Sunday, December 5, 2021
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামবুদ্ধিজীবীগণ কতটুকু 'রাজনৈতিক', কতটুকু 'অ-রাজনৈতিক'?

বুদ্ধিজীবীগণ কতটুকু ‘রাজনৈতিক’, কতটুকু ‘অ-রাজনৈতিক’?

ড. মাহফুজ পারভেজ

দলীয় বশংবদ লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মতো ‘তকমাআঁটা’দের প্রসঙ্গ বাদ দিলে নিরপেক্ষ লেখক-বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে একটি সূক্ষ্ম বিতর্ক বিশ্বের দেশে দেশে চলমান রয়েছে। তারা কতটুকু ‘রাজনৈতিক’ হবেন বা কতটুকু ‘অ-রাজনৈতিক’ থাকবেন, তা নিয়েও বিরাজমান এন্তার মতান্তর বেশ পুরনো। একদল মনে করেন, ‘শিল্পের জন্যই শিল্প’ হতে হবে। এতে শৈল্পিক নন্দনকলার বাইরে রাজনীতির কোনও স্থান নেই, এটাই তাদের সাফ কথা। আরেক দলের মতে, ‘শিল্প অবশ্যই মানুষের জন্য’ এবং এতে আবশ্যিকভাবেই রাজনীতি থাকবে। দলীয় আজ্ঞাবহ হওয়া যাবে না বটে, তবে নীতিগত-মতাদর্শিক রাজনীতি এড়ানো অকাম্য। বিবদমান দুই পক্ষের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী ইত্যাদি সকল ধরনের সৃজনশীল-মননশীল লোকজনই আছেন এবং ভিন্নমত থাকার পরেও সকলেই একটি বিষয়ে একমত যে, দলীয় আনুগত্যের রাজনীতি করা বুদ্ধিজীবীর জন্য গর্হিত হলেও মানুষের প্রয়োজনে জনস্বার্থের পক্ষে তাদেরকে অবস্থান নিতেই হবে। এতে তথাকথিত নিরপেক্ষতা অথবা অ-রাজনৈতিকতার আদৌ কোনও স্থান নেই। ফলে বিশেষ কোনও দল না করেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, সংঘাত নিরসন, মানবাধিকারের পক্ষে এবং স্বৈরাচার, একদলীয় কর্তৃত্ববাদ, দলন-পীড়নের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীগণ প্রয়োজনে সোচ্চার হয়েছেন। বিশ্বের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবীগণের এমন নৈতিক-মতাদর্শিক অবস্থান তাদেরকে মহীয়ান ও গৌরবান্বিত করেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত হিটলারের জার্মানিতে যেসব বই প্রকাশিত হয়েছিল, তার সবই ছিল অপাঠ্য, জঞ্জাল এবং স্পর্শেরও অযোগ্য দলীয় হুঙ্কার ও স্তুতিবাদে ভরপুর আবর্জনা তুল্য। রক্তের ছিটে আর লজ্জার গন্ধ লেগে আছে তাদের গায়ে।এসব ধ্বংস করে ফেলা উচিত। এমনই বলেছিলেন জার্মান লেখক টমাস মান। তিনি নিজেকে ঘোষণা করেছিলেন অ-রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে। মনে করতেন, লেখক-শিল্পীদের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে থাকার দরকার নেই। বাদ-প্রতিবাদেও তিনি যাবেন না। রাজপথের মিছিলে তার নামা সাজে না।  লেখকরা লেখক মাত্রই। লেখাই তাদের একমাত্র কাজ। আর কিছু নয়। তথাপি তিনি নাৎসিবাদ-ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত চুপ থাকতে পারেন নি। টমাস মান ১৯২৯ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এরপরই তিনি পৌরাণিক চরিত্র জোসেফকে নিয়ে মহাউপন্যাস লেখার জন্য বাইবেল পড়তে শুরু করেন। পুরাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করতে তিনি মিসর ও প্যালেস্টাইন ভ্রমণ করেন।  যখন তিনি মহাউপান্যসটির প্রথম খণ্ড শেষ করে এনেছেন, তখন জার্মানিতে হিটলারের নাৎসিরা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে শুরু করেছে। টমাস মান আর জার্মানিতে ফিরে এলেন না। পাশেই জুরিখে চুপচাপ বসবাস করতে শুরু করলেন। তার ছেলেমেয়েরা ও বড়ভাই টমাস মানকে হিটলারের নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ প্রকাশ করতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি তখন পর্যন্ত  সেটা  করতে রাজি হননি বা কোনও রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন নি। কিন্তু যখন হিটলারের বাহিনী শরণার্থীদের উপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালালো ও গণতন্ত্রের কবর রচনা করে একদলীয় স্বৈরশাহী কায়েম করলো,  তখন তিনি সভ্যতার শত্রুরূপে নাৎসিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিন্দা ও প্রতিবাদ শুরু করলেন। সেটা ছিল ১৯৩৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। তৎক্ষণাৎ জার্মানিতে টমাস মানের রচনাকে হিটলার ‘অ-জার্মান’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করেন ।   টমাস মান যদি সে সময়ে জার্মানিতে থাকতেন, তবে তাকে মেরে ফেলা হত। তিনি সেটা বিলক্ষণ জানতেন। ফলে তিনি তার তথাকথিত নিরপেক্ষ অবস্থান বদলে বিবিসিতে হিটলারের নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রচার করতে শুরু করেন। টমাস মান লিখেছেন, ‘দেশ-বিদেশের ফ্যাসিস্টরা অপপ্রচার চালাবে, শ্লীলতালঙ্ঘন করবে এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে নানাভাবে নিপীড়ন করবে। তবু বিপন্ন শিল্পীরা জানবেন, যেখানেই মানুষের ও জীবনের অসম্মান হয়, সেখানেই শিল্পেরও সমাধি রচিত হয়। অতএব, শিল্পের পক্ষে বলেই মানুষ ও জীবনের পক্ষে দাঁড়ানো লেখক ও শিল্পীর জন্য জরুরি ও আবশ্যক।’ টমাস মানের মতো দৃষ্টান্ত আরও অনেক আছেন। ধ্রুপদী পণ্ডিত সক্রেটিস স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন। ফলে ঐতিহাসিকভাবেই গণতন্ত্রের পক্ষে থেকে স্বৈরতার বিরোধিতার ক্ষেত্রে প্রকৃত লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অ-রাজনৈতিক’ শ্রেণিভেদ থাকে না। দেশপ্রেম ও জনমানুষের স্বার্থে তারা সকলেই একাকার। অগণতান্ত্রিক স্বৈরী একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ঐক্যবদ্ধ, সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট। তখন একটিই মাত্র সীমারেখা থাকে, যার একদিকে গণতান্ত্রিক জনতা, প্রকৃত লেখক-বুদ্ধিজীবীগণ এবং অন্যদিকে স্বৈরতান্ত্রিক একদলীয় শাসন ও তাদের বশংবদ লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মতো দলীয় ‘তকমাআঁটা’গণ। 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments