Monday, October 3, 2022
spot_img
Homeসাহিত্যবাঙলা মূকাভিনয়

বাঙলা মূকাভিনয়

বাঙালির ইতিহাস, হাজার বছরের ইতিহাস। বাঙলা একটি জাতির সত্তা। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই বাঙালি জাতির স্বাধীন সত্তা হিসেবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

স্বাধীন বাংলাদেশের যে চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে— ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। 

এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রাচীনকাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাসরত বাঙালি জাতি তথা বাংলা ভাষাগত অঞ্চলের অধিবাসীদের বোঝানো হয়েছে। যা ব্রিটিশ চক্রান্তে অবিভক্ত বাংলাকে বিভক্ত করে। প্রাচীন বঙ্গদেশ, অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বসবাসকারী মানব সম্প্রদায়ের একতাবদ্ধ পরিচয়কে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলা হয়। যাদের ইতিহাস অন্তত চার হাজার বছর পুরান এবং এদের মাতৃভাষা বাংলা। 

অতএব বাঙালির জাতীয়তাবাদ— বাংলার ইতিহাস এবং সেসব মানুষের ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এ সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনযাত্রাই বাঙালিপনা, বাঙলার অথবা বাঙালির কর্মকাণ্ড। 

১৯৭১ সালে বাংলার কিছু অংশ মিলে নতুন একটি স্বাধীন বাংলার দেশ গঠিত হয়েছে। যার নাম বাংলাদেশ (একটি জাতি থেকে একটি রাজ্য বা দেশে পরিণত হয়েছে)। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার ফলে বাঙলার ওপর ধর্মীয় প্রভাবে প্রভাবিত হয়, যা ভারতের অধিরাজ্যের বাংলায় হিন্দুধর্মীয় প্রভাব পড়ে এবং পাকিস্তান অধিরাজ্যের পূর্বপাকিস্তান রূপে আবির্ভূত বাংলায় (বর্তমানের বাংলাদেশ রাষ্ট্র) ইসলাম ধর্মের প্রভাব বিরাজমান। সে ক্ষেত্রে বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্মীয় প্রভাব ভৌগোলিকতায় সাংস্কৃতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। 

মূল কথা হলো— বাঙালির জাতীয়তাবাদ বলতে বাঙালির নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, বুদ্ধিবৃত্তি তথা নিজস্ব জাতিসত্তাকে বোঝায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের আত্মপরিচয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করায় এবং মানসিক ধারণা থেকে অনুভূতি মূলক প্রেরণার তাগিদ সৃষ্টি করে। 

সময়ের পালাবদলে নাট্য, নৃত্য, সংগীতের মতো এখন প্রশ্ন উঠেছে— মূকাভিনয়ের ক্ষেত্রেও। বাঙালি জাতি হিসেবে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে মূকাভিনয়ে আমাদের নিজস্বতা রয়েছে কিনা? অথবা কেমন হওয়া উচিত আমাদের মূকাভিনয়? 

আমি বলি অবশ্যই নিজস্বতা রয়েছে। কারণ বাঙালি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। হাজার বছরের মানুষের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এ অঞ্চলের সংস্কৃতি। যেমনভাবে গড়ে উঠেছে ফরাসি, ব্রিটিশ, চাইনিজ, জাপানিস সংস্কৃতি। 

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মূকাভিনয় শিল্প মাধ্যম ছিল সম্পূর্ণ নতুন। মূলত এই চর্চার বাস্তব যাত্রা শুরু হয় সত্তর দশকের দিকে। বঙ্গবন্ধুর বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় নিজস্ব সংস্কৃতিতে মূকাভিনয়কে ‘বাঙালি মূকাভিনয়ের স্বরূপ বা স্বতন্ত্র সক্রিয়তা’ দিয়ে নির্মাণ করার প্রচেষ্টা শুরু করেছিলাম, যা হবে শুধুই আমাদের অর্থাৎ বাঙালি জাতির মূকাভিনয়ের ব্র্যান্ডিং। আন্তর্জাতিকভাবে তা হবে ব্রিজিং ও সর্বোপরি হয়ে উঠবে ব্র্যাডিং। আমি তখন প্রথম উত্তর আমেরিকা মাইম ফেস্টিবলের (১৯৮৩) প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করি। তখন আমার স্কেচ ছিল ‘বাঙলার রমণী’ (বেঙ্গল লেডি)। সেটি তৈরি করেছিলাম নিজস্ব ডিজাইনের ড্রেস দিয়ে। এর পর সেই প্রদর্শনী হয় কানাডার ভ্যাংকুভারে ওয়াল্ড এক্সপোতে। ওই প্রদর্শনীতে ইন্টারন্যাশনাল মাইম অ্যাম্বাসেডর অব বাংলাদেশ উপধিতে আমাকে সম্মানিত করা হয়। সময়টা ছিল ১৯৮৬ সালের দিকে।  

দেশে এখন মূকাভিনয়ের চর্চা খুবই আশাব্যঞ্জকভাবে শুরু হয়েছে। ছিন্ন ছিন্নভাবে থাকা শিল্পীরা একত্রিত হচ্ছেন বিভিন্ন প্লাটফরমে। একতাবদ্ধ হয়ে কিছু করার চেষ্টা করছেন তারা। এ কাজে তাদের সাধুবাদ জানাই। তাদের বিভিন্ন প্রদর্শনী দেখে এবং আলোচনা শুনে মনে হলো— আমাদের মূকাভিনয়ের একটা নিজস্বতা থাকা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কিছু করা জরুরি। নতুনদের জন্য যা হবে দিকনিদর্শনা ও পথের সন্ধান। 

‘বাঙালি মূকাভিনয় বা বেঙ্গল মাইম’ সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই আমার এ লেখা। 

আমরা সবাই জানি— ‘মূকাভিনয় একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম’, যা নির্মিত হয়েছে নৃত্যশিল্প ও নাট্যশিল্পের বর্ডার লাইনের অবয়বে। মনের ভাব দৈহিক ভাষায় ছন্দময়তা ও অভিনয়ের আলোকে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যম এটি। সেখানে না থাকবে নৃত্যের, না থাকবে নাট্যের ধারা। থাকবে শুধু মূকাভিনয়ের নিজস্ব ধারা। 

মূকাভিনয়ের রয়েছে নিজস্ব ফর্ম, স্টাইল ও টেকনিক, যা চিরন্তন বা ইউনিভার্সেল। কিন্তু স্থান, কাল পাত্রভেদে জীবনযাত্রা ভিন্নতর দেখা যায়। আমাদের চাল-বলন, বসন, চলন ইত্যাদির জীবন প্রণালি বা জীবনযাত্রা অন্য জাতি থেকে আলাদা। পোশাক-পরিচ্ছদে, রীতিনীতিতে, চলন-বলনে, খাওয়া-দাওয়ায় ইউরোপিয়ান অথবা চাইনিজ বা জাপানিজ থেকে ভিন্নতর। এই ভিন্নতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্টাইলের পরিবর্তন রয়েছে। নতুন নতুন টেকনিকের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ফর্মের ক্ষেত্রে সবই সমান। অনুভূতির প্রকাশ সর্বকালে সবার মাঝে সমান। দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ, উচ্ছ্বাস ইত্যাদির বহির্প্রকাশ সব জাতির কাছেই এক রকম। মানুষের অনুভূতি প্রকাশে ভিন্ন জাতির কাছে কোনো পার্থক্য নেই। 

আমরা বলে থাকি ফরাসি মাইম,  ব্রিটিশ মাইম, আমেরিকান মাইম ইত্যাদি। এমনটি বলার কারণ— এগুলো সব জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা জীবনযাত্রার প্ররিস্ফুটন। যেহেতু বাঙালি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, তাই আমাদেরও একটি ভিন্ন দর্শন থাকা জরুরি। গ্রাম-বাংলার জীবনযাত্রা আবহমান কালের। বাঙালির মূকাভিনয়ে এর চিত্র তুলে ধরতে পারলেই অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। 

সময় এসেছে বাঙালি মূকাভিনয়কে সুস্পস্টভাবে দাঁড় করানোর। এটি করতেই হবে। আমাদের নির্ণয় করতে হবে ‘বাংলার মূকাভিনয় দর্শন’। 

আমি দেখেছি আমাদের তরুণ শিল্পীদের অনেকেই ভিনদেশিদের ধারায় আক্রান্ত। এর কারণ যদিও আমরা। আমরা এত বছরেও নিজেদের ধারা তৈরি করতে পরিনি। তাই এই বাংলায় পাশ্চাত্যের ছোঁয়া লাগার পূর্বে বাঙালি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধারায় ফিরে আসতে হবে। যে সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠার গল্প আছে, জীবনযাত্রার ছবি আছে তার আলোকেই আমাদের মূকাভিনয় ধরণ নির্ণয় করতে হবে। ওটাই হবে বাঙলা মূকাভিনয়ের বৈশিষ্ট্য, ঐহিত্য ও স্বরূপ। 

এ ক্ষেত্রে শহরকে বেছে নিলে চলবে না। আমাদের গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রাই আমাদের সংস্কৃতি। ভাষা, রাজনৈতিক, সামাজিকতা, কৃষ্টিতে বাঙালিআনা থাকতে হবে। চলন-বলন, কথন সব ক্ষেত্রেই এসব উপকরণ অবলম্বন করে মূকাভিনয় ফর্মে, স্টাইলে এবং টেকনিকে আমাদের জীবন প্রণালি ফুটিয়ে তুলতে হবে, যা হবে বাঙালির মূকাভিনয়। যাকে আমরা বলব— ‘বাঙলার মূকাভিনয় বা বেঙ্গলি মাইম’। 

আমি বাঙালি মূকাভিনয়ের ওপর সিরিজ ভিডিও নির্মাণের পরিকল্পনা করছি। যাতে হাতে-কলমে চর্চার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে আশা রাখি। 
মূকাভিনয়ের প্রধান উপাদান হলো দেহ এবং মনকেন্দ্র করে। ফর্ম, স্টাইল ও টেকনিকের ব্যবহার হয় দেহের মাধ্যমে এবং মনের দ্বারা। দেহের ভাব ভঙিমার মাধ্যমে প্রকাশ পায় গল্প, স্কেচ ও বিষয়বস্তু। চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটে উপস্থাপনার মাধ্যমে। জাতীয়তাবাদের তত্ত্বের উপায়ও আসে চিন্তাধারার মাধ্যমে। আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা অভিজ্ঞতার আলোকে ফুটিয়ে তুলতে পারলেই প্রকাশ পাবে বাঙালির মাইম। যেমন- আমার দেশের মাছ ধরার কৌশল, মাঝিমাল্লাদের দাঁড়টানার চিত্র, কৃষক, কৃষি ও প্রকৃতি, গ্রামীণ নারীর চালচিত্রই আমাদের সম্পদ, যা অন্য জাতির থেকে আলাদা ও ভিন্নতর। সেগুলোই হবে আমাদের মূকাভিনয়ের অবলম্বন। 
লেখক: মাইম গবেষক ও ইন্টারন্যাশনাল মাইম অ্যাম্বাসেডর অব বাংলাদেশ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments