Tuesday, December 6, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামভোটার তালিকা হালনাগাদে নয়-ছয় বন্ধ করতে হবে

ভোটার তালিকা হালনাগাদে নয়-ছয় বন্ধ করতে হবে

সঠিক ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত। ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন ও ভোটার আইডি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও অন্তর্ভুক্তির সুযোগ চিরতরে শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করা হলেও চলমান বাস্তবতা ভিন্নতর ইঙ্গিত বহন করছে। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণে বড় ধরণের অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে যে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে, সেখানে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মী এবং দলীয় প্রতীক ও সমর্থনে মনোনীত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা নিজেদের ইচ্ছেমত নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিতে দলীয় পরিচয়কেই প্রাধান্য দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন নির্বাচন কমিশনের একটি সাধারণ রুটিন কাজ হলেও আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চলমান হালনাগাদকরণ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি ‘স্বেচ্ছাসেবি’র পরিচয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও দালাল চক্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে জানা যায়। তারা দলীয় লোকজন ও আত্মীয় স্বজনদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়িয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে বলে জানা যায়। ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণের শুরুতে এ ধরনের অনিয়ম অত্যন্ত ভয়াবহ ঘটনা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ভোটার তালিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এতে নির্বাচনের আগেই বড় ধরণের রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এখনো সরকার এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে। সেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন করার কোনো বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বেশিরভাগ বিরোধীদল ইভিএমে নির্বাচন করতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া আগামী নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিরোধীদল সমুহের আন্দোলন বা রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ফর্মুলা পাওয়া গেলেও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ভোটার তালিকার কারণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। এর আগেও ভুয়া ভোটার করা নিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণে যে গলদ ও অপতৎপরতা দেখা যাচ্ছে তা নতুন করে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক ও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পরিচালক অভিযোগ খতিয়ে দেখে সংশোধনের পক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ বা নজরদারির প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথা না বলে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সমস্যা অস্বীকারের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচনের আগেই ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে।
সংবিধান অনুসারে, কোনো নাগরিকের আঠার বছরের আগে ভোটার হওয়ার সুযোগ নেই। ভোটার আইডি কার্ড এখন জাতীয় পরিচয়পত্র হিসেবেও স্বীকৃত। পাসপোর্ট করা, স্কুল-কলেজে ভর্তি, ভ্যাক্সিনেশনসহ সব ধরণের নাগরিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভোটার আইডি কার্ড নম্বর ও জন্মনিবন্ধন নম্বর অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠায় এর গুরুত্ব আগের চেয়ে বেশি। তবে রাজনৈতিক কারণে ভোটার তালিকায় অপ্রাপ্ত বয়স্কদের অন্তর্ভুক্তির যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ভোটার তালিকা এবং জন্মনিবন্ধনের জাতীয় পরিসংখ্যানের ডেটাবেজের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ইতোমধ্যে নানা ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের ডাটা বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার কাছে প্রায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ জনশুমারিতে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন বলে উল্লেখ করা হলেও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৯ কোটির বেশি বলে জানা যায়। জনসংখ্যা নিয়ে কাজ করা দুটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আড়াই কোটির বিশাল ব্যবধান কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ নিয়ে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ যেসব যুক্তি দেখাচ্ছে, তা নিরসন করার দায়িত্ব তাদের উপরই বর্তায়। জাতীয় পরিসংখ্যানে গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সরকারের উন্নয়নের পরিসংখ্যানগত দাবিগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে বাধ্য। ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণের ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ অনিয়ম ও চাতুর্যের অভিযোগ উঠেছে, তা এখনই বন্ধ করতে হবে। এ নিয়ে নয়-ছয় করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অপতৎপরতা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্তরায়। এতে নতুন করে রাজনৈতিক সংকটের উদ্ভব হলে তার দায় নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments