এই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে কত খেলেছেন। ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় এই মাঠে কেটেছে নওশেরুজ্জামানের। এই মাঠে রয়েছে তার অনেক কীর্তি- হোক সেটা জাতীয় দল কিংবা ক্লাব। সবখানেই ছিল তার সমান আধিপত্য। এমনকি ক্রিকেটেও ছিলেন পারদর্শী। যে মাঠে তার এতসব কীর্তি, সেখানেই আজ শেষ বিদায় জানানো হলো নওশেরুজ্জামানকে। এ সময় হাজির হয়েছিলেন তার সাবেক সতীর্থরাও। শেষবারের মতো ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন রণাঙ্গনের বীর মুুক্তিযোদ্ধা।

আগের দিন রাতে রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। গতকাল নওশেরুজ্জামানের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। এরপর বেড়ে ওঠা মুন্সীগঞ্জে তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে নওশেরের মরদেহ দাফন করা হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধে সতীর্থদের সঙ্গে ময়দানি লড়াইয়ে দেশ মাতৃকার জন্য জনমত ও সমর্থন আদায়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তহবিল সংগ্রহে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। বিদায়ের দিনে সেই সতীর্থদের কাঁধে চড়েই তার যাওয়ার কথা ছিল। অশ্রুভেজা নয়নে তাকে বিদায় দেয়ার কথা সহযোদ্ধাদের। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সঙ্গী জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শংকর হাজরা কিংবা কাজী সালাউদ্দীন কেউ আসেননি তাকে শেষ বিদায় জানাতে। গোলকিপার আবদুস সাত্তার ছাড়া স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের আর কোনো সদস্যই উপস্থিত ছিলেন না। বরং সাবেক তারকা ফুটবলার আবদুল গাফফার নিজ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে নওশেরের মরদেহ নিয়ে আসেন এবং জানাজা দেন। এ সময় শুভাকাঙ্ক্ষী ছাড়াও সাবেক ফুটবলার স্বপন কুমার দাস, বাফুফের সভাপতি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মানিক, ইকবাল হোসেন, অমিত খান শুভ্র, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সচিব মাসুদ করিম, বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ, জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রশাসক মোবারক করিম লিটন এবং আবাহনীর সমর্থক গোষ্ঠীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
শোকাতুর হৃদয়ে স্মৃতিচারণ করে নওশেরুজ্জামানের প্রিয় ক্লাব মোহামেডানের আরেক সাবেক ফুটবলার আবদুল গাফফার বলেন, ‘নওশের ভাই ৭০ দশকের নামি খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি খেলেছেন ঢাকা মোহামেডান, ওয়ান্ডারার্স ও ফায়ার সার্ভিসের মতো দলে। এ ছাড়া স্বাধীন বাংলা দলেরও খেলোয়াড় ছিলেন। তার সঙ্গে ১৯৭৭ সালে মোহামেডানে এবং আগাখান গোল্ডকাপে খেলার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এ ছাড়া আরো দুই বছর খেলেছি মোহামেডানে। তিনি একজন ভালো ফুটবলার ছিলেন। এভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নওশের ভাই চলে যাবেন, তা ভাবতেই পারেননি। তবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল স্বীকৃতি পায়নি, এ নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল। আর সেটি না দেখেই তাকে চলে যেতে হলো।’ সতীর্থের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেন আবদুস সাত্তার, ‘ভারতের ক্যাম্পে আমরা এক সঙ্গে ছিলাম। নওশের ভাই সবাইকে উৎসাহ দিতেন। বেশ হাসি-খুশি মানুষ ছিলেন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্য তার অবদান অনেক। তার এই অবদান ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তিনি সবসময় আমাদের অনুপ্রেরণা দিতেন। সবসময় সহযোগিতা করতেন। এই মাঠে উনি খেলে গেছেন, আর এই মাঠেই তার জানাজা হচ্ছে। ভাবতেই খারাপ লাগছে।’ নওশেরুজ্জামানের একমাত্র ছেলে মইনুজ্জামান রূপম বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেছেন, ‘বাবা অনেক বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন। বাবার যৌবনের খেলা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। সেই বাবাকে হারানোর শোক ভোলার নয়। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English