Friday, April 19, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামনির্মোহ তদন্ত করতে হবে

নির্মোহ তদন্ত করতে হবে

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশ দাবী করেছে। গত বুধবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানায়, আর্থিক চাপ, ধারাবাহিকভঅবে পরীক্ষার খারাপ ফল, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় স্পেনে যেতে টাকা সংগ্রহ করতে না পারা ইত্যাদি কারণে তার মধ্যে হতাশা ছিল এবং এসব কারণে ফরদিন আত্মহত্যা করেছে। একই দিনে র‌্যাব সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, ফরদিন আত্মহত্যা করেছে। ডিবি ও র‌্যাবের বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ফারদিনের বাবা। তিনি বলেছেন, তাদের বক্তব্যে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমি নির্বাক। বলার অপেক্ষা রাখে না, ফারদিনের মৃত্যু নিয়ে বিগত কয়েক দিন ধরে নানারকম কথাবার্তা বলা হচ্ছে। ডিবি ও র‌্যাবের বক্তব্যেও ভিন্নতা ছিল। ফারদিনের মৃত্যু নিয়ে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ডিবি কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক শেষে বলেছে, তদন্তের কিছু কিছু জায়গায় গ্যাপ আছে, কিছু অস্পষ্টতা আছে। এগুলো আরও পরিস্কার হওয়া দরকার। উল্লেখ্য, গত ৪ নভেম্বর বুয়েট ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা বলে ডেমরার কোনাপাড়ার বাসা থেকে ফারদিন বের হয়। ৭ নভেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এ ঘটনায় ফারদিনের বাবার করা মামলার একমাত্র আসামী বন্ধু আয়াতুল্লাহ বুশরা কারাগারে আছে।

আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বা অন্যকোনো সংস্থার তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে বরাবরই একধরনের সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। বিশেষ করে আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও ঘটনার তদন্তের ক্ষেত্রে এ সন্দেহ বেশি ঘনীভূত হয়। ইতোমধ্যে আলোচিত যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেগুলোর তদন্ত নিয়ে আত্মীয়-স্বজন, সচেতন মহলসহ জনমনে একধরনের আস্থাহীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত তদন্ত আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। বারবার পিছিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের তকি হত্যাকাণ্ডের তদন্তও অনেকটা অসম্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। এমন আরও আলোচিত ঘটনার তদন্ত ঝুলে রয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট দিলেও সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তদন্তের নামে প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার নজিরও রয়েছে। আমরা দেখেছি, তদন্তকে ঘুরিয়ে দিতে ‘জজ মিয়া’ নামক নাটকও করা হয়েছে। শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রেও তদন্তের অসম্পূর্ণতা কিংবা যথাযথ হওয়ার অভিযোগ থাকে। দেশে দীর্ঘসময় ধরে গুম ও অপহরণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া নিয়ে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও নানা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা তাকিদও দিয়েছে। সর্বশেষ বুয়েটের ছাত্র ফারদিনের মৃত্যুর তদন্তের বিষয়টি এর সাথে যুক্ত হয়েছে। তার বাবা স্পষ্ট করেই বলেছেন, তার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না। বলা বাহুল্য, বাবা-মায়ের চেয়ে সন্তানের আচার-আচরণ ও বৈশিষ্ট্য অন্য কারো পক্ষে যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব নয়। ফারদিনের বাবাও তার সন্তানকে ভালভাবেই জানেন। ফলে তার ছেলে আত্মহত্যা করেছে কিনা এ নিয়ে তার সন্দেহ পোষণ অমূলক নয়। সচেতন মহলও মনে করছে, ফারদিনের মতো একজন মেধাবী ও সচেতন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে, এমন ধারণা পোষণ করা কঠিন। তার সহপাঠীরাও একই মত পোষণ করেছে। তারা পুলিশের তদন্তে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাদের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। এ সন্দেহ দূর করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অধিকতর তদন্ত করা প্রয়োজন। হত্যাকাণ্ড বা অপরাধমূলক ঘটনা নিয়ে এ ধরনের সন্দেহ ও প্রশ্ন থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং পুনরায় অপরাধ করতে দ্বিধা করে না।

আমাদের দেশের পুলিশের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। যেকোনো জটিল, দুর্বোধ্য এবং ক্লুলেস অপরাধমূলক ঘটনাও তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত ও আইনের আওতায় নিয়ে আসার মতো অসংখ্য নজির এ বাহিনী সৃষ্টি করেছে। মাঝে মাঝে আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের প্রভাব বিস্তার প্রকৃত তদন্ত এবং তার প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরাধের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী জড়িয়ে থাকলে তদন্ত প্রতিবেদন দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা প্রতিবেদন দেয়ার ক্ষেত্রে সময় ক্ষেপণ করা হয়। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, পুলিশকে যদি প্রভাবমুক্ত রেখে ও নির্মোহভাবে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেয়া হয়, তাহলে সে তা নির্ভুলভাবে করতে সক্ষম। বলার অপেক্ষা রাখে না, যেকোনো তদন্ত নির্ভুল ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে হতে হয়। তদন্তকারীকে নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয় অবগত হয়ে ঘটনার কারণ ও এর সাথে জড়িতদের শনাক্ত ও উদ্ঘাটনে ব্রত হতে হয়। ফারদিন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে তার বাবা ও সহপাঠীদের মধ্যে যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অধিকতর তদন্ত করা উচিৎ। তা নাহলে, প্রকৃত ঘটনা অজানা থেকে যাবে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী হয়ে থাকবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments