চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রাম কুলপাগলি। আজকে যেখানে একটি সেমিপাকা ঘর ও একটি ছোট দালান ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। কিন্তু আজকে থেকে ছ’বছর আগেও সেখানে ছিল পরিত্যক্ত একটি জঙ্গল। গ্রামের নিকট দূরত্বে ছিল না কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

লোহাগাড়া উপজেলার তৎকালীন ইউএনও ফিজনুর রহমানের আগ্রহ ও সদিচ্ছার বলে এবং গ্রামবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। বর্তমানে স্কুল ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা মিলে কুলপাগলি গ্রামের ৩০০ ছাত্রছাত্রী প্রাথমিক শিক্ষা নিচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

স্কুল কমিটির সভাপতি নুরুল আমিন বলছিলেন একটি পরিত্যক্ত জঙ্গলে এমন সুন্দর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার গল্প। নুরুল আমিন বলেন, আমি এখান থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সাথে জড়িত ছিলাম। সে কারণে ইউএনও ফিজনূর রহমান স্যারের সাথে আমার একদিন কথা বলার সুযোগ হয়।আমি স্যারকে বলি স্যার আমার গ্রামটি খুব অবহেলিত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাই। একদিন আপনি আমাদের গ্রামটি দেখতে আসেন। এরপর তিনি একদিন চলে আসলেন। তখন জঙ্গলের এক কোণে আমরা একটা রুম দিয়ে একটা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা চালাতাম। সে ফোরকানিয়া মাদ্রাসা একটা পাটি পেতে স্যারকে বসতে দিলাম। গ্রামের শত শত নারী পুরুষ স্যারের কাছে এসে বললেন স্যার আমাদের একটা প্রতিষ্ঠান করে দেন।

পরে স্যার উপজেলার নানা বিত্তবানদের কাছে স্কুল প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সাহায্যের বার্তা পাঠালেন। সাথে সাথে বিত্তবানরা ইট, সিমেন্ট, বাঁশ, কাঠ, টিন নিয়ে এগিয়ে আসেন। আর শ্রমিক হিসাবে কাজ করি আমরা গ্রামের নারী পুরুষ শিশু কিশোর এমনকি ৭০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত। মাসের মধ্যেই উঠে দাঁড়াল গ্রামবাসীর স্বপ্নের স্কুল ঘরটি।
উদ্বোধন করতে আসেন চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিসি মিসবাহ উদ্দীন। গ্রামবাসির স্বতঃস্ফূর্ততায় তিনি স্কুলের জন্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দেন।

পরবর্তীতে ২০১৯ সালে স্কুলটি সরকারের তালিকাভুক্ত হয় এবং সরকার থেকে ছোট্ট একটি দালান ঘর দেয়া হয়। প্রায় ১ একর ১৩ শতক জুড়ে স্কুলের আঙিনা। কিন্তু আঙিনার চারপাশে তেমন কোন সীমানা প্রাচীর না থাকায় স্কুলটি অরক্ষিত থাকছে। সরজমিনে গিয়ে কয়েকজন গ্রামবাসীর সাথে কথা বলা হয়। তারা সবাই বিপুল আগ্রহ করে বলছে আমরা একটা হাইস্কুল চাই। এই প্রাইমারি স্কুলটি হওয়ার কারণে আমাদের সন্তানেরা কলম ধরা শিখছে। এখন একটা হাইস্কুল হলে আমাদের সন্তানেরা মেট্রিক পাসও করতে পারবে। গ্রামের চেহারা পাল্টে যাবে। প্রান্তিক অঞ্চলে সবার সহযোগিতায় কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড়াতে পারে এটার অন্যতম উদাহরণ কুল পাগলি স্কুলটি।

গ্রামের একজন বৃদ্ধা যিনি স্কুল প্রতিষ্ঠায় শ্রম দিয়েছিলে তিনি বলেন, আমাদের শ্রম ও ঘামের ফসল স্কুলটি। আমরা স্কুলের জন্য সকাল সকাল কাজে লেগে যেতাম। আমরা কাজ শুরু করার আগে বড় স্যার ( তৎকালীন ইউএনও ফিজনূর রহমান) আমাদের জন্য কলা, পাউরুটি নিয়ে হাজির হতেন। আমরা তো বাবা ‘অন্ধ’। তিনি আলো দেখিয়েছেন বলেই আমরা আমাদের গ্রামে স্কুল পেয়েছি। (সাক্ষাৎকারটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নেওয়া)
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিদারুল ইসলাম বলেন, এই করোনাকালে আমরা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়িয়েছি। করোনার আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করেছি। এখন গ্রামের সব ছেলে মেয়ে স্কুলে পড়ে। ভবিষ্যতে হাইস্কুল ও স্কুলের বাউন্ডারিটা হয়ে গেলে আমাদের খুব ভাল হবে।

তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ফিজনূর রহমান বলেন, নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে ছিল কুলপাগলি গ্রাম, প্রথম যখন গ্রামটিতে সফর করি তখন আমার অনুভূতি এই রকমই ছিল। কিভাবে এই অন্ধকার দূর করা যায় সেই চিন্তা শুরু করলাম। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষ পাহাড়ে বসবাস করছে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের ছেলেমেয়ে। ঝি ঝি ডাকা অন্ধকারে গ্রামের সকল মানুষ নিয়ে সভা করলাম। সিদ্ধান্ত হলো কুলপাগলি গ্রামে একটি স্কুল গড়ার। সমস্যা হলো বিদ্যালয়ের নাম কি হবে। টাকা পয়সা কিভাবে পাওয়া যাবে। উপস্থিত সকলেই প্রস্তাব করে আমার নামে স্কুল করবে। আমি বেকে বসলাম। তাদের বুঝালাম, স্কুলের নাম হবে কুলপাগলি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখন থেকে ৫০ বছর পরে আমেরিকায় বসে কোন ছাত্র যেন বলতে পারে, আমি কুলপাগলি প্রাথমিক বিদ্যালযের ছাত্র ছিলাম। কুলপাগলি গ্রামের নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক এই ভাবনা থেকে গ্রামের নামে নামকরন করি।  গ্রামের সকলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে, কেউ মাটি কেটেছে, কেউ কাঠ দিয়েছে, কেউ ফুল গাছের চারা লাগিয়েছে। স্বেচ্ছা শ্রমে এলাকার মানুষের ঘামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English