Saturday, July 20, 2024
spot_img
Homeবিচিত্রবৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক বাংলাভাষীদের অবস্থান

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক বাংলাভাষীদের অবস্থান

বিশ্বব্যাপী প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেকোনো অঞ্চলের ভাষা তার আঞ্চলিক পরিচিতির অন্যতম নৃতাত্ত্বিক উপাদান। ভাষাতাত্ত্বিকদের কাছে উপভাষাগুলোর বিশেষ গুরুত্ব আছে। কোনো একটি উপভাষাকে ভিত্তি করে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সাহিত্যিক প্রভাবে সাহিত্যিক ভাষা গড়ে ওঠে।

সাহিত্য সৃষ্টিতে স্থানীয় ভাষাসম্পদ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সাহিত্যে ব্যবহৃত আরবি-ফারসি তথা অন্যান্য বিদেশি শব্দ অপেক্ষা আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দগুলো নানা কারণে ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে অধিকতর মনোযোগ আকর্ষণ করে।  

ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট Ethnologue বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ভাষার মধ্য থেকে সর্বাধিকসংখ্যক কথা বলা ২০০ আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ (২৪তম সংস্করণ)। এটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের মোট ভাষাভাষির প্রায় ৮৮ শতাংশ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশের তিনটি বিশেষ অঞ্চলের ভাষা এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। চট্টগ্রাম (৯৪তম), সিলেট (১০৫তম) ও রংপুর (১১২তম)। এথনোলগের তথ্য মোতাবেক, বিশ্বব্যাপী এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ চাটগাইয়া বুলির ধারক ও বাহক। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বেশির ভাগ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। সিলেটি ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার। সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায় সিলেটির আধিক্য। এক কোটি আট লাখ এক হাজার মানুষ কথা বলে রংপুরি ভাষায়। রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট এবং রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় রংপুরি ভাষার প্রচলন রয়েছে।

১৯০৩ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাক-ভারত উপমহাদেশের ভাষাসম্পর্কিত বিবরণী প্রকাশিত হয়। এগুলো স্থান পায় ‘The Linguistic Survey of India’ নামের গ্রন্থাবলিতে। Sir G A Grierson-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত এই ভাষাবিবরণী এতদঞ্চলের উপভাষাগুলো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আহরণের অন্যতম অবলম্বন। ‘Linguistic Survey of IndiaVol. V, Indo-Aryan Family, Eastern Group Part I Specimens of the Bengali and Assamese Languages’ গ্রন্থে পূর্ববঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের বিভিন্ন উপভাষা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জানা যায়। গ্রিয়ার্সন বাংলা ভাষার উপভাষাগুলোকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যভেদে প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত করেন। প্রাচ্য বিভাগের শাখার মাঝে রয়েছে পূর্বদেশি ও দক্ষিণ-পূর্ব। পূর্বদেশির একটি অংশ হলো সিলেট ও কাছাড় (আসাম)। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব অংশের অন্তর্ভুক্ত হলো চট্টগ্রাম ও আকিয়াব জেলার উত্তরাংশ (মিয়ানমার)। মিয়ানমারের সঙ্গে চট্টগ্রামবাসীর সম্পর্ক অতি সুপ্রাচীন। প্রায় হাজার বছরকাল আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। রংপুরি বা রাজবংশী ভাষা রংপুর, জলপাইগুড়ি (পশ্চিমবঙ্গ), গোয়ালপাড়া (আসাম) ও কোচবিহারে (পশ্চিমবঙ্গ) প্রচলিত।

চাটগাইয়া, সিলেটি বা রংপুরি ভাষা উৎপত্তির ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এগুলো মূলত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের ইন্দো-আর্য শাখার পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্যের উপশাখা বাংলা-অসমীয়র সদস্য। এই তিনটি বিশেষ আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ও বিকাশও লক্ষণীয়। ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত আলাওলের ‘পদ্মাবতী’তে খুঁজে পাওয়া যায় চাটগাইয়া শব্দ : ‘শুক সম্বোধিয়া নৃপ করিল পুছার’ [পুছ (জিজ্ঞাসা করা)]।  

ভাষা গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল ও অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর মতানুযায়ী জটিল ও সংস্কৃতপ্রধান বাংলা বর্ণমালার বিকল্প লিপি হিসেবে ‘ছিলটী নাগরি’ লিপির উদ্ভাবন হয়েছিল খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। বিশ্বদরবারে নন্দিত হয়েছে রংপুরের ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতি। কিশোর পথিক মনের অজান্তেই গেয়ে ওঠে ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই/হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে’।  আমাদের এই সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাষার লেখ্য রূপ অতটা দৃষ্টিগোচর হয় না, যতটা এই উপভাষাগুলো দাবি রাখে। আঞ্চলিক ভাষারূপ সংরক্ষণের ব্যাপক নিয়মরীতি গড়ে তোলা সম্ভব হলে সাহিত্যিক সমাজের ব্যবহারের ফলে তখন এগুলোর সর্বাঞ্চলবোধ্য একটি লেখ্য রূপ গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments