অনেকেই বলে থাকেন মুখ শুকিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি পানের পরও এই সমস্যা অনেকের দেখা দেয়। অনেকে এটি ডায়াবেটিসের লক্ষণ বলে ধরে নেন।  ডায়াবেটিসের চেয়েও বড় সমস্যার কারণে এমনটি হতে পারে। তাই মুখ শুষ্ক হয়ে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ার কোনো কারণ নেই। এই সমস্যা দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখতে মারাত্মক বিপদও হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমোনের তারতম্যের কারণে মুখে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড হরমোন বেশি হওয়ার কারণে বার্নিং মাউথ সিনড্রোম অর্থাৎ মুখে জ্বালাপোড়া হতে পারে। যাদের থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ কম থাকে তাদের ক্ষত বা আলসার দেরিতে শুকায়। 

হাইপোথাইরয়ডিজমে রোগীরা জিহ্বার মেটালিক স্বাদ পেতে পারে। মাঝে মাঝে হাইপোথাইরয়ডিজমে জগ্রেন্স সিনড্রোম দেখা দিয়ে থাকে, যার কারণে শুষ্ক মুখের সৃষ্টি হয়ে থাকে। 

মুখ শুকিয়ে থাকার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে যুগান্তরকে পরামর্শ দিয়েছেন মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ফারুক হোসেন।

শুষ্ক মুখের প্রভাবে দন্তক্ষয়ের পরিমাণ বেড়ে যায়। হাইপোথাইরয়ডিজমে প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে ম্যাক্রোগ্লসিয়া বা জিহ্বা বড় হতে পারে। ঠোঁট বড় হয়ে যেতে পারে। এটি হতে পারে পানি এবং প্রোটিন জমা হওয়ার কারণে। ম্যান্ডিবল আন্ডার ডেভেলপড্ বা সঠিকভাবে গঠন হয় না অথবা পুরোপুরি গঠন হয় না। তাছাড়া পেরিওডন্টাল রোগের ঝুঁকি থাকে। 

থাইরয়েড হরমোন কম বা বেশি হলে পেরিওডন্টাল রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হাইপারথাইরয়ডিজমে পেরিওডন্টাল রোগ, ম্যাক্সিলারি বা ম্যান্ডিবুলার অস্টিওপরোসিস এবং দাঁত তাড়াতাড়ি ওঠে। 

হাইপোথাইরয়ডিজমের রোগীদের ঘা বা ক্ষত যেহেতু দেরিতে শুকায় সে কারণে অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই দাঁত তোলা অথবা সার্জারির সময় সতর্ক থাকতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেসটেরন হরমোন বেশি নিঃসরণ হওয়ার কারণে মাড়ি রোগ দেখা দিতে পারে।  দাঁতে পাথর থাকলে স্কেলিং করিয়ে নিতে হবে।  জিনজাইভাল হাইপারপ্লাসিয়া হতে পারে। মনে রাখতে হবে কিছু ওষুধের কারণেও জিনজাইভাল হাইপারপ্লাসিয়া হতে পারে। মাসিকের সময় প্রজেসটেরন হরমোন বেশি হওয়ার কারণে মাড়িতে আলসারসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে তেমন কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নাই। 

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস ইস্ট্রোজেন লেভেল দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে বমি বমি ভাব হতে পারে। এ সময় গর্ভবতীর মুখের অধিকতর যত্ন নিতে হবে। শুধু ইস্ট্রোজেন নয় বরং প্রজেসটেরন লেভেলও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। দুটি হরমোন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মাড়িতে রক্ত সঞ্চালনও বেশি হয়। সে কারণে মাড়ি অধিকতর সংবেদনশীল হয়ে থাকে। মাড়ি ফুলে যেতে পারে। এ সময় জেল জাতীয় টুথপেস্ট ব্যবহার করবেন না। 

গর্ভাবস্থায় তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে মুখ ও দাঁতের চিকিৎসা করে নিতে হবে। জরুরি চিকিৎসা যে কোনো সময় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী করবেন।  মেনোপজ অর্থাৎ মাসিক যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন হরমোনের তারতম্যের কারণে বার্নিং মাউথ সিনড্রোম বা মুখের জ্বালাপোড়া দেখা দিতে পারে। 

হরমোনের তারতম্যের কারণে অনেক সময় মেয়েদের মেজাজ খিটখিটে থাকে। তাই মুখের কোনো সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই মুখের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। মেনোপজের সময় বা মেনোপজ পরবর্তীকালে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে মুখে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। তাই এসব বিষয়ে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। 
মেনোপজ পরবর্তীকালে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। মেনোপজের সময় হরমোনের তারতম্যের কারণে শুষ্ক মুখ হতে পারে। শুষ্ক মুখের কারণে মুখে তেতো স্বাদ হতে পারে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করলে শুষ্ক মুখ হতে পারে। মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হতে পারে। 

মনে রাখতে হবে অন্যান্য অনেক কারণে একই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেসটেরন হরমোন মাড়িতে রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি করে। মাড়ি ফুলে যেতে পারে। মাড়ি থেকে রক্তপাত হতে পারে। মাড়ি রোগসহ মাড়ি এবং দাঁত অধিক সংবেদনশীল হতে পারে। এ বিষয়গুলো অবশ্যই চিকিৎসার সময় গুরুত্ব দিতে হবে। মেয়েদের মধ্যে যারা নিয়মিত জন্ম নিরোধক ওষুধ বা পিল সেবন করেন তাদের ক্ষেত্রে মাড়ি রোগ দেখা দিতে পারে। 

দাঁত তোলার পর ড্রাই সকেট বা অ্যালভিওলার অস্টাইটিস দেখা দিতে পারে। যারা নিয়মিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করেন তাদের ক্ষেত্রে মাসিকের শেষ সপ্তাহে ২৩-২৮ দিনের মধ্যে দাঁত তোলা ভালো। কারণ এ সময় ইস্ট্রোজেন লেভেল কম থাকে, অথবা কার্যকর থাকে না। ইস্ট্রোজেন প্রণোদনা দেয় ফিব্রিনোলাইসিসের ক্ষেত্রে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধা প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া ইস্ট্রোজেন ক্ষতস্থান শুকানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। শরীরে স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য গ্রোথ হরমোন আবশ্যক। কিন্তু যখন কোনো কারণে মাত্রাতিরিক্ত গ্রোথ হরমোন নিঃসরিত হয় তখন মানবদেহের নিচের চোয়াল বা ম্যান্ডিবল বড় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁত ফাঁকা হয়ে যায়। 

উপরের দাঁত এবং নিচের দাঁতের স্বাভাবিক রিলেশন নষ্ট হয়ে যায় বলে এ অবস্থায় দাঁতের চিকিৎসা করতে হলে আগে চোয়াল ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ অর্থোগন্যাথিক সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। অতএব বুঝতেই পারছেন একটি হরমোন বেশি নিঃসরণ হওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। 

ক্রমাগত দুশ্চিন্তা করলে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল নিঃসরিত হয়ে থাকে। এ  ধরনের রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর ওষুধের ইতিহাসসহ পূর্ণ ইতিহাস গ্রহণ করতে হবে। সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করার পরেই রোগীর মুখের চিকিৎসা প্রয়োজন হলে করতে হবে। অক্সিটোসিন হরমোন বা লাভ হরমোন মুখের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে থাকে। অতিরিক্ত মানসিক চাপে দাঁত কামড়ানো, ক্যানকার সোর বা ক্ষত, মাড়ি রোগ এবং টেম্পেরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টের অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে। 

এডরেনালিন হার্ট রেট বৃদ্ধি করে, রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। দাঁতের চিকিৎসার সময় রোগী অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করলে চিকিৎসা শুরু করার আধা ঘণ্টা আগে ট্রাংকুলাইজার জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীর আগের ইতিহাস অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। হরমোন শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। 

আবার হরমোনের কম-বেশি হওয়ার কারণে আমাদের শরীরে এবং মুখে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই হরমোন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English