‘সমগ্র বিশ্বে ইসলামবিদ্বেষ বাড়ছে মহামারির আকারে।’ এ মন্তব্য কোনো মুসলিম নেতার নয়। এ মন্তব্য এমন এক ব্যক্তির যিনি সমগ্র পৃথিবীতে নিরপেক্ষতম ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত। তিনি জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তানিও গুতেরেস। তিনি গত ১৬ মার্চ বুধবার আন্তর্জাতিক ইসলাম-ফোবিয়া ইসলাম-ভীতি মোকাবিলা দিবস উপলক্ষে দেয়া বিবৃতিতে একথা বলেন।
২০১৯ সালের ১৫ মার্চ নিউজল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলায় অন্তত ৫১ জন নিহত ও ৪৯ জন আহত হয়েছিলেন।
সেই দিনটির স্মরণে ১৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক ইসলাম-ফোবিয়া মোকাবিলা দিবস ঘোষণা করা হয়। এ বছরই প্রথমবারের মতো পালিত হয় দিবসটি। এ উপলক্ষে দেয়া বক্তৃতায় গুতেরেস বলেন, মুসলিমবিরোধী ধর্মীয় বিদ্বেষের পুনরুত্থান হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে আমরা যেসব প্রবণতা দেখছি, এসব হচ্ছে তারই নিদর্শন। তার মতে, জাতিগত জাতীয়তাবাদ, নব্য ফ্যাসিবাদ ও উগ্রবাদী বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি সংখ্যালঘু, কিছু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মতো দুর্বল জনগণকেও আক্রমণ করা হচ্ছে। গুতেরেস বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামোয় ঐশ্বর্যের অংশ। তবুও আমরা শুধু বৈষম্যই নয়, সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টাও দেখছি। তিনি বলেন, পবিত্র কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একে অন্যকে জানার জন্যই সব জাতি ও উপজাতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং বৈচিত্র্য হচ্ছে ঐশ্বর্য, এটি কোনো হুমকি নয়।
এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা শুধু মুসলমানদের অধিকার নিয়েই কাজ করে না, বরং সমস্ত মানুষের। তা সে যে সম্প্রদায়ের বা জাতি ও উপজাতির হোক, তাদের অধিকার সম্পর্কে ইসলাম গুরুত্ব দান করে। ইসলামের এই শিক্ষা যদি দুনিয়ার সমস্ত মানুষ গ্রহণ করতো তাহলে আজকের বিশ্বে যেসব সমস্যা নিয়ে মানুষ হয়রান, নিমিষে তার সমাধান হয়ে যেত। ইসলামের এই শাশ্বত সর্বজনীন শিক্ষার প্রতি যথোচিত মূল্য না দেয়াতেই বিশ্বকে আজ নানা সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে।
এখানে একটা কথা বলে রাখতে চাই, যেহেতু বিশ্বস্রষ্টা ও পালনকর্তা একই মহাসত্তা, তাই মানবজাতির প্রকৃত ধর্ম ও প্রকৃত জীবনবিধানও একটিই। পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে এ ভাষায়: ‘ইন্নাদ্দিনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম’। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ইসলামই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম। কোনো মানুষ যদি তা না মানে, তাহলে সে ইচ্ছা করলে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম অনুসরণ না করে অন্য কোনো ধর্ম অবলম্বন করতে পারে। এ ব্যাপারে তাকে কোনো জোর-জবরদস্তি করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘লা ইকরাহা ফিদ্দিন’। অর্থাৎ ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। এবার আমরা যে প্রসঙ্গ নিয়ে আজকের এ লেখা শুরু করেছিলাম সে ব্যাপারে ফিরে যাচ্ছি। ইসলাম যে মহান স্রষ্টার মনোনীত ধর্ম, তা জেনেও যারা তার বিরোধিতা করে এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং তাদের বাস্তব কাজকর্মে সেই বিদ্বেষ চালিয়ে যায়, তারা তো মহাস্রষ্টার মূল বিধানেরই বিরোধিতা করে সচেতনভাবে। তাদের এ পার্থিব জীবনে যা ইচ্ছা করতে দেয়া হলেও পরকালের জীবনে তাদের যে শাস্তি পাওয়ার কথা, তা থেকে কেউ তাদের রক্ষা করতে পারবে না। এখানে একটা কথা বলে রাখা উচিত যে, মানুষকে আল্লাহতায়ালা পার্থিব জীবনে যা ইচ্ছা করার আপাত স্বাধীনতা দিলেও পরকালে আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানের স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে পুরস্কার বা শাস্তি পেতে হবে।
এজন্য ইসলামের দৃষ্টিতে পরকালের জীবনে পার্থিব জীবনের আমাদের বাস্তব কাজকর্মের পরিণতি হিসাবে পুরস্কার বা শাস্তি ভোগ করতে হবে। এই যে মানুষের জীবনের দুই ভাগ, পার্থিব জীবন ও পরকালীন জীবন, এর পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য আমাদের বুঝতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আমরা মানব জাতির সৃষ্টির পটভূমি এখানে আলোচনায় আনতে পারি। মানব জাতি সৃষ্টির প্রাক্কালে আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের ডেকে বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে চাই। তখন ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি যাদের সৃষ্টি করতে চান তারা যদি আপনার অবাধ্যতা করে, তাহলে কী হবে? ফেরেশতাদের এ প্রশ্নের পটভূমি সম্পর্কে বলতে হয় যে, মানুষ সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছিলেন। তাদের অনেকে যেমন আল্লাহর বাধ্য ছিল, অনেকে আবার অবাধ্যও ছিল। এই অবাধ্য একজনের নাম ইবলিস। এরপর আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেন প্রথম মানুষকে, যাঁর নাম ছিল আদম। তার সঙ্গিনীর নাম ছিল বিবি হাওয়া।
আল্লাহতায়ালা তাদের সৃষ্টি করে একটি বৃক্ষ সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দেন, ঐ বৃক্ষের ফল যেন ভক্ষণ না করে। ভক্ষণ করলে তারা বিভ্রান্তিতে পতিত হবে। ইবলিস আদমকে ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণের জন্য এই বলে কুমন্ত্রণা দেয় যে, ঐ ফল ভক্ষণ করলে সে চিরজীবী হবে। আদম ইবলিসের কথায় প্ররোচিত হয়ে ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে। কিন্তু নির্দেশ অমান্য করায় তার ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসে। আল্লাহ তাঁর নির্দেশ অমান্য করায় শাস্তি দিলে আদম ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।
এরপর তিনি আদমকে দুনিয়াতে নেমে যেতে হুকুম দিলেন। তিনি দুনিয়াতে প্রথম মানুষ এবং প্রথম নবীও। এভাবে নবুওতের যে ধারা শুরু হলো তার সর্বশেষ নবী হিসাবে পাঠানো হলো হযরত মুহম্মদ (সা.)-কে।
তিনি আমাদের নবী। আদম (আ.) থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত অসংখ্য নবী পাঠিয়েছেন আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৎপথ প্রদর্শনের লক্ষ্যে।
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন হযরত শীস (আ.), হযরত নূহ (আ.), হযরত ইবরাহিম (আ.), হযরত ইসমাঈল (আ.), হযরত ইয়াহিয়া (আ.) প্রমুখ। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না। কারণ তাঁর সময়েই মানবজাতি পূর্ণতা লাভ করে। এর পর আর নবীর প্রয়োজন হবে না।
আমরা আগেই জেনেছি, মানুষের জন্য আল্লাহর প্রেরিত ধর্মের নাম ইসলাম। আল্লাহর নিকট থেকে আসা আল্লাহর বাণীর সর্বশেষ সংগ্রহ পবিত্র আল কোরআন। এর পর কোনো নবী আসবেন না, ধর্মগ্রন্থও আসবে না। আগের কোনো ধর্মগ্রন্থ আর গ্রহণযোগ্য বা অনুসরণযোগ্য নেই।
আমরা যারা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত, তাদের সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আগের ধর্ম অনুসরণযোগ্য নেই, (দুই) ওই সব ধর্মের অনুসারীরা অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন করেছেন নিজেদের মনমতো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে বর্তমানে কেবলমাত্র শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কাছে আসা আল কোরআনই অপরিবর্তিত রয়েছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা স্বয়ং বলেছেন: ‘আমি পবিত্র কোরআন নাজিল করেছি এবং তার মূল বাণী সংরক্ষণ করেছি।’
পরিশেষে, আমরা আর অল্প কিছু কথা বলেই আমাদের আজকের এ লেখা শেষ করব। আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন যেহেতু অপরিবর্তিত রয়েছে, সুতরাং আমাদের উচিত ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে আমাদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করতে আন্তরিক চেষ্টা চালানো।
তা না করে আমরা যদি নিজের খেয়ালখুশি অনুসারে চলতে চেষ্টা করি, তা যেমন বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বপালক আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনি তার দ্বারা আল্লাহর সৃষ্ট দুই জগতে কাক্সিক্ষত শান্তিও আসবে না।
মহামারির আকারে ইসলামবিদ্বেষ বাড়ছে বলে জাতিসংঘের মহাসচিব আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। তার এ সময়োচিত হুঁশিয়ারির জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে এই লেখা এখানেই শেষ করছি এবং দুনিয়ার মুসলমানদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি যে, তারা যেন ইসলামের বাণী সঠিকভাবে মেনে নিয়ে সে মোতাবেক তাদের জীবন গড়ে তুলতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English