Sunday, June 16, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামমহাফেজখানায় সংরক্ষিত দলিলপত্রের গুরুত্ব অসীম

মহাফেজখানায় সংরক্ষিত দলিলপত্রের গুরুত্ব অসীম

এ লেখার উদ্দেশ্য হলো প্রথমত, আর্কাইভ বা মহাফেজখানায় সংরক্ষিত অবিকৃত সমকালীন দলিলের গুরুত্ব বোঝানো এবং দ্বিতীয়ত, এ লেখা পাঠ করে ভবিষ্যতের গবেষকরা যেন আরও সতর্ক হন, পরিশ্রমী হন এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঐতিহাসিক ন্যারেটিভ সম্পর্কে গবেষণা করার সময় অনেক উৎস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে যত্নবান হন।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিশেষত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ইতিহাস লেখার পদ্ধতিতে মৌখিক/কথ্য ইতিহাস ‘বিপ্লব’ নিয়ে আসে। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তা, সৈনিক, রাজনীতিক সবাই স্মৃতিকথা লিখে যান, গবেষক ও মিডিয়াকর্মীরা তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে হুড়োহুড়ি শুরু করেন। বিশেষ করে বিজয়ী ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে তাদের জাতীয় বীর হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। শুরু হয় বিজয়ী দেশগুলোর ঐতিহাসিক ন্যারেটিভের নতুন ‘উন্মাদনা’, যা সংবাদপত্রের যুগ পেরিয়ে রেডিও ও টেলিভিশনের যুগে প্রবেশ করে এবং যুদ্ধের ইতিহাস নিয়মিত বা প্রাত্যহিক কিংবা সাপ্তাহিক ‘ব্রেকফাস্ট নিউজ’ অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে যায়। তখন এসব মৌখিক ইতিহাস সাড়া ফেলে দেয়। এছাড়া ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত হওয়ার যুগে এশিয়া ও আফ্রিকায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা, সংগঠক ও কর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, তাদের লেখা আত্মজীবনী, ব্যক্তিগত ডায়েরি ইত্যাদি ইতিহাস লেখার নিত্যনতুন উপাদান হিসাবে সংযুক্ত হতে থাকে। তবে স্মৃতিভ্রম এবং এককালের ঘটনা অন্যকালে বর্ণনার সময় মানবসন্তান, তা যে দেশেরই হোক না কেন, ‘রংচং’ মাখিয়ে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা কিছুটা হলেও বাড়িয়ে বলেন। এসব উপাদান আবার বিভিন্ন দেশের আর্কাইভেও সংরক্ষণ করার বিষয়টি চালু হয়। ফলে একসময় যেমন গবেষক ও ইতিহাসবিদরা প্রধানত নির্ভর করতেন সরকারি দলিলপত্র, সভা-সমিতির কার্যবিবরণী এবং গাণিতিক বিভিন্ন তথ্য, যেমন-একরপ্রতি খাদ্যশস্য উৎপাদন, আদমশুমারি কিংবা নির্বাচনের ভোটার তালিকা, প্রদত্ত ভোট এবং নির্বাচনের ফলাফল ইত্যাদির ওপর, তেমনি এখন এসবের পাশাপাশি নতুনভাবে এসে যুক্ত হয়েছে মৌখিক ইতিহাস। আর্কাইভে সংরক্ষিত দলিলপত্রের ওপর প্রধান নির্ভরতা বর্তমান সময়ে যে কমেছে তা নয়। বরং গবেষকের খাটুনি, সতর্ক পর্যবেক্ষণ যেমন অপরিহার্য, তেমনি যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আর্কাইভ বা মহাফেজখানায় প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করার মতো কঠোর পরিশ্রমের বিষয়টি নতুনভাবে সংযুক্ত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক আমলে দেশে বা বিদেশের বিভিন্ন মহাফেজখানায় সংরক্ষিত দলিলপত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে এসব আর্কাইভে একজন গবেষক যদি নিয়মিত এবং গভীর অভিনিবেশসহকারে মনোনিবেশ করেন, তাহলে ১৯৪০-এর দশকে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় যে যুগান্তকারী এবং ‘জীবন বদলে দেওয়া’ ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সংঘটিত হয়েছে, যেমন-নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জাতির ইতিহাস, রাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্মাণ কিংবা প্রতি-নির্মাণ; জাতি, ধর্ম, নৃগোষ্ঠী ও বিশ্ববীক্ষা নিয়ে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের মধ্যকার বিতর্ক, দ্বিধা অথবা ‘স্বপ্ন রাষ্ট্রের সন্ধানে’ দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাংশে ইতিহাসের বৃহত্তম আঞ্চলিক অভিবাসন সম্পর্কে অনেক পিলে চমকানো তথ্য পাওয়া যাবে। দেশ-বিদেশের আর্কাইভে সংরক্ষিত সেই সময়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও মানচিত্র এখনো আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ তখনই সঠিক ও অভ্রান্ত হবে, যদি তা তথ্যভিত্তিক হয়। এক্ষেত্রে প্রথম প্রমাণ হলো আর্কাইভে সংরক্ষিত দলিলপত্র। এছাড়া একজন গবেষককে অন্যান্য তথ্যরাজি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে উপস্থাপন করতে হবে। অবশ্য ঔপনিবেশিক, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপনিবেশ-উত্তর সরকারি ভাষ্যে হয়তো সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয় এবং এলিট বা ক্ষমতাবান শ্রেণির উৎপাদিত দলিলপত্রে নিম্নবর্গীয় মানুষের কথা এবং তাদের সামগ্রিক জীবনচিত্র খুব কমই দৃশ্যমান হয় অথবা এমনভাবে ঢাকা থাকে যে, গবেষকদের সতর্কতার সঙ্গে অন্যান্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করতে হয়।

এখানে আমি একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। এটি হলো সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ ও ভারতের যে মামলা চলছিল, তখন ভারত যেসব দলিলপত্র দাখিল করে তার মাঝে কিছু মানচিত্রও ছিল। এসব মানচিত্র যে পরবর্তী সময়ে প্রস্তুত করা হয়েছিল, তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া দলিলপত্র ও মানচিত্র বিশ্লেষণ করে। কারণ, বাংলাদেশ ১৯৪৭ সালের অবিকৃত মানচিত্র ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করে জমা দেয়। এর ফলে তখন হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মধ্যভাগ কোথায় তা নির্ধারণ করা আদালতের বিচারকদের পক্ষে সহজ হয়ে গিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল ‘রেডক্লিফ রোয়েদাদে’র ভিত্তিতে। এ রোয়েদাদ অনুযায়ী নদী বিভাজিত সীমানার ক্ষেত্রে ‘নদীর মূল স্রোতধারার মধ্যরেখা নীতি’কে (Mid-Channel Flow Principle) দুই দেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নীতি আবার ‘Thalweg Doctrine’ হিসাবেও পরিচিত।

ড. আশফাক হোসেন : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরিচালক, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস, ঢাবি

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments