Monday, May 20, 2024
spot_img
Homeজাতীয়বাঁধে বন্দী ১৮ নদীর ১২টি

বাঁধে বন্দী ১৮ নদীর ১২টি

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যথেচ্ছ অপকৌশলে ভারতের পানি আগ্রাসন

ভাটির দেশ বাংলাদেশ। হাজারেরও বেশি (নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যনুযায়ী নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮টি) নদ-নদী, উপনদী ও শাখানদী বাংলাদেশের উপর দিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। মিলিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। এর জন্য বলা হয় ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’। তাছাড়া পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ এই দেশ। ১ হাজার ৮টি নদ-নদীর মধ্যে প্রধান ৫৪টি অভিন্ন তথা আন্তর্জাতিক নদ-নদী। যেগুলো মূলত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত। ‘ভাটির দেশ’, ‘ব-দ্বীপ’ এবং ‘নদীমাতৃক দেশ’ হিসেবে ভৌগোলিক ও ভূ-প্রকৃতিগতভাবেই লাভবান এবং নদ-নদীতে সুসমৃদ্ধ থাকার কথা বাংলাদেশের। অথচ ভারতের একতরফা ও যথেচ্ছ অপকৌশলে পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশ চরম ক্ষতিগ্রস্ত এবং স্বার্থহানির শিকার। ভারত উজানের দেশ। আন্তর্জাতিক আইন-বিধি ও কনভেনশন অনুযায়ী ভারত ভাটির দেশের অভিমুখী অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর পানিকে আটকে রেখে অথবা বাঁধ-ব্যারাজ খুলে পানি ছেড়ে দিয়ে পানিসম্পদ একচ্ছত্র কব্জায় নিতে পারেনা। অথচ ভারত তাই করছে। তিব্বত ও হিমালয় পর্বতমালার ভাটির দেশ বাংলাদেশমুখী অভিন্ন বা আন্তর্জাতিক নদ-নদী, উপনদীতে বাঁধ, ব্যারাজ, পানিবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প, ক্যানেল, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, জলাধার (রিজার্ভার), গ্রোয়েন নির্মাণসহ আরও নানাবিধ উপায়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে যথেচ্ছভাবে ভারত নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মাধ্যমে ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশমুখী পানি প্রবাহকে আটকে দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। যা এক কথায় ভারতের পানি আগ্রাসন। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন-বিধি-কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এমনটি মনে করেন পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞগণ।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশমুখী নদ-নদী, উপনদীগুলোতে ভারত ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বাঁধ, ব্যারাজ, পানিবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প, ক্যানেল, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, জলাধার (রিজার্ভার) ইত্যাদি নির্মাণ করেছে। ১৯৯০ সাল থেকে এ যাবত আরও কমপক্ষে ৭শ’ এ ধরনের পানি-প্রতিবন্ধক দিয়েছে ভারত। সব মিলিয়ে ৪ হাজারেরও বেশি পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। যার বেশিরভাগই ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন তথা আন্তর্জাতিক নদ-নদী, উপনদীগুলোতে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অভিমুখী পানির প্রাকৃতিক স্রোতধারাকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত।

এর অনিবার্য পরিণতিতে বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে ভারত তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়ার কারণে ডুবে মরছে বাংলাদেশের মানুষ। আর শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে হাহাকার করছে। দ্রুত মরুময় অবস্থার দিকে যাচ্ছে দেশ। এককালের খরস্রোতা নদ-নদী, শাখানদীগুলো পরিণত হচ্ছে একেকটি মরা খালে। বাংলাদেশের কৃষি-খামার, আবহাওয়া, পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতি, মৎস্যসম্পদ, জনস্বাস্থ্যসহ জনগণের জীবনধারণের প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়ছে তার মারাত্মক বিরূপ প্রভাব। জীবিকা হারিয়ে মানুষ রাজধানী ঢাকা শহর ও অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছে। ভারতের পানি আগ্রাসনের কারণে নদীতীরের অসংখ্য মানুষ বসতহারা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের অভিন্ন এবং আন্তর্জাতিক অন্যতম প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্রের আরও উৎসমূলে রয়েছে চীনের তিব্বত। বিশে^র অন্যতম বৃহৎ ও সুদীর্ঘ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা। পানি ধারণ ও প্রবাহের সক্ষমতার দিক বিবেচনায় ব্রহ্মপুত্র নদ বিশে^র নবম বৃহত্তম এবং ১৫তম দীর্ঘতম। ব্রহ্মপুত্র নদের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৯শ’৭০ কিলোমিটার, গভীরতা ৩০ মিটার, প্রস্থ স্থানভেদে ১০ হাজার ৪২৬ মিটার থেকে ৪৫০ মিটার। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় উজান-ভাটি মিলিয়ে ৬ লাখ ৫১ হাজার ৩৩৪ বর্গ কিলোমিটারব্যাপী বিশাল আয়তনের। বাংলাদেশের অংশে ব্রহ্মপুত্র নদের আয়তন ৪৪ হাজার ৩০ বর্গ কি.মি.।

উজানের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারত শুধুই পদ্মা নদীর উজানে গঙ্গায় ‘মরণ ফাঁদÑ ফারাক্কা বাঁধ’ই নয়; ফারাক্কার স্টাইলে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানভাগেও পানি আগ্রাসন করছে। বিশাল এই অববাহিকায় ব্রহ্মপুত্রের সমান্তরালে এবং অভিন্ন স্রোতধারায় প্রবাহিত হচ্ছে আরও ১৮টি নদী, উপনদী। প্রাকৃতিক প্রবাহের টুটি চেপে ধরে ভারত ব্রহ্মপুত্রের অভিন্ন অববাহিকায় প্রবাহিত বাংলাদেশমুখী কমপক্ষে ১২টি নদীতেই বাঁধ, ব্যারাজ, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, ক্যানেল, সেচপ্রকল্প, জলাধার (রিজার্ভার), গ্রোয়েন নির্মাণসহ বিভিন্ন অপকৌশলে পানি নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যাহার করে পানিসম্পদে আগ্রাসন চালাচ্ছে। বাঁধে বন্দী করা হয়েছে ১৮টি নদীর মধ্যে ১২টিকেই। ব্রহ্মপুত্রের উজান অববাহিকায় ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার বাংলাদেশমুখী এসব নদী উপনদীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ব্রহ্মপুত্র নদ, দুধকুমার, তিস্তা, ধরলা, দেওনাই যমুনেশ^রী, বুড়ি তিস্তা, ঘোরামারা, তালমা, করতোয়া, মহানন্দা, পুনর্ভবা ও জিনজিরাম।

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা বা রিভার সিস্টেমে উজানে ১২টি নদ-নদী, উপনদীর উপর বাঁধ, ব্যারাজ, ক্যানেল, আন্তঃসংযোগ, জলাধার, সেচপ্রকল্প ইত্যাদি একের পর এক পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ করেছে ভারত। যার সংখ্যা একশ’রও বেশি। এর পরিণতিতে এককালে সুজলা-সুফলা ও ফসল সমৃদ্ধ দেশের উত্তর জনপদের ৮৫টি নদ-নদী, শাখানদী ইতোমধ্যে পানিশূণ্য হয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অন্যতম প্রধান নদ যমুনার প্রশস্ততা বা চওড়া ছিল গড়ে ৫ কিলোমিটার। তা ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে এখন গড়ে ৭শ’ মিটারে ঠেকেছে। এই অববাহিকার অন্যতম ও এক সময়ের খরস্রোতা তিস্তা নদীতে আগে পানির প্রবাহ ছিল গড়ে ৬ হাজার ৭১০ কিউসেক। তা এখন কমতে কমতে মাত্র ৩শ’ কিউসেকে এসেছে। তিস্তা ক্রমেই মরা গাঙে রূপ নিচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ তলানিতে ঠেকেছে।

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় প্রবাহিত নদ-নদী, শাখা নদীগুলোর পানি ভাটির দিকে যায় উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-মধ্যাঞ্চল দিয়ে মধ্যাঞ্চল তথা ঢাকার আশপাশ দিয়ে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উজানে ভারতের বেপরোয়া পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কারণে এই অববাহিকায় অবস্থিত দেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুতই নিচে নামছে। উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে পানির স্তর নিম্নগামী হচ্ছে প্রতিবছর স্থানভেদে ৭ ফুট থেকে ৩৫ ফুট পর্যন্ত। এর প্রভাবে রাজধানী ঢাকায়ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচের দিকে নামছে প্রতিবছর ৬ ফুট থেকে ১১ ফুট।
ক্রমাগত মরুময়তার পথে ধাবিত হচ্ছে খরা কবলিত উত্তর জনপদ ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলের কমপক্ষে ১২ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা। মারাত্মক ভূ-প্রাকৃতিক, পরিবেশ-প্রতিবেশগত সঙ্কট এমনকি অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়েছে দেশের কৃষি-খামার, প্রাণ-প্রকৃতি, মৎস্যসম্পদ, জনস্বাস্থ্যসহ জনগণের জীবনধারণ। নদ-নদীতীরের অগণিত মানুষ বাস্তুচ্যূত হচ্ছে। জীবন-জীবিকার সন্ধানে ছুটছে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ অনিশ্চিত গন্তব্যে। রংপুর বিভাগের ১১ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগ থেকে ৩ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যূত হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদ-নদীগুলোতে ভারত যেসব বাঁধ, ব্যারাজ, জলাধার, সেচপ্রকল্প, ক্যানেল, আন্তঃনদী সংযোগ, রিজার্ভার ইত্যাদি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ করেছে এর মধ্যে প্রধানত আছে তিস্তা নদীর উজানে ভারতের গজলডোবা নামক স্থানে আরেক ফারাক্কা বাঁধ। গজলডোবা বাঁধ দিয়ে ভারত শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলকে পানিশূণ্য মরুময় করছে। আবার বর্ষাকালে ভারত প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিতে গিয়ে বাঁধের সব গেইট বা স্পিলওয়ে খুলে দিয়ে উত্তরাঞ্চলকে বন্যায় ডুবিয়ে মারছে।

গজলডোবা বাঁধ ছাড়াও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় উজানে বিশেষত ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলোতে ভারতের নির্মিত আরও উল্লেখযোগ্য বাঁধ-ব্যারাজ-রিজার্ভার ইত্যাদিতে রয়েছেÑ রঙ্গনদী বাঁধ, সুবনসিরি ড্যাম, রঙ্গিত ড্যাম, দিবাং বাঁধ, উচ্চ সিয়াং পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প, দিহিং নদী সেচ প্রকল্প, হাওরাপুর সেচ প্রকল্প, ময়ূরাক্ষী বহুমুখী পানি প্রকল্প, কংশবতী প্রকল্প, ডোয়াং পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ভারতের পানি আগ্রাসনের মারাত্মক প্রভাব শুধুই ব্রহ্মপুত্র নদে নয়, বরং তিস্তা-যমুনাসহ মোহনায় পর্যন্ত মরছে সব শাখানদী।

বিশিষ্ট পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত গতকাল বলেন, আমাদের দেশের নদ-নদীর এই মরণ দশার জন্য নিজারাও কম দায়ী নই। বৃটিশদের রেখে যাওয়ার পর আমাদের দেশের কোন সরকার কি নদীর যত্ন নিয়েছে। নদীগুলোর কোন যত্ন আমরা নেই নাই। তার উপর সেচ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছি। বড় বড় নদীর পানি যেমন আমরা ধরে রাখতে পারছি না, তেমনি সেচের মাধ্যমে ছোটনদীগুলোকে মারছি। এখন আসেন ভারতের পানি প্রত্যাহারের বিষয়ে। ভারত একতরফাভাবেই ব্যারেজ ও ড্যামের মাধ্যমে বিভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এর সুরাহা বা সমাধান একমাত্র রাজনৈতিকভাবেই সম্ভব। আর্ন্তাজাতিক আদালতে বিচারের কথা অনেকেই বলেন, কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কারণ যে আইনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিচার চাইবে সে আইনতো বাংলাদেশ সরকার নিজেই মানেনা। তাই ভারতের সাথে আর্ন্তজাতিক যে ৫৪টি নদী, আমার মতে ৬০ থেকে ৭০টি নদীর পানি প্রত্যাহারের যে সমস্য তার সমাধান কেবল রাজনৈতিকভাবেই হতে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments