Sunday, June 16, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামভূমিকম্প, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে এরদোগান

ভূমিকম্প, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে এরদোগান

মোহাম্মদ আবুল হোসেন

তুরস্কে যে ক্ষতি হয়েছে তা শত শত কোটি ডলারের। অর্থনীতি এমনিতেই ধুঁকছে। মুদ্রাস্ফীতি আগেই বলা হয়েছে কমপক্ষে শতকরা ৫৮ ভাগ। ফলে এ বছর দেশটিতে অর্থনীতির পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। শত শত কিলোমিটার জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ। লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। যারা বেঁচে আছেন, তাদেরকে সবকিছু নতুন করে সাজাতে হবে
রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। ২০০৩ সাল থেকে প্রায় দুই দশক ধরে তিনি তুরস্কের ক্ষমতার কেন্দ্রে। তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

শক্ত হাতে ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন। মুসলিমদের কাছে খুব জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব তিনি। মুসলিমদের বিভিন্ন ইভেন্টে, মুসলিম নির্যাতনের অনেক প্রেক্ষিতে তিনি সোচ্চার হয়েছেন। এক সময় অসচ্ছল পরিবারে বেড়ে উঠেছেন এই নেতা। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তিনি বাজারে রুটি (সীমিত) বিক্রি করতেন। তা থেকে যে লাভ হতো, তা দিয়ে স্কুলের বেতন পরিশোধ করতেন। টিনেজ বয়সে এরদোগানের পিতা তাকে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রতি সপ্তাহে ২.৫ লিরা দিতেন, যা এক ডলারের চেয়েও কম। এই অর্থ দিয়ে এরদোগান পোস্টকার্ড কিনে তা রাস্তায় বিক্রি করতেন। জ্যামে আটকে থাকা চালকের কাছে বিক্রি করতেন পানির বোতল। যুবক বয়সে স্থানীয় একটি ক্লাবে আধা-পেশাদারী ফুটবল খেলেছেন। এমনি করে বেড়ে ওঠা, জনগণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এরদোগানের সামনে তার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উপস্থিত এখন।   

আগামী ১৪ই মে সেখানে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। তাতে তিনি নির্বাচিত হবেন, এমনটা নিশ্চিত করে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে ভূমিকম্প জনপদকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। এতে উদ্ধার অভিযানে ধীরগতি নিয়ে বিরোধী এবং কিছু অধিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গিয়েছে। দেশটিতে অর্থনীতির চিত্রও ভালো নয়। মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে শতকরা ৫৮ ভাগ। এ অবস্থায় এরদোগানের বিরুদ্ধে জনমত চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচনে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান একজন ঝানু রাজনীতিক। তিনি যেকোনো পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ভূমিকম্পে তিনি যে পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তাকে ব্যবহার করে জাতীয় সমর্থন আদায় করার কৌশল বের করে ফেলতে পারেন। তাতে আখেরে তার অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। এরই মধ্যে তিনি দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বর্ণনা করেছেন, তার দেশে ৮০ বছরের চেয়েও বেশি সময়ের মধ্যে এই ভূমিকম্প ভয়াবহ। হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী নামানো হয়েছে। তীব্র শীতের মধ্যেও কোনো প্রচেষ্টা বাদ রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘লেভেল ৪ অ্যালার্ম’ ঘোষণা করেছেন। ফলে আন্তর্জাতিক সাহায্য যাওয়া শুরু করেছে। সবচেয়ে দুর্গত প্রদেশগুলোতে ঘোষণা করেছেন ৩ মাসের জন্য জরুরি অবস্থা। 

এ বিষয়ে কনসালটেন্সি বিষয়ক গ্রুপ ইউরেশিয়া বলেছে, সংকটে দ্রুততার সঙ্গে এবং সুসংহতভাবে পদক্ষেপ নিয়েছেন। ১৪ই মে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এতে তার নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করতে পারে। ভূমিকম্পে যেসব প্রদেশে বেশি ক্ষতি হয়েছে তার বেশির ভাগই এরদোগানের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত। এতে তার পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে কিনা তা এখনো পরিষ্কার নয়। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশগুলোর বেশির ভাগই দেশটির দক্ষিণে এবং তারা সামাজিকভাবে রক্ষণশীল। এসব এলাকা এরদোগানের ইসলামপন্থি একে পার্টির শক্ত ঘাঁটি। এমনটা মনে করেন ইস্তাম্বুলভিত্তিক থিংকট্যাংক ইডাম-এর চেয়ারম্যান ও তুরস্কের সাবেক কূটনীতিক সিনান উলগেন। তার মতে, একে পার্টির গড় পারফরমেন্স জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে ওই প্রদেশগুলোতে বেশি। বিরোধীদের দখলে থাকা এলাকাগুলোর তুলনায় একে পার্টির শক্ত ঘাঁটির প্রদেশগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে বেশি সমর্থন পেয়ে থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি প্রদেশে দেশটির ৮ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে শতকরা প্রায় ১৫ ভাগের বসবাস। ৬০০ আসনের পার্লামেন্টেও তুলনাটা একই রকম। ২০১৮ সালে যে নির্বাচন হয় তখন এরদোগান এবং একে পার্টি যথাক্রমে প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়। শুধু দিয়ারবাকির এর মধ্যে বাদ ছিল। এই অঞ্চল ভোট দেয় কুর্দিপন্থি এইচডিপি পার্টিকে এবং এর প্রার্থী সেলাহাতিন দেমিরতাকে। তিনি জেলে থেকেই নির্বাচন করেন। এসব এলাকায় ভূমিকম্পের কারণে ইমোশন বা আবেগ ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। শুধু তুরস্ক নয়, বাকি বিশ্বের মানবতা কাঁদছে।  তুরস্কে যে ক্ষতি হয়েছে তা শত শত কোটি ডলারের। অর্থনীতি এমনিতেই ধুঁকছে। মুদ্রাস্ফীতি আগেই বলা হয়েছে কমপক্ষে শতকরা ৫৮ ভাগ। 

ফলে এ বছর দেশটিতে অর্থনীতির পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। শত শত কিলোমিটার জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ। লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। যারা বেঁচে আছেন, তাদেরকে সবকিছু নতুন করে সাজাতে হবে। এতে তুরস্কের অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে। এখনো রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষ এই ভূমিকম্প থেকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে তাড়াহুড়ো করেনি। ৬ দলীয় বিরোধী জোট শুধু কোনো রকম বৈষম্য ছাড়া কাজ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কুর্দি সম্প্রদায় এবং সিরিয়ার শরণার্থী- কারও প্রতি যেন বৈষম্য করা না হয়, এটা তাদের দাবি। কিন্তু মধ্য ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী দল আইওয়াইআই পার্টির  সেক্রেটারি জেনারেল উগুর পোয়রাজ এরই মধ্যে বলেছেন, তিনি গত মঙ্গলবার দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময়ে তিনি কোনো ইমার্জেন্সি উদ্ধারকর্মীর কোনো চিহ্নই দেখতে পাননি। তার মতে, ত্রাণ সমন্বয়ে কোনো পেশাদারিত্ব নেই। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষজনকে উদ্ধারে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছেন নাগরিকরা এবং স্থানীয় বিভিন্ন টিম। তবে সরকার বলছে, উদ্ধার অভিযানে নেমেছে কমপক্ষে ১২ হাজার সদস্য। ৯ হাজার সেনা সদস্য। এমন অবস্থায় জনগণের আস্থা কোনদিকে যাবে! রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান কি পুনঃনির্বাচিত হতে পারবেন! ভূমিকম্প কি তার সিংহাসনকে টলে দেবে!  খুব ঘনিয়ে এসেছে নির্বাচন। এই নির্বাচনে মধ্যম পর্যায়ের ভোটাররা হয়ে উঠবেন বড় ফ্যাক্টর। এরদোগানের সরকার ভূমিকম্পে কীভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে এসব ভোটারের সমর্থন। ফলে এই ভূমিকম্প এরদোগানের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।    

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments