Sunday, August 14, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামবন্যা ও বন্যাত্তোর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে

বন্যা ও বন্যাত্তোর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে

ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরণাচল ও পশ্চিমবঙ্গে কল্পনাতীত বৃষ্টি হয়েছে চলতি মাসের ১২-১৩ তারিখ থেকে। সেই বৃষ্টির পানি ধেয়ে এসেছে বাংলাদেশে। দেশের অভ্যন্তরেও বৃষ্টি হয়েছে একই সময়ে। ফলে দেশের বৃহত্তর সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুরে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে নদী ভাঙ্গন ও বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় বহু রাস্তা-ঘাট ও স্থাপনা বিলীন হয়েছে! চট্টগ্রামেও লাগাতার ব্যাপক বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বহু বাড়ি-ঘর, প্রতিষ্ঠান ও রাস্তা ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেয়রের দোতলা ভবনের নিচতলা ডুবে গেছে। পাহাড়ি অঞ্চলেও ব্যাপক বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে বন্যা হয়েছে এবং পাহাড় ধসে অনেক জানমালের ক্ষতি হয়েছে। এ অবস্থায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন চলমান ২০২০ সালের বিএড স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষা ও দেশের যে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিবন্দি হয়েছে, সেগুলো বন্ধ এবং বন্যাকবলিত সব এলাকায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। বন্যার পানিতে রেল লাইন ডুবে ও সেতু ভেসে যাওয়ায় নেত্রকোনায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বন্যায় এ পর্যন্ত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৃহত্তর সিলেট। সেখানে প্রায় সব এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই সেখানে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিমান বন্দর ও রেলওয়ে স্টেশনও বন্ধ করা হয়েছিল। পরে চালু করা হয়েছে।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পানি ঢুকে পড়ায় চিকিৎসা কাজ ব্যাহত হয়েছে। প্রবল বর্ষণে এমসি কলেজ সংলগ্ন ২৫০ বছরের পুরনো টিলা ধসে পড়েছে। সমগ্র অঞ্চলে স্বাস্থ্যসহ সব সেবা সংস্থার কার্যক্রাম বিঘ্নিত হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকছে। তাতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে! কোনো কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ ও গরু-ছাগল এক সাথে রয়েছে। তবে অধিকাংশ মানুষ নৌকার অভাবে নিরাপদ স্থানে যেতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে তারা ঘরের মধ্যে মাচা করে, ঘরের চালে, নৌকায়, উঁচু সড়ক ও বাঁধে ঠাঁই নিয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবি উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু সব সড়ক ডুবে যাওয়ায় ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ সিলেট অঞ্চলে বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তায় ৮টি জাহাজ দিয়েছে। বেসরকারিভাবেও কিছু উদ্ধার ও এাণ তৎপরতা চলছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিকল্প পদ্ধতিতে সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদ্যুতের সাব স্টেশন ও মোবাইল টাওয়ার ডুবে যাওয়া বিদ্যুৎ, মোবাইল ও ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। তবে, কয়েক দিন পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে মোবাইলের কিছু সংযোগ স্থাপন ও কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। কোমর সমান পানিতে কিছু রিক্সা ও ভ্যান চললেও ভাড়া ব্যাপক। দুর্গত এলাকায় এ পর্যন্ত সরকারি যে সাহায্য দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। যে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে, তা সুষম বণ্টনের অভাবে কেউ পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না!

গত বৈশাখ ও জ্যেষ্ঠ মাসে দু’ দফায় ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় হাওর অঞ্চলে উঠতি ইরি-বোরো ফসলের প্রায় অর্ধেক ডুবে যায়। তাই বছরে মাত্র এই এক ফসল ঠিকভাবে ঘরে তুলতে না পারায় এবং মাছ ভেসে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিকাংশ মানুষ নিঃশ্ব হয়ে পড়েছে। হাওর অঞ্চলে প্রয়োজনীয় বাঁধ থাকলে এবং কোথাও কোথাও অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তা ও ব্রিজ না থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট নদীগুলো দখলমুক্ত ও নিয়মিত সংস্কার করা হলে এই দুর্গতি হতো না। যা’হোক, বৃহত্তর সিলেটে পুনরায় বর্তমানে কয়েক যুগের মধ্যে সবচেয়ে বড় বন্যায় সমগ্র এলাকার মানুষের মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বন্যা হয়েছে মূলত ভারতীয় পানিতে। ইসিএমডব্লিইউর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি মাসের মধ্য সময়ে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অল্প কয়েক দিনে এত বৃষ্টির রেকর্ড গত ১০০ বছরে নেই। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাধারণত গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি একযোগে বাড়লে দেশে মাঝারি থেকে বড় বন্যা হয়। এ বছর এ ধরনের বন্যা হতে পারে । কারণ, ব্রহ্মপুত্রের পানি এরই মধ্যে বেড়েছে, গঙ্গার পানি দ্রুত বেড়েছে। ফলে বহু নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই তিস্তা ব্যারেজের সব স্লুইস গেট খুলে দেয়া হয়েছে। জুনের শেষের দিকে ও জুলাইয়ের শুরুতে দেশের উত্তরাঞ্চলে নতুন করে ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।

সমগ্র দেশে ব্যাপক বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অচিরেই। তাই নতুন করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উপরন্তু তিনি গত ২১ জুন হেলিকপ্টারযোগে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করে সিলেটে বলেন, বন্যা মোকাবিলায় সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। সিলেট অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ২২ জুন জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে, বজ্রপাতে ও সর্প দংশনে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে, গত ২১ জুন পর্যন্ত ১৯ জেলায় এক লাখ ৪৩ হাজার ৭৮০ হেক্টর ফসলি জমি ডুবে গেছে। এর মধ্যে আউশের জমি ৭৪ হাজার ৬৪৮ হেক্টর, রোপা আমন বীজতলা ৯০৪ হেক্টর, বোনা আমন ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টর, সবজি ১৩ হাজার ২৯৩ হেক্টর এবং অন্যান্য ফসলি জমি ৩০ হাজার ৪৩৭ হেক্টর।মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকার অধিক। এছাড়া, বিপুল ঘর-বাড়ি ও স্থাপনা এবং সড়ক নষ্ট হয়েছে। উপরন্তু ভারী বর্ষণে প্রায় সারা দেশের শাক-সবজী ও আমন ধানের বীজ তলা ডুবে গেছে। গো খাদ্যের চরম অভাব দেখা দিয়েছে।

বন্যা একই সঙ্গে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট। তাই একে ঠেকানো যাবে না। কিন্তু বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্ট মানুষের দুর্দশা লাঘব করার সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, যার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে। যার অন্যতম হচ্ছে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা, সব আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া এবং সেখানে প্রয়োজনীয় খাবার, সুপেয় পানি ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এসব ক্ষেত্রের দায়িত্ব সেনা বাহিনীকে দিলে ভাল হবে। কারণ, তাতে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি হবে না। সেনাবাহিনী প্রধান গত ১৮ জুন সিলেটের বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন কালে সেনা সদস্যদের নিরলসভাবে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রাখা, জরুরি ত্রাণকার্য পরিচালনা, চিকিৎসা সহায়তা প্রদান এবং বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বাত্মকভাবে আত্মত্যাগের মাধ্যমে সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন।

স্মরণীয় যে, বন্যার্তদের সহায়তা করতে হবে অনেকদিন। কেননা, করোনা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও বন্যার কারণে পণ্য মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ চরম সংকটে রয়েছে। তাই বন্যাকালীন সময়ে বন্যার্তদের প্রয়োজনীয় সার্বিক সহায়তা করা এবং বন্যাত্তোর সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুণর্বাসন কর্মসূচী গ্রহণ তথা যাদের বাড়ী-ঘর ও স্থাপনা ভেঙ্গে/ভেসে গেছে,তা দ্রুত পুনঃনির্মাণ/সংস্কার করা এবং সব কৃষকের জন্য স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রি এবং স্বল্প সুদে প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণ, সার, কীটনাশক ও বীজ ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে।তাহলে সবজী, রবিশস্য, আমন ধান, হাস-মুরগী, গবাদি পশু ও মৎস্য চাষে কৃষকের সহায়তা হবে। ইতোমধ্যেই কৃষিমন্ত্রী সার ও বীজ ফ্রি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এটা ভালো উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে যেন দলীয়করণ না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। উপরন্তু বন্যার্ত এলাকায় দ্রুত কাজ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে খেটে খাওয়া মানুষের কিছু কল্যাণ হবে। অন্যদিক, বন্যার্তদের সহায়তা করার জন্য সমগ্র দেশের সামর্থবান ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, সুশীল সমাজ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে।

গড়ে তুলতে হবে সব পাড়া-মহল্লায় দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সন্মিলিতভাবে এাণ কমিটি। তাতে যে যা দেবে তাই গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণদের অগ্রণী ভূমিকার পালন করতে হবে। এছাড়া, সংগৃহীত সহায়তা এাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জমা দিতে হবে। তাহলে কেন্দ্রিয়ভাবে সুষম বণ্টন করতে সুবিধা হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি ব্যাংক একাউন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ইতোমধ্যেই দেশের বিনোদন জগতের অনেক তারকা এবং ইউনিসেফ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দেশের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্যার্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। এছাড়া, বিএনপি, জাপা, আ’লীগ ও আলেম সমাজ কিছু ত্রান তৎপরতা চালাচ্ছে। বাকি সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনকেও এটা করতে হবে। কারণ, বন্যা জাতীয় সমস্যা । জাতীয়ভাবেই তা মোকাবেলা করতে হবে। এটা সকলের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। এক্ষেত্রে প্রবাসীদেরও এগিয়ে আসা উচিত। উপরন্তু ত্রাণ নিয়ে কোনরূপ অপরাজনীতি যেন না হয়, সেদিকে সকলের দৃষ্টি রাখা দরকার।

উল্লেখ্য যে, দেশের হাওর অঞ্চলে বাঁধ না থাকা, অপরিকল্পিত বাঁধ থাকা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সব নদী, খাল-বিল ও হাওর দখল ও মজে যাওয়ায় প্রায় প্রতিবছরই ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, যার স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি। সে লক্ষ্যে অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তা ও ব্রিজ অপসারণ, প্রয়োজনীয় টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও তা নিয়মিত রক্ষণা-বেক্ষণ করা এবং সব নদী, খাল, বিল, হাওর দখলমুক্ত ও পুনঃখনন করা এবং অনেকগুলো স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা আবশ্যক। এছাড়া, তিস্তা, যমুনা ও পদ্মা এবং তাদের শাখা নদীগুলোর সংস্কার করা জরুরি। নতুবা হঠাৎ করে ব্যাপক বন্যা হওয়া এবং খরা মওসুমে পানি সংকট চলতেই থাকবে।সর্বোপরি সারাদেশের রাস্তা-ঘাট, বাঁধ, স্থায়ী বাড়ি-ঘর ও স্থাপনা বড় বন্যা লেবেলের চেয়ে উঁচু ও বন্যায় টিকে থাকার মতো সক্ষম করে এবং নদী থেকে দূরে নির্মাণ করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments