Sunday, December 5, 2021
spot_img
Homeধর্মবান্দার হক তাওবা কবুলের অন্তরায়

বান্দার হক তাওবা কবুলের অন্তরায়

মানুষ যেসব পাপ করে তার মধ্যে এমন কিছু গুনাহ আছে, যা দ্বারা শুধু আল্লাহর হক নষ্ট হয়। কোনো মানুষ তা দ্বারা কোনো কষ্ট পায়নি। আর কিছু গুনাহ এমন আছে, যার দ্বারা অন্য কোনো একজন মানুষ বা বহু মানুষ কষ্ট পেয়েছে। প্রথম প্রকারের হককে ‘হক্কুল্লাহ’ বা আল্লাহর হক বলে। আর দ্বিতীয় প্রকারের হককে ‘হক্কুল ইবাদ’ বা বান্দার হক বলে।

আল্লাহর হকের মধ্যে কিছু হক এমন যার যেগুলোর ‘কাজা’ করা বা কাফফারা দেওয়া সম্ভব। যেমন—নামাজ বা রোজা ছুটে গেলে সেগুলোর ‘কাজা’ করা ওয়াজিব। বা বিগত দিনে জাকাত না দিয়ে থাকলে তা এখন দেওয়া আবশ্যক। এভাবে হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও হজ না করে থাকলে এখন হজ করতে হবে। শপথ করে তা ভঙ্গ করলে তার কাফফারা প্রদান না করে থাকলে, তা প্রদান করা আবশ্যক।

আল্লাহর হকের দ্বিতীয় প্রকার এমন যেগুলোর শরিয়তে কোনো কাফফারা নির্ধারিত নেই। যেমন—মিথ্যা বলা বা কুপ্রবৃত্তির শিকার হয়ে শরিয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি। এই দ্বিতীয় প্রকারের গুনাহর তাওবা শুধু এই যে কান্নাকাটি করে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের গুনাহর ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং সব সময় ইস্তিগফার করবে। আর আল্লাহর প্রথম প্রকারের হক—যেগুলোর কাজা বা কাফফারার বিধান শরিয়তে আছে, সেগুলো কাজা বা কাফফারার মাধ্যমে পরিশোধ করা আবশ্যক। যেমন—ভালোভাবে চিন্তা করে বের করা সারা জীবন কত নামাজ ও রোজা ছুটে গেছে। যদি ছুটে যাওয়া নামাজের পরিমাণ বেশি হয়, তবে ধীরে ধীরে তা আদায় করে নেবে। যত দিন না তা আদায় করা শেষ হয়। এভাবে অতীতের সম্পদের জাকাত না দিয়ে থাকলে অনুমানের ভিত্তিতে হিসাব করে জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করে তা আদায় করতে থাকবে। একইভাবে সকদায়ে ফিতর বা কোরবানি ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো না দিয়ে থাকলে এখন তা দেওয়া ও কোরবানির মূল্য দান করা আবশ্যক। কেউ রোজা রেখে স্বেচ্ছায় ভেঙে ফেললে তার কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব। এভাবে আল্লাহর হকগুলোর মধ্য থেকে যেসব হকের ‘কাজা’ করা সম্ভব, সেগুলোর কাজা করবে এবং যেগুলোর ‘কাফফারা’ দেওয়া সম্ভব, সেগুলোর ‘কাফফারা’ আদায় করবে। এ ধরনের ছুটে যাওয়া সব ইবাদতের কাজা ও কাফফারা থেকে মুক্ত না হলে নিছক মৌখিক তাওবা মোটেই যথেষ্ট নয়।

দ্বিতীয় প্রকারের হক হলো বান্দার হক। বান্দার হকও দুই প্রকার। প্রথম প্রকার আর্থিক হক। যেমন—কেউ কারো কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তা আর পরিশোধ করেনি। বা কোনো চুক্তি বা লেনদেনের কারণে কারো কোনো অর্থসম্পদ তার দায়িত্বে ছিল, যা সে পরিশোধ করেনি। বা কারো সম্পদ অবৈধভাবে ছিনিয়ে নিয়েছে, আত্মসাৎ করেছে বা কারো থেকে ঘুষ নিয়েছে। এজাতীয় সব হকের তালিকা তৈরি করে সব পরিশোধ করবে। একসঙ্গে সব পরিশোধ করতে আরম্ভ করবে। এসব হকের পাওনাদার যারা, তারা জীবিত থাকলে এবং তাদের ঠিকানা জানা থাকলে এগুলো পরিশোধ করা সহজ। তারা মারা গেলে তাদের ওয়ারিশদের খুঁজে তাদের অধিকার আদায় করতে হবে। খোঁজ করা সত্ত্বেও তাদের ঠিকানা জানা না গেলে তাদের প্রাপ্য পরিমাণ অর্থ তাদের তরফ থেকে দান করে দেবে।

বান্দার হকের দ্বিতীয় প্রকার শারীরিক হক। যেমন—কাউকে হাত বা জিহ্বা দ্বারা শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া কষ্ট দেওয়া, কাউকে গালি দেওয়া, পরনিন্দা করা ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে বান্দার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া জরুরি। কাউকে মারপিট করে থাকলে তাকে বদলা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বলতে হবে তোমার ইচ্ছা, আমাকে মেরে প্রতিশোধ নিতে পারো বা মাফও করে দিতে পারো। উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে বান্দার যাবতীয় আর্থিক ও শারীরিক হক থেকে মুক্তি লাভ না করা পর্যন্ত পরিপূর্ণ হতে পারে না। তাওবা পরিপূর্ণ হওয়া ছাড়া নফল ইবাদত ও জিকির-আজকারের মধ্যে জীবনভর যতই মেহনত করুক না কেন, কখনোই তা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না এবং সঠিক পথও লাভ হবে না। মোটকথা আল্লাহ ও বান্দার পরিশোধযোগ্য সব হক ও অধিকার আদায় করা বা মাফ করানো তাওবা কবুলের জন্য জরুরি। বিশেষত বান্দার অধিকার আদায় করা বা পাওনাদার মাফ না করা পর্যন্ত কোনোভাবেই মাফ হতে পারে না।

‘কাসদুস-সাবিল’ থেকে

মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments