Sunday, March 3, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামনৈতিক শিক্ষার অভাবে সৃষ্টি হচ্ছে কিশোর গ্যাং

নৈতিক শিক্ষার অভাবে সৃষ্টি হচ্ছে কিশোর গ্যাং

শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণ করার মধ্যবর্তী সময়কে কিশোরকাল বলা হয়। কোনো কোনো গবেষক ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী একজন মানুষকে কিশোর বলে উল্লেখ করেছেন। এ সময় ছেলেমেয়েদের শরীর ও মনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। জীবন ও জগত সম্পর্কে তাদের মনে সৃষ্টি হয় নানা কৌতূহল, অজানাকে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। স্বাধীনভাবে চলাফেরার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। আপনজনদের কাছ থেকে স্নেহ, আদর ও যত্ন পাবার তীব্র আকাক্সক্ষা জন্ম নেয়। তারা এ সময় বড়দের মতো আচরণ করতে চেষ্টা করে। নিজেকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রকাশ করতে অস্থির হয়ে ওঠে। নিজেদের মতামতকে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যকুল হয়ে পড়ে। তারা খুব সহজেই আবেগতাড়িত হয়ে যায়। বীরত্ব ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাদের আগ্রহ বেড়ে যায়। আশপাশের মানুষ হঠাৎ করেই তাদের নিয়ে বড় ভাবতে শুরু করে। তারা যদি বড়দের মতো আচরণ করে তাহলে মুরুব্বিরা সেটা ভালোভাবে নেন না, বরং পাকামি বলে মনে করেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। তাহার মুখে আধো আধো কথাও ন্যাকামি। পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথা মাত্রই প্রগলভতা।’ এতসব কারণে এ সময় কিশোর-কিশোরীরা নানান পরিস্থিতির শিকার হয়। সমাজের আশপাশের মানুষ তাদের কাছ থেকে একেবারেই বালক-বালিকার মতো আচরণ কামনা করে। আবার অনেক সময় পরিপক্ক আচরণের প্রত্যাশা করে। এমতাবস্থায় কিশোর-কিশোরীদের মনে বড়ো ধরনের মানসিক চাপ অনুভূত হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে পরিচিত না থাকায় তারা অনেকটা বিরক্ত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের অনেকের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে নিজেদের অপরাধী ভাবে। ফলে তাদের মধ্যে সমাজ থেকে দূরে থাকার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। এককথায়, কিশোর-কিশোরীরা এ সময় এক অজানা-অপরিচিত অধ্যায়ে প্রবেশ করে। সঠিক গাইডলাইন না পেলে এ সময় তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় একজন কিশোর-কিশোরীর অপরিচিত বন্ধু বেড়ে যায়। তাদের তারা আপন ভাবতে শুরু করে। এসব বন্ধু-বান্ধব তাদের কাছে অতি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা অনেক সময় বন্ধু নির্বাচন করতে ভুল করে বসে। তাই এ সময়ে তাদের সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন হয় ভালো বন্ধু ও অভিভাবক। এক্ষেত্রে তাদের জন্য বাবা-মা ও ভাই-বোনের সংস্পর্শ একান্ত প্রয়োজন। শরীর ও মনের উপর পরিবর্তিত অবস্থায় তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বড়দের সাহায্য ও পরামর্শ। এর মাধ্যমে তাদের মনোজগতে স্বাভাবিকভাবে এ পরিবর্তনগুলো তখন মেনে নেয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। যেহেতু এ সময় একজন কিশোর-কিশোরীর আবেগ কাজ করে, অভিবাবকদের তাই এ সময় সতর্ক থাকা উচিত। বাবা-মা’র উচিত তাদেরকে ভালো সঙ্গ দেয়া। তাদের ভালো ভালো বই উপহার দেয়া। অভিভাবকদের উচিত তাদের সামনে ধর্মীয়, সামাজিক ও বিশ্বের বিখ্যাত মনীষীদের জীবনী পাঠ করা। তাদের আরো উচিত সন্তানদের খেলাধুলা ও ব্যায়ামের চর্চায় অধিকতর গুরুত্ব দেয়া।

এ লেখা যখন লিখছি তখন বয়স আমার ৫০ ছুঁই ছুঁই। মনে পড়ে যায়, আশির দশকের কথা। শীতের সকালে খেজুরের পাটি বগলদাবা করে দলবেঁধে আমরা ছুটে যেতাম পাশের গ্রামের মক্তবে। পরনে থাকতো পাজামা-পাঞ্জাবি, মাথায় থাকতো টুপি। হাতে থাকতো পুরাতন পরিষ্কার কাপড়ে মোড়ানো আমপারা। শিশিরভেজা সকালে, কুয়াশাঢাকা ভোরে গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে চলতাম মক্তবে। নানান গ্রামের ছেলে মেয়েরা একসাথে বসে চর্চা করতাম আমপারা। সূরা, কিরাত, গজল আর আজানের প্রাকটিস হতো একত্রে সুর করে। একজন বলে দিতো আর বাকি সবাই একসঙ্গে ছন্দে-ছন্দে, মনের আনন্দে সুর মিলাতাম! এভাবে পেরিয়ে যেতো এক থেকে দুই ঘণ্টা। অতঃপর দলবেঁধে আবার ফিরতাম বাড়িতে। কিছু খেয়ে বন্ধুদের সাথে আবার যেতাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ক্লাস শুরুর আগে দলবেঁধে মাঠে চলতো খেলাধুলা। গোল্লাছুট এবং দাড়িয়াবান্ধা খেলার কথা আজও খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের কথা। পাঠ্যবইটির নাম ছিল ‘দ্বিতীয় ভাগ’। বইটির কথাগুলো ছিল এমন: ‘সদা সত্য বলিবে, মিথ্যা বলিবে না। বড়দের সম্মান করিবে। ছোটদের স্নেহ করিবে। চুরি করিবে না। চুরি করা বড় দোষ। পরের দ্রব্য না বলিয়া হাত দেয়াকে চুরি করা বলে’ ইত্যাদি। কিশোরকালের সেসব ঘটনা আজ সবই যেনো স্মৃতি! পাঠ্যবইয়ে এসব নীতিবাক্যও আজ শুধু ইতিহাস। সময়ের ব্যবধানে সবকিছুই যেন হারিয়ে গেছে। বলতে গেলে আজ গ্রাম থেকে মক্তব শিক্ষার বিলুপ্তি ঘটেছে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শিশু-কিশোররা এখন আর মক্তবে যায় না। এক বস্তা বই কাঁধে নিয়ে আজকের শিশুদের গন্তব্য কেজি আর নার্সারিতে। প্রাথমিক আর মাধ্যমিকে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে ছোটবেলার সেই ধর্মীয় শিক্ষা। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার জায়গা এখন দখল করেছে ড্রয়িং, রাইটিং, সুর-সঙ্গীত, নাচ-গান ইত্যাদি। নীতিবাক্যের জায়গায় টেক্সটবুকে এখন স্থান পেয়েছে অর্থহীন আগডুম, বাগডুম আর ঘোড়াডুম। বর্তমান দিন ও পরিবেশ আর আগের মতো নেই। সব কিছুতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ছোট্ট মেঠোপথ এখন প্রশস্ত কার্পেটের রাস্তায় পরিণত হয়েছে। গ্রামগুলো শহরের ধাঁচে গড়ে উঠছে। সময় ও যুগ এখন ডিজিটাল নাম ধারণ করেছে। গত ২০ বছরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। মানুষ স্থল ও জলভাগ শাসন ও দখল অব্যাহত রেখেছে। মহাকাশযান তৈরিপূর্বক মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে। সামাজিক অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। এতসবের মাঝেও মানুষ শান্তি ও স্বস্তি পেতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মাঝে সবসময় মারাত্মক এক অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশ্ববাসীর মাঝ থেকে আত্মিক প্রশান্তি দূরীভূত হয়ে গেছে। ফলে সকলের মাঝে এক অনৈতিক অস্বস্তি ও অস্থিরতা কাজ করছে। সংশ্লিষ্টগণের মতে, সামগ্রিকভাবে নৈতিক শিক্ষার অভাবই এই অস্থিরতার মূল কারণ। সকল অস্বস্তির মূলে রয়েছে ধর্মীয় শিক্ষার সংকট। আর এ কারণেই সমাজের সর্বস্তরে অনাচার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে দেশের শিশু-কিশোররা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। নিত্য নতুন অপরাধ বাড়ছে ও দিন দিন তার ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। এসব শিশু-কিশোর কখনো একা আবার কখনো সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ ঘটাচ্ছে। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে দল গড়ে তুলছে। আর ঐ দলের অধীনে তারা নিজেদের সঙ্ঘবদ্ধ করছে। তারা এই সংঘবদ্ধ শক্তিকে পুঁজি করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। তাদের দৌরাত্ম্যে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আতঙ্কিত জনগণ তাদের কর্মকাণ্ডকে গ্যাং কালচার নামে অভিহিত করছে। দেশে দিনে দিনে এ গ্যাং কালচার শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাতেই এদের ৮০টি গ্রুপ সরাসরি মানব বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সমাজবিধ্বংসী কাজে জড়িত গ্রুপগুলোর নাম বড়ই অদ্ভুত ধরনের। বিগ বস গ্রুপ, নাইন স্টার গ্রুপ, ডিসকো গ্রুপ, ০০৭ গ্রুপ, ভাইব্বা ল কিঙ গ্রুপ ইত্যাদি হলো তাদের গঠিত গ্রুপগুলোর নাম। এ দেশে প্রথম গ্যাং কালচারের সংবাদ প্রকাশ পায় ২০০২ সালে। উত্তরায় আদনান নামের একটি ছেলেকে খুন করার মাধ্যমে আলোচনায় আসে গ্যাং কালচারের নানা গ্রুপ। এসব গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এরা নানা স্টাইলে সজ্জিত হয়ে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায়। এদের চুলের ডিজাইন ও পোশাক-পরিচ্ছদ বড়ো জিকজ্যাক টাইপের। তাদের চিন্তা-ভাবনা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রকম। এদের অধিকাংশই ধূমপায়ী ও মাদকাসক্ত। এরা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণসহ নানা অপকর্মের সাথেও জড়িত।

আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা প্রদানকারীদের হুজুর বলা হয়ে থাকে। হুজুর শব্দটি অত্যন্ত সম্মানসূচক অর্থ প্রকাশ করে। কিন্তুবর্তমানে শব্দটি অনেকাংশে হেয় অর্থে ব্যবহৃত হয়। কারণ, হুজুরগণ খুবই সাদাসিধে জীবন যাপন করে থাকেন। নিজ নিজ এলাকায় তারা শান্তশিষ্ট এবং সজ্জন হিসেবে পরিচিত। তারা কখনও ধূমপান করেন না। মদ গাঁজার সাথে তাদের কোনো পরিচয়ই নেই। ফলে তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়া কিশোর-কিশোরীগণ ধূমপায়ী হয় না। চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে পাঠদানকারী সম্মানিত হুজুরদের কথা মনে পড়লে তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। কৃতজ্ঞতার অশ্রু হৃদয়কে আজও বিগলিত করে। বর্তমানে তারা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বহীন একটি অংশে পরিণত হয়েছেন। প্রগতিশীল সম্মানিত শিক্ষকদের বিপরীতে তাদের অবস্থান তলানিতে পৌঁছেছে। সুর-সংগীত আর নাচ গানের শিক্ষকগণ নিজেদের প্রগতিশীল মনে করেন। তাদের অনেকে কিশোর শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ্যে ধূমপান করেন। অনেকে আবার শুধু ধূমপানেই সীমাবদ্ধ থাকেন না। উচ্চবিত্ত ও সম্ভ্রান্ত প্রগতিশীল সমাজে মাদক সেবন এখন ওপেন সিক্রেট। এসব সম্মানিত শিক্ষক থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সহজেই ধূমপানের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। এসব প্রতিষ্ঠানের তরুণ-তরুণীরা প্রকাশ্যে সিগারেট খেতে দ্বিধা করে না। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর একসঙ্গে ধূমপান করার ঘটনাও বিরল নয়। এ জাতীয় দৃশ্য সমাজের চরম নৈতিক স্খলন বলে অভিভাবক মহল মনে করে। এ ধূমপান এক সময় শিক্ষার্থীদের মাদক সেবনে উদ্বুদ্ধ করে। মাদক সেবনের অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, স্কুল-কলেজেও গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবা হানা দিয়েছে। আজ থেকে ২০ বছর আগের কথা। এ দেশের দামাল ছেলেরা স্থানীয় খোলামাঠে দলবেঁধে খেলা করতো। গ্রামের ছেলেরা পরিষ্কার ধান ক্ষেত কিংবা ছনের জমিতে খেলাধুলায় মেতে উঠতো। দুষ্টু ও শান্ত, সকলেই এ খেলায় অংশগ্রহণ করতো। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা খেলার ফাঁকে কিংবা আগে-পরে দিকবিদিক ঢিল ছুড়তো। শান্ত জলে তারা ঢিল ছুড়ে পানির ঢেউ গুনতো। বিভিন্ন বাড়ির ঘরের উপরে অবস্থিত পাকা জামরুল ও আম গাছে ঢিল ছুড়তো। তাদের দুষ্টামিতে বিরক্ত হয়ে অনেক মুরুব্বি তাদের শাসন করতো। মুরুব্বিদের এ শাসনে তাদের দুষ্টামি ক্ষান্ত হতো। বর্ষার দিনে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা মাছ ধরতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তো। ঝড়ের বিকেলে তারা আম কুড়াতেও ঘর থেকে বেরিয়ে আসতো।

মফস্বল শহরের ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে ফুটবল টিম গঠন করতো। কাবাডি টিমের জন্য সদস্য খুঁজতে তারা বাড়ি বাড়ি গমন করতো। নাটক, থিয়েটার ও পাঠাগার গঠন করতো। আর আজ গ্রাম ও শহর-সবখানে একই রকম পরিবেশ বিরাজ করছে। আজকের গ্রামটিও শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। শহরের মতো গ্রামেও ডিশ এন্টিনার জাল বিস্তৃত হয়েছে। গ্রামের শান্ত পুকুরটি আজ ভরাট হয়ে গেছে। শহরের খেলার মাঠটি ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবারে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস করেও পরস্পর অপরিচিত রয়ে গেছে। আধুনিক যুগে জিডিপি প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাপকভাবে লিঙ্গ সমতাকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পিতার ন্যায় মাতাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বাবা যখন অফিসে, মাও তখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যাংকে। সন্তানের দেখভাল করছেন কাজের বুয়া অথবা অন্য কেউ। সন্তানদের কোয়ালিটি সময় দিতে বাবা-মা ব্যর্থ হচ্ছেন। সময় দেয়ার পরিবর্তে বাবা-মা সন্তানের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করছেন। বয়সভেদে খেলনা, নগদ অর্থ, বাইক, মোবাইল ইত্যাদি সকল আবদার পূরণ করছেন। ডিজিটাল মোবাইলের আশীর্বাদে তারা পাবজিসহ নানা গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। খেলাধুলা, নাটক, সিনেমা ও সংস্কৃতি চর্চা তারা ভুলে গেছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা বাদ দিয়ে তারা গড়ে তুলেছে নাইন স্টারের মতো নানা গ্রুপ। এভাবে তারা গ্যাং তৈরি করেছে। দল বড়ো করছে ও দলনেতা নির্বাচিত হয়েছে। এর পর দেখা যায়, তারা বিনা কারণে জোরে হর্ন বাজায়, রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে, এলাকা দখল করে। চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, ছিনতাই ইত্যাদি করতে মজা পায়। তাদের আদর, সোহাগ, শাসন-তিরস্কার করার কেউ নেই। আগেকার মুরুব্বিদের শাসন এখন শুধুই স্মৃতি।

সেকালের মুরব্বিদের সাথে একালের মুরুব্বিদের যোজন যোজন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সেকালের প্রত্যেকটা মুরব্বি ছিলেন মূল্যবোধের শিক্ষক। আর একালের মুরুব্বিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে দেয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে। বর্তমান কালের মুরুব্বিরা তাদের মাদক চোরাচালান, কারবারেও ব্যবহার করে থাকে, কেউ কেউ কিশোরদের দিয়ে হল দখল ও এলাকা দখলের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। আর এসব দখলদারিত্বে কিশোরদের হাতে মুরুব্বিরা নানা ধরনের অস্ত্র তুলে দেন। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, একটা ভঙ্গুর সমাজে বাড়ন্ত শিশুরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। তারা সমাজে বিরাজমান আদর্শ ও মূল্যবোধ বুঝে উঠতে পারে না। যে সমাজ শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু সংস্কৃতির সন্ধান দিতে পারে না, সে সমাজে এ জাতীয় কিশোর গ্যাং তৈরি হয়। তারা যখন দেখতে পায়, একজন কুখ্যাত মাদক সম্রাট দেশের মসনদে সমাসীন। তারা যখন দেখতে পায় লুটেরা দেশের পরিচালক; আর ক্যাসিনো কারবারিরা ক্ষমতার মসনদে আসীন। তখন তারা তাদের মতো ক্ষমতাশালী হবার রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে। সর্বপ্রথম তারা লুটেরাদের ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দিন শেষে তারা নিজেদের ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই পায় না। অবশেষে এই কিছু না পাওয়ার হতাশায় তারা নিষ্ঠুর পথে অগ্রসর হয়। তখন তারা তাদের মতো করে কালচার তৈরি করে নেয়। সমাজবিজ্ঞানী ট্রাভিস হিরশি বলেন: সামাজিক সকল বন্ধন যখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় কিংবা ভেঙ্গে পড়ে, তখন এ জাতীয় কিশোর গ্যাং তৈরি হয়। আর সমস্যাও প্রকট থেকে প্রকট আকার ধারণ করে। সুতরাং আর দেরি না করে শিশু-কিশোরদের বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসা দরকার। এক্ষেত্রে বাংলার সেই প্রাচীন বন্ধন ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি গ্রামে মক্তব শিক্ষার প্রচলন করা দরকার। স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে পাবলিক পরীক্ষায় ইসলামী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা অপরিহার্য। এছাড়া প্রতিটি এলাকায় সুষ্ঠু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা দরকার। ভূমিদস্যুদের খপ্পর থেকে খেলার মাঠগুলো মুক্ত করা দরকার। শিশু-কিশোরদের নিয়মিত খেলাধুলার অভ্যাস তৈরি করা উচিত। সর্বোপরি সামাজিক ঐকতান সৃষ্টির মাধ্যমে গভীর মমতায় তাদের আগলে রাখা দরকার। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের আশু উদ্যোগ গ্রহণ অতিব জরুরি। অন্যথায় এ কিশোর গ্যাং আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। মনে রাখা দরকার, এ কিশোররাই দেশ গড়ার ভবিষ্যৎ। এ ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাওয়া মানে দেশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। দেশপ্রেমিক জনতার এ ধ্বংস মেনে নেয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
লেখক: অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments