Tuesday, May 28, 2024
spot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিফরিদ আর শুভর রোবটরা

ফরিদ আর শুভর রোবটরা

বন্ধুকে নিয়ে কোথাও খেতে গেলেন। অর্ডার দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার নিয়ে এলো একজন। সুন্দর করে পরিবেশন করে চলেও গেল সে। তবে খাবার পরিবেশনকারী কোনো মানুষ নয়, রোবট। কলকারখানা তো বটেই, অন্যান্য কাজেও রোবট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একদল উদ্যমী তরুণ রোবট তৈরি করে খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। রোবটিকসে উদ্যমী তরুণদের সফলতার গল্প নিয়ে লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

ফরিদের ‘রোবা’

মানুষের চেহারা শনাক্ত করার পাশাপাশি গাণিতিক হিসাব-নিকাশ পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত রোবট ‘রোবা’। প্রশ্ন করলে জবাবও দিতে পারে। রোবা তৈরি করেছেন রাজধানীর গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ফরিদ হোসেন। তাঁকে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী মো. রনি হোসেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ের ছাত্র ইকবাল মাহমুদ। রোবট নিয়ে কাজ করার কারণ জানতে চাইলে ফরিদ বলেন, ‘আমি মূলত রোবটিকস ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করি। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী ৮০ কোটি কর্মীর চাকরি দখল করে নিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট। যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি তখন থেকেই রোবট নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করি। কম্পিউটার সাবজেক্টের বই থেকে রোবট সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাই। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমায় ভর্তি হয়ে চতুর্থ সেমিস্টারে উঠে প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করি, যার নাম ছিল (ব্যাংরো)। সেটা ২০১৬ সালের কথা। তার পর টিভেট হিউম্যানয়েড রোবট (২০১৮), ডিগ্রো ওয়্যারহাউস রোবট (২০১৯), সুরুচি কুকিং রোবট (২০২০) এবং সর্বশেষ হিউম্যানয়েড রোবট রোবা তৈরি করি গত বছর।’

মানুষের মতো দেখতে রোবা মানুষ চিনতে পারে। এর বডি তৈরি করা হয়েছে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) প্রিন্টারে। রোবার উচ্চতা চার ফুট। ফরিদ বলেন, এটি চালাতে ব্যবহারকারী তাঁর চাহিদা অনুযায়ী সফটওয়্যার তৈরি করে নিতে পারবেন। রোবা তৈরিতে দুই বছর লেগেছে। খরচ হয়েছে ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের কাছ থেকে পেয়েছেন ২০ লাখ টাকা।

রোবার যত ক্ষমতা : রোবাকে কী ধরনের কাজে লাগানো যেতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদ বলেন, ‘রোবাকে দিয়ে ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই কাজ করানো যাবে। তবে প্রথম সংস্করণের ক্ষেত্রে আমরা ইনডোর বা ঘরের ভেতরের কাজগুলো করাতে চাচ্ছি। যেমন বাসাবাড়ি, হসপিটাল, শপিং মল, গার্মেন্ট, রেস্টুরেন্ট, অফিসের মতো জায়গাগুলোতে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে রোবটটিকে কাজে লাগাতে চাই। রোবটটি সব ধরনের কাজে আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। এই মুহূর্তে রোবা পানি ঢেলে দেওয়া, সবজি কাটা, লেখালেখি করা, রড কাটা, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জিনিস বহন করা, অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো ইত্যাদি কাজ করতে পারে।’ অভ্যর্থনাকক্ষে গ্রাহকদের নানা রকম তথ্যও জানাতে পারবে এটি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ফরিদ বলেন, রোবট সম্পর্কে দক্ষতা আরো বাড়াতে চান। যথাযথ ফান্ডিং পেলে তিনটি রোবটকে (রোবা পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রোবট, সুরুচি কিচেন রোবট, ডিগ্রো ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট রোবট) কমার্শিয়ালাইজ করার পরিকল্পনা আছে তাঁর।

শুভর ‘রবিন’ ও ‘সেবক’

ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর কাজের প্রতি খুব ঝোঁক শুভ কর্মকারের। সময় পেলেই প্রজেক্ট বানাতেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম বিজ্ঞান প্রজেক্ট তৈরি করেন। এরপর ২০১৮ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়ে রৌপ্য পদক অর্জন করেন। সে সময়ে বিদেশ থেকে রোবট সোফিয়াকে বাংলাদেশে আনা হয়। সোফিয়াকে দেখে শুভ ভাবলেন, এমন রোবট তো দেশেই তৈরি করা সম্ভব। ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি শুভর রোবট ‘রবিন’ বানানোর কাজ শেষ হয়। রোবটটির উচ্চতা চার ফুট, তিনটি ব্যাটারিতে চলে। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই কথা বলতে পারে। যে কারো কথা শুনলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেমোরিতে সংরক্ষণ করে। শুভ বলেন, রবিন একটি সেলফ লার্নিং রোবট, যে কি না সব কিছু নিজে নিজেই শিখে নিতে পারে। কিছু শেখাতে হলে কোডিং জানার প্রয়োজন হয় না। মুখে বললে রোবটটি নিজেই নিজের ডাটাবেইসে তথ্য সেভ করতে পারে। রবিনকে তৈরির উদ্দেশ্য সম্পর্কে শুভ কর্মকার বলেন, রবিনকে তৈরি করার মূলে রয়েছে মানবসেবার ইচ্ছা। রবিনের মাধ্যমে মানুষকে তার প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে চান তিনি। শিক্ষক, প্রাথমিক চিকিৎসক, রিসিপশনিস্ট এবং কৃষকের একজন উপকারী বন্ধু হিসেবে কাজ করতে পারবে রবিন। কৃষককে কৃষিসংক্রান্ত তথ্য দিতে পারবে। আবার কোথাও অগ্নিকাণ্ড ঘটলে সেটা নিকটস্থ ফায়ার সার্ভিস অফিসে গুগল ম্যাপসহ জানাতে পারবে। নির্দেশ অনুযায়ী রবিন হাঁটাচলাও করতে পারে।

ব্যবসায়ী বাবা, মা দিপ্তী কর্মকার আর ছোট বোন তমা কর্মকারকে নিয়ে শুভর পরিবার। শুভ অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। শুভ জানান, রোবট রবিনের আরো উন্নত সংস্করণ (রবিন ২.০) তৈরির কাজ চলছে। সেখানে রবিনের পূর্ববর্তী সব ত্রুটি সংশোধিত হবে এবং সেটি আরো নিখুঁত মানবাকৃতির হবে (প্রজেক্টটিতে আগের সংস্করণের তুলনায় খরচ হবে ১০ গুণ বেশি)! এরই মধ্যে এই পরিকল্পনার প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সম্প্রতি শুভ তৈরি করেছেন ‘সেবক’ নামের আরেকটি রোবট। ডাক্তারের নির্দেশ মেনে রোগীর সেবা করতে পারে ‘সেবক’। এটি রোগীকে মাস্ক পরানো, এমনকি রোগীর ব্যবহার্য জিনিসপত্র আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে পারে। রোগীর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। শুভ বলেন, এই রোবট ডাক্তারের সংকেতে রোগীকে ওষুধ খাওয়াতে পারবে। মাস্ক পরানো রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমলে, সঞ্চিত পানি ভেঙে অক্সিজেন তৈরি করে তা অন্তত ১৪ থেকে ২০ জন রোগীকে সরবরাহ করতে পারবে। ডাক্তার যত দূরেই থাকুক না কেন নির্দেশনা মেনে রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করবে এই রোবট। শুভ কর্মকার বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমি শুধু রোবট নিয়েই কাজ করতে চাই। রোবটিকস আমার প্রিয় বিষয়। রোবট উদ্ভাবন করে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে চাই।’

২০১৮ সালের ১৫ মে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উদ্ভাবনবিষয়ক জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছ থেকে পুরস্কার লাভ করেন রবিনের উদ্ভাবক শুভ কর্মকার। ২০১৯ সালে ৪০তম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের হাত থেকে পুরস্কার নেন। এ ছাড়া সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ-২০১৯-এ বিজ্ঞান বিষয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেন। সে বছর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির হাত থেকে ‘বছরের সেরা মেধাবী’ পুরস্কার নেন শুভ কর্মকার।

রোবট তৈরির উদ্যোগকে সাধুবাদ : দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানা রকমের রোবট তৈরি করায় কলকারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও লাভবান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিকস ও মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক মো. আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রোবট দিয়েও যে অনেক কাজ করা সম্ভব তা জানতে পারছে মানুষ। রোবটিকসের কাজ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে। রোবটিকসে গুরুত্ব না দিলে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ব আমরা।’

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments