Sunday, June 16, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামনির্বাচন রাজনীতি অর্থনীতি : ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ

নির্বাচন রাজনীতি অর্থনীতি : ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ

আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন এখন মূল আলোচ্য বিষয়। এই নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই নানা রকম কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত। প্রতিদিনই মিডিয়ায় নানা রকম খবর আসছে। বিশেষ একটি বড় দল এবং আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল ছাড়া ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে।

নির্বাচন যদিও একদিন হবে; এর আগে প্রচার চলবে। নির্বাচন শেষে ফল অনুযায়ী সরকার গঠন করা হবে।শুধু নির্বাচন হয়ে যাওয়া; এর ফল ঘোষণাই সব কিছু নয়। একটা দেশের আগামী বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, দেশ পরিচালনার অবস্থা, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মানুষের জীবনযাত্রার প্রচেষ্টা—সবই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

অনেকেই হয়তো নির্বাচনটাকে অর্থনীতি বা দেশের সার্বিক অবস্থা এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে আলাদা করে দেখতে চায়। সেটা মোটেও ঠিক নয়। একটা সার্বভৌম দেশের রাজনীতিকে ঘিরেই সব কর্মকাণ্ড আবর্তিত হতে থাকে। এমন পরিপ্রেক্ষিতেই এখন বাংলাদেশ একটা ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে।

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অর্থনীতিতে বাংলাদেশ মোটামুটি একটা সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যদিও এখানে বহুবিধ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আছে। তবু কতগুলো অর্থনৈতিক মাইলস্টোন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নজর কেড়েছে।
নির্বাচন রাজনীতি অর্থনীতি : ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশআমরা এখন যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি, সেটাতে তিনটি জিনিস আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট। প্রথমত, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ নানা রকম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যা এখন আমাদের সামনে আছে।

এবং সেগুলো মোকাবেলা করা আমাদের অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, একটা অনিশ্চয়তা—ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা অনিশ্চয়তা কিন্তু বিরাজ করছে। অনিশ্চয়তা মানে, যেটা সম্ভবত সঠিকভাবে শতভাগ নিশ্চিয়তা দিয়ে কেউ কিছু বলতে পারবে না। তবে কিছুটা সম্যক ধারণা বা আন্দাজ করতে পারবে। তৃতীয়ত হলো শঙ্কা। এই শঙ্কা কিন্তু ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে। কী হতে যাচ্ছে? কী হবে ভবিষ্যতে—সবার মনে হয়তো এই প্রশ্ন আছে, কিন্তু সবাই এটা প্রকাশ করে না। তবে শঙ্কাটা কিন্তু দেখা দিয়েছে। যে চ্যালেঞ্জ এবং অনিশ্চয়তাগুলোর কথা বললাম, সেগুলোর জন্যই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এখনকার এই ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক—এই তিনটি জিনিসের ওপর সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। এবং সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। ক্রান্তিলগ্নে যে ওপরে বিশেষ তিনটি অবস্থার কথা বললাম, সেখানে আমাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কী বলা যেতে পারে! এখন এই অবস্থায় যদি কেউ প্রশ্ন করে, তখন আমরা বলতে পারি যে এখানে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। আছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই দুটি অবিচ্ছেদ্য।
রাজনীতির বাইরে যেমন কোনো কিছুই ভাবা যায় না—এটা সামষ্টিক জীবন হোক, ব্যবসা-বাণিজ্য হোক বা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন হোক—এটা রাজনৈতিক অস্থিরতা। রাজনৈতিক অবস্থা কিন্তু সময়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তেমনিভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা কিন্তু অর্থনৈতিক যে অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা বা অনেক সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা যে বলতে পারি ভঙ্গুরতা—তার ওপর রাজনৈতিক প্রভাবটা পড়বে।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা কিন্তু রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ মানুষ শেষ বিচারে চায় একটা শান্তিময় এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন। চায় জীবনের একটা গুণগত মান বজায় রাখতে। এটা সাংসারিক এবং ব্যক্তিগত জীবনে মানুষের একটা চাহিদা।

অতএব একটা সার্বভৌম দেশে আমরা সাধারণত যেটা এককথায় বলতে পারি, মুজিবনগর সরকারের ঘোষণাপত্রে যেটা ছিল, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি—এই দুটি জিনিস কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এবং পূর্ববর্তী আন্দোলন-সংগ্রামের পেছনে আমাদের সবাইকে উজ্জীবিত করেছে। এখন ৫৩ বছর পরে আমরা আবার নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি—এই দুটি লক্ষ্যবস্তু কি আমরা অর্জন করতে পেরেছি?

মোটাদাগে কতগুলো জিনিস যদি আমরা দেখি, আমাদের প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে, বিশেষ করে গত তিন বা চার দশকের কাছাকাছি সময় ধরে আমরা প্রবৃদ্ধিতে মোটামুটি একটা সন্তোষজনক অবস্থানে আছি। আমরা ৫-৬-এর বৃত্ত থেকে ৭ শতাংশে উপনীত হয়েছি। আমাদের প্রবৃদ্ধির গ্রোথের ফলে যেটা হয়েছে, আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বর্তমানে পাশের দেশ ভারতের চেয়ে বেশি, পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। অতএব সামষ্টিক দিক দিয়ে মোটাদাগে এই একটা অর্জন আমরা দেখতে পাচ্ছি।

কিন্তু প্রবৃদ্ধিই কি সব? মানুষের জীবনযাপনের গুণগত মান, মানুষের বিভিন্ন সেবা, বিভিন্ন দ্রব্য কেনার ক্ষমতা, মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা—এগুলো কি শুধু প্রবৃদ্ধি দিয়ে মাপা যায়? প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামষ্টিক কতগুলো সূচক আছে। সেটা মানুষের ওয়েলফেয়ার বা কল্যাণ কিন্তু নিশ্চিত করে না। অতএব এটা একটা বড় প্রশ্ন যে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সার্বিক উন্নয়ন কতটা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি।

আমরা দেখেছি যে মানুষের অর্থনৈতিক আয়ের বৈষম্য এবং সম্পদের বৈষম্য দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। যারা ধনী, তারা আরো ধনী হচ্ছে। যারা দরিদ্র, তারা দারিদ্র্যের ওপরে কিছুটা উঠছে। কিন্তু সেটা সন্তোষজনক নয়। যেকোনো সময় একজন দরিদ্র মানুষ কোনো দুর্যোগ এলে বা পরিবারে অসুখ হলে, কর্ম বা চাকরি হারিয়ে ফেললে তখন দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। এটার কিন্তু প্রকৃষ্ট উদাহরণ কভিডের সময় অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে এখনো অনেকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে।

অতএব সার্বিক উন্নয়ন যদি আমরা না করি, যেখানে বেশি উপাদান হলো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, যাতায়াত এবং স্বাধীন হয়ে চলাফেলা করা, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করা—এগুলো হলো সার্বিক উপাদানের একটা অংশ। পৃথিবীর যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে এগুলো আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। সেখানেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কিছুটা টানাপড়েন হয়। কিন্তু মোটাদাগে মানুষের এই জিনিসগুলোকে নিশ্চিত করা যায়।

যেকোনো কাজে, বিশেষ করে সরকারি কাজে প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি আছে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে কিন্তু সরকারি যেকোনো ব্যয়, যেকোনো কর্মকাণ্ড অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়, সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি না থাকলে কিন্তু সরকারি কর্মচারী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা বা পণ্য কোনোটাই সাধারণ মানুষের কাছে সন্তোষজনক হয় না। মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকে।

অনেক বড় ব্যবসা, অনেক বড় শিল্প, অনেক বড় ভৌত অবকাঠামো হয়েছে, সেতু নির্মিত হয়েছে, টানেল হয়েছে কিন্তু এগুলো যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এই ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেগুলো প্রত্যক্ষভাবে মানুষের উন্নত জীবন নিশ্চিত করে না; সেটা পরোক্ষভাবে করবে। বর্তমান সরকার উন্নয়ন আখ্যান দিয়ে বলছে যে উন্নয়ন হচ্ছে, অতএব উন্নয়নের জন্য সব কিছু করতে হবে। কিন্তু অন্য যে দিকগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি না, যেটা সার্বিক উন্নয়ন বলতে আমি বোঝাতে চাইছি, অর্থাৎ একটা কল্যাণকামী রাষ্ট্র—বাংলাদেশের সে পথে যাওয়া উচিত।

সবচেয়ে বড় জিনিস হলো, আমাদের আইনের শাসন সুনিশ্চিত করা, যাতে সবাই সমানভাবে সব সুযোগ-সুবিধা পায়। কারো প্রতি কোনো অন্যায় হলে যেন দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যায়। সেটা একটা সার্বভৌম দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেটাকে ইংরেজিতে বলা হয় জাস্টিস অ্যান্ড ফেয়ারনেস। এই জিনিসটা কিন্তু আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আইনের শাসন এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে দুর্নীতি হবে। অর্থপাচার, সম্পদের অপচয় হবে। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বা যুক্তিসংগত টাকার চেয়ে অনেক বেশি খরচ হবে। এগুলো নিয়ে অনেক প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে।

অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে যে আমাদের এখানে রাস্তা, রেলপথ নির্মাণে বেশি খরচ হয়—এগুলোর কোনো জবাবদিহি নেই। স্বচ্ছতা নেই। এসব অন্যায় ও দুর্নীতির প্রতিকার হচ্ছে না। অতএব একটা দেশে শুধু মানুষের প্রবৃদ্ধি হবে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে, আমরা সামনে এগিয়ে যাব, কতগুলো সূচকের উন্নতি দেখব—শুধু এগুলোই একটা সার্বভৌম দেশের বৈশিষ্ট্য নয়। সার্বভৌম দেশের দুটি বৈশিষ্ট্য—যেটা আমি আগে বললাম, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক মুক্তি।

এখন আমাদের দেশে এই ক্রান্তিলগ্নে নির্বাচন, রাজনীতি এবং অর্থনীতি—এই তিনটি হিসেবেই সবচেয়ে বড় জিনিস হলো জনগণের অংশগ্রহণ। এখন জনগণের অংশগ্রহণ বলতে নির্বাচন তো অপরিহার্য। জনগণ ভোট দেবে, নির্বাচন করবে, নিজেদের মতো সরকার গঠন করবে। তাদের কাছে সরকারের জবাবদিহি থাকবে। সরকার তাদের প্রশ্নের উত্তর দেবে। অতএব এই যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স—সেটা রাজনীতিতে আছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। সেটা কতটুকু আছে, দেখা উচিত আমাদের। প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কার।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানুষ কতটুকু কী চায়, কোথায় কখন কী চায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যদি নিজেদের ইচ্ছায় নীতিনির্ধারকরা এবং আমলারা বাংলাদেশের সব জায়গায় কোথায় স্কুল লাগবে, কোথায় হাসপাতাল লাগবে, কোথাও নদী খনন করতে হবে বা কোথাও হয়তো ইন্ডাস্ট্রি করতে হবে—সেগুলো ঠিক করে দেন, তবে উন্নয়নের সুফলটা সবার কাছে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পৌঁছাবে না। এই অংশগ্রহণের মূল মন্ত্রটা হলো গণতন্ত্র এবং অংশগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের সার্বিক উন্নয়ন করা।

অতএব গণতন্ত্র উন্নয়ন করতে হলে আগে থেকে ওয়ার্কিং অন টু লেগ (দুই পায়ের ওপর সমানভাবে চলা) তথা গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন—এই দুটির ওপর সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে দেশ একটা সুষ্ঠু, সবল এবং কল্যাণকামী দেশ হবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক, অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments