা অর্জন করছে। এমতাবস্থায় তার জন্য অন্য কোন শিক্ষকের কাছে যাওয়া উচিত কিনা? তিনি বললেন, বাবা সবসময় একজনই হয়। অবশ্য চাচা একাধিকও হতে পারে।’
 
মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির সান্নিধ্যে

সুনানে আবু দাউদের একটি বড় অংশ আমি শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলনা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির (রহ.) কাছে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে এবং বুঝে বুঝে গভীরভাবে পাঠ করেছি। পরে আমি জানতে পারলাম, শায়খ আবদুল করিম বায়েলি মৌলিক হাদিসগ্রন্থগুলোর ব্যখ্যায় হযরতের গবেষণামূলক লেকচারসমগ্র সংকলন করেছেন, যা তিনি ক্লাসের সময় শ্রবণ করেছিলেন। তার লেখা লেকচারগুলোর কলেবর যদিও খুব বড় নয়; কিন্তু এতে গভীর ও সুক্ষ্মসুক্ষ্ম কথাগুলো প্রচুর পরিমাণে সংকলিত হয়েছে। 

শায়খ আবদুল কারিম বায়েলি সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিযি এবং সুনানে নাসাঈর যে লেকচার সংকলন করেছিলেন, আমি তা অধ্যয়ন করি এবং মুখস্থ করে ফেলি। শায়খ আবদুল করিম বায়েলি ছিলেন হযরত নানুতুভি ও গাঙ্গুহি উভয়ের শাগরিদ। তাছাড়া তিনি আপন ভাই আব্দুর রহিম বায়েলির কাছেও পড়েছেন। আব্দুর রহিম সাহেব ছিলেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা নযির হুসাইন দেহলভির ছাত্র। 

আমি আব্দুল করিম সাহেবের কাছেও পড়েছি। তিনি আমাকে হাদিসের ইজাযত প্রদান করেছিলেন। তাছাড়া তার মাধ্যমে হযরত নানুতুভির বইপত্র অধ্যয়নের ক্ষেত্রে আমি বিশেষ সহযোগিতা পেয়েছি। এছাড়া নবাব সিদ্দিক হাসান খান কিন্নাওজির বইপত্র পাঠেও তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন। শায়খ আব্দুল করিম বায়েলি ছিলেন পাক্কা দেওবন্দি আদর্শের আহলে হাদিস আলেম।

হযরত গাঙ্গুহির সান্নিধ্যের প্রভাব

শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির সান্নিধ্যে অবস্থান করে আমি যে বোধ ও দূরদর্শিতা অর্জন করেছি সেটা আমাকে পরবর্তী জীবনে অনেক উপকার করেছে। আমি হযরত গাঙ্গুহি থেকে অনেক বেশি উপকৃত হয়েছি। আমার রক্তমাংসে তারই সান্নিধ্যের প্রভাব মিশে গেছে। ফলে আমি এদিক সেদিক বখে যাওয়া থেকে বাঁচতে পেরেছি। 

তার সান্নিধ্যের বরকতেই আমার কাছে ওয়ালিউল্লাহি চিন্তাধারা খুব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেছি, নিংসন্দেহে হযরত গাঙ্গুহি একজন বিজ্ঞ ইমাম ছিলেন। ইমাম আবু হানিফার মাযহাবে তার অবস্থান ছিল মুজতাহিদতুল্য। 

এতে কোন সন্দেহ নেই আমাদের উসতাদ হযরত গাঙ্গুহি মাওলানা শাহ মুহাম্মদ ইসহাক দেহলভির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলেন; যেমন আমাদের শায়খ নানুতুভি হযরত মাওলানা ইসমাইল শহিদের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিলেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমি হযরত গাঙ্গুহির কাছ থেকে তার সূত্রে সরাসরি হাদিসের ব্যপক ইজাযত (হাদিস অধ্যাপনার অনুমোদন) লাভ করতে পারিনি। ফলে আমি শাইখের সনদ তার ছাত্রদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছি। এদের মধ্যে ছিলেন শায়খ আব্দুর রাযযাক কাবুলি। তিনি আমাকে হযরত গাঙ্গুহির সনদে সকল হাদিসের কিতাবের ইজাযত প্রদান করেন।

হজরত শাইখুল হিন্দের ইজাযত ও উপদেশ

১৩০৮ হিজরীর শেষে এবং ১৮৯১ সালের শুরুতে আমার গুরু ও শিক্ষক হযরত শাইখুল হিন্দ রাহিমাহুল্লাহ আমাকে সমস্ত হাদিসের কিতাব পাঠদানের আম ইজাযত (ব্যপক অনুমোদন) প্রদান করেন। এ বিষয়ে শাইখুল হিন্দের যেসব উপদেশ আমার আজও মনে আছে সেগুলো নিম্নরূপ।

১] মৌলিক হাদিসগ্রন্থসমূহের লেখকরা এবং বিদগ্ধ হাদিসের ইমামগণ হাদিসের শুদ্ধাশুদ্ধির ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন তার বিরোধিতা না করা। এ বিষয়ে সংশয় সৃষ্টিকারী পরবর্তীদের কারও কথার দিকে একেবারেই ভ্রুক্ষেপ না করা।

২] বাহ্যত বিরোধপূর্ণ দু’টি হাদিসের মধ্যে তারজিহ তথা প্রাধাণ্য দেওয়ার পরিবর্তে তাত্ববিক তথা বিরোধ নিষ্পন্ন করার পদ্ধতি অবলম্বন করা।

৩] পূর্ণ মনোবল আর দৃঢ়তার সঙ্গে হাদিসের গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা। এ ধারাবাহিকতায় হাদিসের প্রথম স্তরের গ্রন্থগুলো যেমন, মুআত্তা ও সহিহাইন তথা বুখারি ও মুসলিম এবং দ্বিতীয় স্তরের গ্রন্থগুলো যেমন, সুনানে তিরমিযি, আবু দাউদ এবং সুনানে নাসাই সামনে রাখতে হবে। 

আর প্রয়োজন হলে মুসনাদে আহমদ (বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগ্রন্থসমূহ) দেখবে। হাদিসের ভাষ্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে ফাতহুল বারির ওপর নির্ভর করবে। এরপর দেখবে হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ।

শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভির বইপত্র পাঠ

উলামায়ে মুজতাহিদিন এবং হাদিসের ব্যখ্যাকারদের মধ্যে মতবিরোধ আমাকে ভীষণ উদ্বিগ্ন করত। এজন্য আমার প্রয়োজন ছিল হাদিস অধ্যয়নের জন্য নিজেকে অবসর করে নেওয়া। 

কিন্তু দুংখজনকভাবে আমি ওইসময় মারাত্মক অসুস্থতার শিকার হয়ে যাই। ফলে আমাকে দেওবন্দ থেকে দিল্লি চলে যেতে হয়। সেখানে শাইখুল হিন্দের এক সুহৃদ হাকিম জামিলুদ্দিনের তত্বাবধানে আমি চিকিৎসা গ্রহণ করি। 
হাকিম সাহেব আমার প্রতি অত্যন্ত যত্ম নিলেন। সেসময় আমি হযরত মাওলানা শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভির বইপত্র অধ্যয়ন করার সুযোগ পাই। তার সব বইপত্র সেসময় পাঠ করে ফেলি। 

এখানে এসেই আমি মোল্লা আলি কারি রাহিমাহুল্লাহর বিখ্যাত গ্রন্থ আল মিরকাত খুঁজে পাই হাকিম সাহেবের কুতুবখানা থেকে। এ কপিটি হাকিম সাহেবের কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে ছিল। কারণ কোন না কোনভাবে তিনি মোল্লা আলি কারি রাহিমাহুল্লাহর বংশধর ছিলেন। 

এ অসাধারণ গ্রন্থটি তখন আমি পাঠ করি। যেহেতু আমি দারুল উলুম দেওবন্দের উসতাদদের কাছে দিল্লির যুদ্ধ তথা ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কথা শুনেছিলাম, তাই দিল্লি অবস্থানকালীন সময়ে দিল্লির ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শন করলাম। ইতিহাসের শিক্ষার বিবেচনায় এটা আমার অনেক উপকারে এসেছে।’

পরিশিষ্ট

এছাড়া হযরত মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি রাহিমাহুল্লাহ আহলে হাদিস আলিমদের রচনাবলিও পাঠ করেন। এদের মধ্যে সাইয়েদ নযির হুসাইন দেহলভি সাহেবের রচনাবলি তিনি পাঠ করেছিলেন। এছাড়া তিনি ইয়েমেনের শায়খ মুহাম্মদ বিন ইসমাইল আল আমির আস সানআনি এবং মুহাম্মদ আলি আশ শাওকানির বইপত্রও পাঠ করেছিলেন গভীর অভিনিবেশে। 

পরবর্তী জীবনে তিনি হানাফি ইমামদের রচনাবলি বিশেষত ইমাম তাহাবি, ইমাম আবু যায়েদ দাব্বুসি, ইমাম জামালুদ্দিন যাইলাঈ এবং আল্লামা কামাল ইবনুল হুমামের রচনাবলিও পাঠ করেন মনোযোগ দিয়ে। আর শাফেয়ি ফিকহের অধ্যয়নও ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। 

বিশেষত ইমাম খাত্তাবি, ইমাম বাইহাকি, ইমাম নববি এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি প্রমুখের রচনাবলি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে অধ্যয়ন করেন। তার অধ্যয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রাহি.র রচনাবলি। 

তিনি সাধারণত শাহ ওয়ালিউল্লাহর কথাকেই চূড়ান্ত মতামত হিসেবে গ্রহণ করতেন। জীবনভর শাহ সাহেবের চিন্তা-দর্শনের ব্যখ্যা করেছেন। এটা শুধুবর্ক্তৃতা বা লেখালেখিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং কাজেকর্মেও তিনি শাহ ওলিউল্লাহর দর্শনকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছেন।

মোদ্দাকথা, বিচিত্র অধ্যয়ন এবং বড় বড় মনীষীদের সান্নিধ্য তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে তৈরি করে ঔদার্য, সহনশিলতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মহৎ গুণ। 

এরকম বিচিত্র অধ্যয়ন করতে পারলেই মূলত একজন মানুষ ভিন্নমতের মানুষকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। এজন্য তাকে স্বজাতির পক্ষ থেকে বিচিত্র আক্রমণের শিকারও হতে হয়েছে। 

তাকে অনেকেই বুঝতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে ছড়িয়েছে নানা প্রোপাগান্ডা। তবে দিনশেষে সত্য বেরিয়ে আসবেই, এটা বলাবাহুল্য ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments