Sunday, August 14, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামপদ্মা সেতু কি বিএনপির জন্য আনন্দময় কিছু নয়?

পদ্মা সেতু কি বিএনপির জন্য আনন্দময় কিছু নয়?

সম্প্রতি আমার কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ক্র্যাশ করেছে। অনেক অভিজ্ঞদের কাছে পাঠিয়েও ফাইল উদ্ধার করতে পারিনি। এখানে আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ছিল। তার মধ্যে ছিল গত প্রায় পঁচিশ বছরে পত্রিকায় প্রকাশিত আমার অধিকাংশ কলাম। অগত্যা, গুগল ড্রাইভ ও বিভিন্ন পেনড্রাইভ ঘেঁটে কিছু লেখা উদ্ধার করতে পেরেছি। তাতে দেখেছি, গত বিশ বছরে বিভিন্ন সময় বিএনপির দুর্গত দশা নিয়ে আমার অনেক লেখা প্রকাশ পেয়েছিল। সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে বিএনপি নেতাদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কথা, যা বিএনপি দলটিকে মাঝে মধ্যেই ব্যাকফুটে ফেলে দিত। আবার দেখা গেছে, একই ভুল বিএনপি বারবার করেছে। অনেক লেখায় এমন কথা রয়েছে, দলের প্রতি অনুগত দেশজুড়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী রয়েছেন, কিন্তু সেই শক্তি কাজে লাগাতে পারছেন না অদূরদর্শী নেতারা। দলটি জনসমর্থনের শক্তিকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বদলে বারবার অন্ধকার পথে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করেছে। অবশ্য এসবই আমার অনুভব। বিজ্ঞ রাজনীতিকরা এসব লেখা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন মনে করেন না। তারা তাদের পথেই হাঁটেন। আর আমরা আমাদের উপলব্ধি থেকে দায়িত্ব পালন করতে থাকি।

পদ্মা সেতু নিয়ে পূর্বাপর বিএনপি নেতাদের ভাষ্য-মন্তব্য দেখা ও শোনার চেষ্টা করেছি। তাতে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের মনোভাব প্রকাশ পায়নি। এতে আওয়ামী লীগের কতটা ক্ষতি বা লাভ হয়েছে, দেশের মানুষের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে আর বিএনপি দল হিসাবে কতটা অর্জন করল বা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করল, পদ্মা সেতু উদ্বোধন ও বাস্তবায়নের পর সব প্রশ্নেরই সহজ সমাধান মানুষের সামনে চলে এসেছে।

বাংলাদেশে দুদকের তদন্ত ও কানাডার আদালত দুর্নীতির অভিযোগের পক্ষে কোনো তথ্য পায়নি। শুধু কাল্পনিক নয়, দুর্নীতির অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক ছিল বলে অনেকে মনে করেন। কানাডার আদালত শেষ পর্যন্ত মামলা খারিজ করে দেন। রায়ের আগ পর্যন্ত বিএনপি নেতারা পদ্মা সেতু নিয়ে অতি আগ্রহে মহাউল্লাসে আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত দুর্নীতির কথা প্রচার করতে থাকেন। তখনকার বিএনপি নেতাদের আচরণে মনে হয়েছে, পদ্মা সেতু হলো, কী না হলো, এ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। আওয়ামী সরকারকে দুর্নীতির অভিযোগে ‘ধরাশায়ী’ করতে পেরেছে এটিই আনন্দ। এ দেশের মানুষ, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। বিশ্বব্যাংকসহ দাতা দেশ বা প্রতিষ্ঠান প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর অর্থ জোগান থেকে সরে যাওয়ায় দেশবাসী যখন হতাশায় ডুবে যায়, তখন মনে হচ্ছিল বিএনপি নেতারা বিজয়ের আনন্দে আছেন।

এখানে বিএনপি নেতারা একটি বড় অদূরদর্শিতা দেখিয়েছেন-এ কথা বলতেই হবে। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারেননি। অন্যায় অভিযোগ চাপিয়ে দিলে তিনি যে তা হজম করার পাত্রী নন তা ভাবা উচিত ছিল। সরকারপ্রধান যেহেতু জানেন কোনো দুর্নীতি হয়নি, তাই তিনি পুরো বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসাবে নেন। শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশিত হয়।

পদ্মা সেতু নিয়ে দেশের স্বপ্নচারী মানুষ ইতোমধ্যে সন্দেহজনক আচরণের কারণে বিএনপিকে পদ্মা সেতুর ভিলেন ভাবতে শুরু করেছে। এ বাস্তবতাটি বিএনপি নেতাদের বোঝা উচিত ছিল; কিন্তু মুশকিল হলো, এরপর বিএনপি নেতারা নিজেদের সংশোধন না করে এমন বাণী-বক্তব্য দেওয়া শুরু করলেন, যাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা সেতু বানাতে ব্যর্থ হোক, এটিই তাদের একমাত্র কাম্য। এতে যে সত্য বেরিয়ে আসে, তা হচ্ছে দেশ কল্যাণের চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়টাই যেন বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। বিএনপি নেতাদের মনোভাব ছিল এমন যে, আওয়ামী লীগ সরকার যদি সফলভাবে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাবে আর অনেকটা পিছিয়ে পড়বে বিএনপি। জনগণের শক্তির ওপর আস্থাশীল না থাকলে এ ধরনের দুর্মতি হয়। দেশজুড়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ দুর্বল নেতৃত্ব গণশক্তির ওপর ভরসা করতে পারেনি কখনো। তাই দলটির বিভ্রান্ত দশা দেখতে হয়েছে বারবার। যে কারণে হারানো রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য দলটির নেতারা সুযোগ পেলেই অন্ধকার পথে হাঁটতে চেয়েছেন। যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীর উগ্র রাজনীতি কাজে লাগিয়ে কখনো ক্ষমতায় আসতে চেষ্টা করেছেন। কখনো হেফাজতে ইসলামীর উগ্রতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন।

বিএনপি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুতে প্রথম সংকটে পড়ে। তারপর আঁকড়ে ধরে এগোতে চেয়েছে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে ঘিরে। তারেক রহমান আইনের ভাষায় পলাতক আর কোমল শব্দে লন্ডনপ্রবাসী। মনে হয় না দণ্ডাদেশ ঘাড়ে রেখে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশে ফিরবেন তিনি।

যত বিরোধিতা আর সমালোচনাই হোক, পদ্মা সেতু এখন বাস্তব। এ সেতু বাস্তবায়ন করায় শেখ হাসিনা জনগণের চোখে অনেক উচ্চতায় উঠে গেছেন। নির্বাচনে এর বড় রকমের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। নেতিবাচক রাজনীতির কারণে ততটাই ব্যাকফুটে যাবে বিএনপি। ফলে ছোটখাটো রাজনৈতিক দল, যারা আওয়ামী লীগে সুবিধা করতে না পেরে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে, তারা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। তেমনটি হলে তারেক রহমানের দেশে ফেরাটা অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। দেশের ভেতরে আছেন বেগম খালেদা জিয়া। বয়স হয়েছে বেগম জিয়ার। চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি তুলে বিএনপি নেতারা তাকে মুমূর্ষুই বলতে চান। আমরা প্রার্থনা করি, তিনি আরও অনেক বছর সুস্থতার সঙ্গে বেঁচে থাকুন। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা প্রলম্বিত হলে এবং কখনো বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসতে পারে, ততক্ষণে বেগম জিয়ার বয়স আরও বেড়ে যাবে। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি যদি ক্ষমতা গ্রহণ না করতে পারেন, তাহলে বিএনপির দশা কী হবে! রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সূত্রে তারেক রহমানের স্ত্রী ও কন্যা তেমন প্রভাব রাখতে পারবেন বলে মনে হয় না। স্ত্রীর নামেও মামলা রয়েছে। আর সব নেতা তো বিএনপির আদর্শের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেননি। অধিকাংশই নানা দল থেকে এসে বিএনপির পোশাক গায়ে জড়িয়েছেন। পারিবারিক রাজনীতির সূত্রে তারা কেউই বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিকল্প নন। তেমন প্রভাব তারা কেউ বিএনপিতে রাখতে পারেননি।

এমন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েই সম্ভবত পদ্মা সেতু প্রশ্নে বিএনপি নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে না। বিএনপি নেতারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন আওয়ামী লীগকে অনেক শক্ত অবস্থানে এনে দিয়েছে; যা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তাদের। যে কারণে আবার ভুলের আবর্তে নিজেদের আটকে ফেলছে। তাই পদ্মা সেতু উদ্বোধন সামনে রেখে দেশবাসী যখন আনন্দে উদ্বেল, যখন বিশ্বের অনেক দেশ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছে, যখন বিশ্বের নানা দেশের প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের কৃতিত্বকে অভিনন্দিত করছে, তখন অন্তত রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে হলেও বিএনপি নেতারা পদ্মা সেতু নির্মাণকে স্বাগত জানাতে পারতেন। তারা কতটা সুস্থ রাজনীতিবিচ্ছিন্ন যে, পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি দাওয়াতকে গ্রহণই করলেন না। উপরন্তু টেলিভিশনে বিএনপি মহাসচিব দাওয়াত গ্রহণ না করার কারণ যেভাবে ব্যাখা করলেন, তা নিুমানের ঝগড়ার মতোই শোনালো। অথবা বিধ্বস্ত বিএনপির চেহারাটাই যেন ভেসে উঠল। একইরকম রাজনৈতিক আরেকটি ভুলের কথা মনে পড়ল। বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকো মারা গেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানাতে বেগম জিয়ার বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমাদের মনে হচ্ছে, এ দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলে হেরে গেছেন বিএনপি নেতারা।

আমরা যদি বিএনপির অন্তত দুই দশকের রাজনীতি পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব ভুল রাজনীতির কারণে বারবার দলটি পথ হারিয়েছে। যদি রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন না করে বিএনপি কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে থাকে, তবে রাজনীতির স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। আর যদি পুরোনো দুর্মতি মাথায় আসে যে, দেশীয় বা আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ষড়যন্ত্রের পথে গণেশ উলটে দিয়ে ক্ষমতায় আসবে বিএনপি, তবে তা বর্তমান বাস্তবতায় অলীক কল্পনা বলেই মনে হবে। কারণ নানা ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা অনেক সতর্ক এখন। কীভাবে ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করে সব ছিদ্রপথ বন্ধ করা যায়, সেসব পথঘাট আওয়ামী লীগ নেতাদের ভালোই জানা আছে।

বিএনপি নামের দলটিকে টিকে থাকতে হলে ‘রাত পোহালেই’ ক্ষমতায় পৌঁছতে পারব এমন অনেকটা অবাস্তব চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এতে অবশ্য অস্থিরতা প্রকাশ করতে পারেন তারেক রহমান। তাতে আবার ভুলের গলিতে হাঁটতে গিয়ে নতুন করে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনাই বাড়বে। এখনো দেশজুড়ে বিএনপি-অন্তপ্রাণ অনেক নেতাকর্মী-সমর্থক আছেন। তাদের সংগঠিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দেশব্যাপী সংগঠনকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। ইতিবাচক রাজনীতির পথে হেঁটে দলটিকে জননন্দিত করে তুলতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের ভুল খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনগণের সমর্থন আদায় হবে বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য। একইসঙ্গে বিএনপির ভেতর থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। আমরা মনে করি, সুস্থ রাজনীতির ধারায় গণতান্ত্রিক আচরণের মধ্য দিয়েই ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি করতে হবে বিএনপিকে। এর জন্য প্রয়োজন সময়, ধৈর্য ও দূরদর্শিতা।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments