Wednesday, June 12, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামফুটবল খেলতে চাইছিলাম ঢাকা উদ্যান গেছিলাম

ফুটবল খেলতে চাইছিলাম ঢাকা উদ্যান গেছিলাম

মোকাম্মেল হোসেন 

হা করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। একদমে সে যা বলল, তাতে ঘটনা মোটামুটি ভয়ংকর বলেই মনে হচ্ছে। ভর্ৎসনার সুরে তাকে বললাম-

: ঘর কি ফুটবল খেলার জায়গা?

: শাফিনই তো খেলা শুরু করল!

: তাইলে দোষ পুরাটাই শাফিন মিয়ার?

: হ্যাঁ।

: কিন্তু শাফিন তো একা খেলতেছিল না। লগে তুমিও আছিলা!

: আমি থাকলেই কী? ও এমন জোরে বল মারল…

: ও জোরে বল মারল আর তুমি হা কইরা তাকাইয়া-তাকাইয়া দেখলা? বড় ভাই হিসাবে অবশ্যই তোমার একটা দায়িত্ব আছে। তুমি তারে বল আস্তে মারতে বলবা না?

: ও কী আমার কথা শুনে?

এরপর আর কোনো কথা বলা নিরর্থক। যে মানুষ কথা শুনে না, তাকে কিভাবে কথা শুনাতে হয়-আমার বড় ছেলে সে কৌশল এখনো রপ্ত করতে পারেনি। প্রসঙ্গ পালটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-

: শাফিন কই?

: আম্মু ছেঁচা দেওয়ার পর রেহেনা আপু তারে লইয়া ছাদে গেছে।

: তোমারে ছেঁচা দেয় নাই?

: আমারে খালি একটা চড় মারছে।

কর্মক্লান্ত শরীর আর অবসন্ন মন নিয়ে কর্মক্ষেত্র থেকে বাসায় ফিরেছি। এ অবস্থায় পুনরায় বাসা থেকে বের হওয়া এক প্রকার শাস্তি বলে মনে হলেও কিছু করার নেই। এ হচ্ছে ধর্ম রক্ষার লড়াই। যদি সংসারের জোয়াল কাঁধে না নিয়ে হিমালয়ের গুহায় না হোক, অন্ততপক্ষে গারো পাহাড়ের কোনো চিপা-চুপায় ধ্যানে বসে যেতাম, তাহলে সংসারধর্ম রক্ষা করার নিমিত্তে এখন চারতলা থেকে নিচে নামার দরকার পড়ত না।

নিচে নামার আগে লবণ বেগমের মোবাইল ফোনে কল দিলাম। নো আনছার। পর পর কয়েকবার কল দেওয়ার পরও একই অবস্থা বিরাজমান থাকায় ছাদে গিয়ে রেহেনার সামনে দাঁড়ালাম।

: রেহেনা!

: জি খালুজান।

: শাফিন কই?

: শাফিনরে লইয়া খালা ডাকতরের কাছে গেছে।

: যাওয়ার সময় কিছু বইলা গেছে?

রেহেনা না সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। সময় নষ্ট না করে সিঁড়িতে পা রাখলাম। নিচে নেমে গেটের পাল্লা খুলে মুখ বের করতেই লবণ বেগমের মুখোমুখি। শাস্ত্র অনুযায়ী মুসলমান পুড়ে না। যদি পুড়ে যাওয়ার বিধান থাকত, তাহলে লবণ বেগমের দৃষ্টি-অগ্নিতে নির্ঘাত ছাই হয়ে যেতাম। নীরবে ছেলেকে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই লবণ বেগম ঝামটা মেরে ছেলেকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এক পর্যায়ে লবণ বেগম যখন বুঝতে পারল, দৃষ্টি-অগ্নিতে কাজ হচ্ছে না; তখন সে মুখ খুলল। বলল-

: দেয়ালঘড়ির কাচ যদি এই ছেলের গালের ওপর না পইড়া চোখের ওপর পড়ত, তাইলে আইজ কী অবস্থা হইত, কও আমারে।

: ঘটনা ঘটিতং হওয়ার পর সেই বিষয়ে কথা বইলা লাভ নাই।

: ঘটনা ঘটবে কী জন্য; তুমি আগে চিন্তা করবা না? মেসি মেসি কইরা মাতম তুইলা বাপ-বেটা সবাই মিইল্যা জুতা-জামা-ফুটবল কিইনা যে ডঙ্কা বাজানো শুরু করলা-তার ফল কী হইছে?

: ফল ভয়াবহ হইছে।

: তুমি এই মুহূর্তে ছেলেদের লইয়া মাঠে যাবা।

: ঠিক আছে; যাইতেছি।

মালকিনের পিছুপিছু বাসায় ঢোকার পর তার হুকুম কার্যকর করার মানসে ছেলেদের নিয়ে মাঠে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই জলদগম্ভীর স্বরে সে বলল-

: নাশতা তৈরি কইরা রাখছি। খাইয়া তারপরে যাও।

কাপড়-চোপড় পালটিয়ে নায়-নাশতা করার পর বের হতে পারলে খুবই ভালো হতো। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে যত দ্রুত সম্ভব বাসার বাইরে চলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কালক্ষেপণ না করে পুত্রদ্বয়ের উদ্দেশে বললাম-

: চলো নওজোয়ান, হও আগুয়ান…

ছেলেদের নিয়ে শ্যামলী মাঠের কাছাকাছি যেতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। একি! সারা মাঠ টিন দিয়ে ঘেরা। বিমর্ষ ভাব নিয়ে পাশের পান-বিড়ির দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম-

: ভাই, এই অবস্থা ক্যান?

: মাঠে মেলার আয়োজন করা হইছিলো।

: মেলা তো শেষ হইছে সেই কবে!

: এক মেলা শেষ হইছে; কিন্তু সামনে ঈদ আছে না? প্রতিবছর ঈদের আগে এইখানে মাসব্যাপী বস্ত্রমেলার আয়োজন করা হয়।

: এতদিন ধইরা মাঠ আটকাইয়া রাখবে?

: ভাবে তো তাই মনে হইতেছে।

খাইছে আমারে! এখন উপায়? আশপাশে আর কোথাও মাঠ আছে কিনা, মনে করতে পারছি না। হঠাৎ এক রিকশাওয়ালার মুখে ঢাকা উদ্যান-ঢাকা উদ্যান চিৎকার শুনে কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলাম। মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর না হোক, উদ্যানে ঢুকে গাছপালার ফাঁক-ফোকর দিয়েও যদি ছেলেরা কিছু সময় বল নিয়ে লাফালাফি করতে পারে, তাহলে ইজ্জত রক্ষা হবে। হাত তুলে রিকশাওয়ালাকে ডাক দিলাম। দরদাম শেষে ফুর্তিমাখা গলায় উচ্চারণ করলাম-

: চলো বাহে ঢাকা উদ্যান…

বেড়িবাঁধের ঢালে পৌঁছার পর রিকশাওয়ালা বলল-

: নামেন। সড়কের ওইপারেই ঢাকা উদ্যান।

ভাড়া মিটিয়ে বেড়িবাঁধ পার হলাম। উদ্যানের খোঁজে এ মাথা ও মাথা ঘোরাঘুরির পর একজনের শরণাপন্ন হতেই তিনি কৌতূহল ভরা চোখে কিছুক্ষণ আমাদের নিরীক্ষণ করে বললেন-

: এইটা পুরাটাই ঢাকা উদ্যান।

লে হালুয়া। কী করা উচিত, ভেবে পাচ্ছি না। এসময় প্রতিবেশী হাসমত আলী সাহেব ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হলেন। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম-

: আপনে এইখানে!

: এইখানে আমার এক আত্মীয় থাকেন; তার কাছে আসছিলাম। আপনার টিমের আরেকজন কোথায়?

: প্র্যাকটিস করতে গিয়া আহত হইছে।

: বলেন কী! কোথায় প্র্যাকটিস করতে গেছিল?

: বাসায়।

: বাসায় মানে! ছাদে?

: না, ড্রয়িংরুমে।

: ড্রয়িংরুমে ফুটবলের প্র্যাকটিস? আজব তো! আহত হইল ক্যামনে?

: টিমের দুই নম্বর সদস্যের কিক করা বল দেয়ালঘড়ির কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ করার পর সেই কাচ তার গায়ে বিদ্ধ হইছে।

: এইখানে তাইলে কী জন্য আসছিলেন?

: ফুটবল খেলতে।

: এইখানে ফুটবল খেলতে?

: হ। রিকশাওয়ালার মুখে ঢাকা উদ্যান কথাটা শুইন্যা ভাবছিলাম…

: বুঝতে পারছি। হাঃ হাঃ হাঃ। ঢাকা উদ্যানরে আপনে বাগান মনে করছেন। আরে ভাই, এইটা হইল আবাসিক এলাকার নাম। একটা হাউজিং কোম্পানি তাদের প্রজেক্টের এই নামকরণ করছে। দেখতেই পারতেছেন, তাদের তৈরি করা উদ্যানে কোনো গাছ নাই, শুধু ফ্ল্যাট আর ফ্ল্যাট; সারি সারি ফ্ল্যাট…

হাসমত আলী সাহেব চলে যাবার পর নিজেই নিজের গালে একটা চড় দিলাম। তা দেখে বড় ছেলে বলল-

: আব্বু, এইটা কী হইল!

: এইটা হইল উদ্যানরে বাগান মনে করার পুরস্কার।

বাসায় ফিরে যেতে ভরসা পাচ্ছি না। ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বাসায় ফেরা মানেই হচ্ছে, পুরোনো ইস্যুর পুনরুজ্জীবন। ফুটবল খেলার মতো কোনো মাঠ খুঁজে পাওয়া গেল না-বাসায় ফিরে ছেলেরা লবণ বেগমকে এই সংবাদ জানানোর পর কী পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে, ভাবতেই কলিজা বরই গাছের শুকনা পাতার আকার ধারণ করেছে। অতএব শেষ চেষ্টা হিসাবে কল্যাণপুরের এক বন্ধুর কাছে ফোন করে তার সাহায্য কামনা করলাম। সব শোনার পর সে আমার ওপর ক্ষেপে গিয়ে বলল-

: তুমি আর কাম পাইছো না?

: কী করমু কও, পোলাপানে এমুন লাফালাফি শুরু করল, দেইখা আমিও ফাল দিলাম।

: তালে তাল মিলাইয়া ফাল তো দিছ; কিন্তু ঢাকা শহরে মাঠ কই? যে কয়টা আছে, সেখানেও কিভাবে বিল্ডিং খাড়া করা যায়, হরদম সেই পরিকল্পনা চলতেছে। মাঠ যদি না থাকে, বাচ্চা-কাচ্চারা যদি খেলাধুলার সুযোগই না পায়, তাইলে ফুটবল বিশ্বকাপ লইয়া এই যে এত মাতামাতি, তার কোনো ফায়দা আছে?

: এখন আমি কী করমু, সেইটা কও।

: কী আর করবা? বাসায় ফিইরা যাও। তারপর পোলাপানরে লইয়া মোবাইল ফোনে গেম খেলায় মগ্ন হও।

বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করছে না। একটা রিকশা ডাক দিয়ে তাতে ওঠে বসলাম। যানবাহনের মহাসমুদ্রে এঁকেবেঁকে সামনে এগুচ্ছে ত্রি-চক্রযান। ছেলেদের উদ্দেশে বললাম-

: তোমরা বামদিকে দেখ, আমি ডানদিকে দেখতেছি। কোনো মাঠ চোখে পড়লেই আওয়াজ দিবা।

দুই ছেলে সমস্বরে বলে ওঠল-

: আইচ্ছা…

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments