Monday, April 15, 2024
spot_img
Homeধর্মপার্থিব ধন-সম্পদের গুরুত্ব

পার্থিব ধন-সম্পদের গুরুত্ব

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ইসলাম জীবন জগেক উপেক্ষা করে বৈরাগ্যপনার জীবনকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে; বরং জীবন জগতের সঙ্গে জড়িত থেকেই এক নিয়ন্ত্রিত ও পরিমার্জিত জীবনবোধের প্রতি মানুষকে আমন্ত্রণ জানায়। এ কারণেই ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক তৎপরতা ও আয়-উৎপাদনের প্রচেষ্টাকে বৈধ, উত্তম এবং অনেক ক্ষেত্রে অবশ্যকরণীয় বলে ঘোষণা করেছে।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পার। ’ (সুরা জুমা, আয়াত : ১০)।

এর অর্থ বৈষয়িক কাজ-কর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, হালাল উপার্জনের অনুসন্ধান আল্লাহর ফরজসমূহ আদায়ের পর অন্যতম ফরজ। (কানযুল উম্মাল)। অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, বিশ্বনবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। ’ (বুখারি, হাদিস : ২০৭২)

উপার্জনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে নবীজি (সা.) আরো বলেন, ‘তোমাদের কারো জন্য তার রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করতে বের হওয়া মানুষের কাছে তার ভিক্ষা করার চেয়ে উত্তম। ’ (বুখারি, হাদিস : ২০৭৫)

মানবজাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রচেষ্টা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি প্রশংসনীয় প্রয়াস। এতদসত্ত্বেও ইসলাম  অর্থনৈতিক সমস্যাকে মানবজীবনের একমাত্র মৌলিক সমস্যা বলে মনে করে না এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নতিকেই জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য বলে স্থির করে না। সারকথা আল কোরআন অর্থনৈতিক বিষয়ের বৈধতা ও অত্যাবশ্যকীয়তার কথা মেনে নিলেও সম্পদ আহরণই মানুষের জীবনের পরম লক্ষ্য—এ কথা স্বীকার করে না। কারণ কোনো বস্তু অত্যাবশ্যকীয় হলেই তা একান্ত কাম্যও হয় না। যেমন ধরুন, মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রশ্রাব-পায়খানা করা অত্যাবশ্যকীয় হলেও কেউ এ কাজকে জীবনের পরম লক্ষ্য বানায় না। যেহেতু মানবমনে জন্মগতভাবেই সম্পদের প্রতি পরম আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে, কোরআনের ভাষায়—‘মানুষের জন্য আকর্ষণীয় করে দেওয়া হয়েছে রমণীর আসক্তি, সন্তানের ভালোবাসা, রাশি রাশি সঞ্চিত সোনা-রুপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদিপশু ও ক্ষেত খামার। ’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত : ১৪)

সুতরাং মানুষের মধ্যে সম্পদের প্রতি দুর্বলতা থাকাই স্বাভাবিক; কিন্তু সম্পদের এই আকর্ষণ কখনো কখনো এত তীব্র ও প্রবল হয়ে যায় যে এর মায়ায় জড়িয়ে মানুষ বিস্মৃত হয়ে যায় তার জীবনের চরম লক্ষ্য ও পরম উদ্দেশ্যের কথা।

পৃথিবীর ধন-সম্পদ ও ভোগ্যসম্ভার আহরণে সে এভাবেই বিমত্ত্ব হয়ে পড়ে যে কেবল দুহাতে সম্পদ কামাতে থাকে। একের পর এক সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে; তবু তার এ তৃষ্ণা বেড়ে যায়। এই অতৃপ্ত ক্ষুধা আর চাহিদা মানুষকে ক্রমে পশুবৎ করে তুলে। অন্যের কল্যাণ চিন্তা তখন তার থেকে অবলুপ্ত হয়ে যায়। মানবরূপী পৃথিবীর অপরাপর বাসিন্দাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চিন্তা তখন তার অন্তরে বিলকুল থাকে না। আরো চাই, আরো চাই, এরূপ এক অতৃপ্ত বুভুক্ষু মোহনীয় সুর তাকে পাগল করে তোলে। সে তখন মরিয়া হয়ে সুরের পেছনে ছুটতে থাকে। সম্পদ আহরণ তখন তার নেশায় পরিণত হয়। যে কোনো উপায়ে হোক, যত জঘন্য পন্থা অবলম্বন করেই হোক, সম্পদ উপার্জনে সে পিছপা হয় না। এ বুভূক্ষ মানুষের নগ্ন থাবার শিকার হয় পৃথিবীর বাসিন্দা অপরাপর মানুষ। এদের দ্বারাই শোষিত ও নির্যাতিত হয় নিরীহ সহজ-সরল বনি আদম।

এদের দ্বারা সংঘটিত পাপাচারে ভরে যায় পৃথিবী। এদের অন্যায় আচরণে মানুষ হয়ে ওঠে অতিষ্ঠ। সমূহ জটিলতার আবর্তে মানুষের জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ।

মজলুম ও নির্যাতিত মানুষের আর্তকান্নায় বিষাক্ত হয়ে ওঠে পৃথিবীর পরিবেশ।

পৃথিবী সম্পদসর্বস্ব এক মানসিকতার দিকে তীব্র গতিতে ধেয়ে যায়। এক চরম বীভৎস ও ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় মানুষ। সম্পদের লিপ্সা মানুষের মধ্যকার মানবতাবোধকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। হায়োনাবৎ এক জঘন্য মনোবৃত্তি জন্ম নেয় আশরাফুল মাখলুকাত বনি আদমের মাঝে। আর এসবের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করে সম্পদের প্রতি মোহাচ্ছন্ন মানসিকতা, অন্ধ আকর্ষণবোধ ও ধন-সম্পদ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments