Saturday, December 3, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামদেশ এগিয়েছে কিন্তু সততায় পিছিয়েছে

দেশ এগিয়েছে কিন্তু সততায় পিছিয়েছে

জিল্লুর রহমান 

১৯৭১ সালের মে মাস। গ্রামের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানিরা। বিক্রমপুরের ছেলে আমি। মানসিক ভারসাম্যহীন একজন লোক ছিল আমাদের গ্রামে। ওকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিরা। নির্বিচারে হত্যা করা মানুষের বীভৎস লাশ আর আগুনে পোড়া গ্রামের পর গ্রাম দেখে মনের ভেতর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মনে মনে শপথ নেই মুক্তিযুদ্ধে যাব। নিরপরাধ মানুষ হত্যার বদলা নেব।

তখনো ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেইনি। বয়স কম। চাচাতো ভাই মিলে আমরা ছিলাম ছয়জন। সিদ্ধান্ত নিলাম যুদ্ধে যাব। স্থানীয় মসজিদে মিলাদ দিলাম। এর পরদিন সকাল ৫টায় রওনা দিলাম। হেঁটে পৌঁছলাম বিক্রমপুর লঞ্চঘাটে। ওখান থেকে কুমিল্লার ষাইটনল যাই। তারপর চাঁদপুর হয়ে বক্সনগর বর্ডার দিয়ে বিশালগড় হয়ে ১৪ মাইল হেঁটে আগরতলা পৌঁছাই। ওখানে আমরা কংগ্রেস ভবনে উঠি। সবাই ওখানেই ওঠেন।

আগরতলায় বাংলাদেশের এমপিদের থাকার একটা ভবন ছিল। গাজী গোলাম মোস্তফা ছিলেন আমাদের এলাকার এমপি ও গভর্নর। তার কাছে গেলাম। তিনি একটা চিঠি লিখে বললেন, বকুলনগর ক্যাম্পের দায়িত্বে আছেন শামসুল হক। তোমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করো।

তখনো পুরোদমে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শুরু হয়নি। তিনটি মাত্র তাঁবু ছিল বকুলনগরে। আমরা ছিলাম মোট একুশজন। আমাদের ফিজিক্যাল ট্রেনিং হতো। আমার কার্যকলাপ আর পারদর্শিতায় খুশি হয়ে প্রশিক্ষকরা আমাকে ‘ফিজিক্যাল ইন্সস্ট্রাক্টর’ হিসাবে নিযুক্ত করেন। এরপর শত শত মানুষ ট্রেনিংয়ের জন্য বাংলাদেশ থেকে আসতে থাকে। বকুলনগরের হেডকোয়ার্টারের সতেরোজনের মধ্যে আমি ছিলাম একজন। সরকার আমাকে ১৫০ টাকা ভাতা দিত।

ঢাকার বাসাবো এলাকার আওয়ামী লীগের নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ আমার কাছে চিঠি দিয়ে লোকজন ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠাতেন। আমি পাঁচ শতাধিক মানুষকে তখন রিক্রুট করেছিলাম। বকুলনগরে দুটো ক্যাম্প ছিল। একটি পদ্মা, আরেকটি মেঘনা। আমরা ছিলাম পদ্মায়। কিছুদিন পর রাইফেল ও গ্রেনেড ট্রেনিং শুরু হয়। তিনটি তাঁবু থেকে ১৪৭টি তাঁবু ভরে যায়। পদ্মায় তখন পনেরোশ মানুষ ট্রেনিং নিচ্ছে।

ক্যাম্পে টিনের প্লেটে খেতাম। শুধু ডাল-ভাত। প্রথম অবস্থায় খাওয়া-দাওয়ায় খুব কষ্ট হতো। এক তাঁবুতে থাকতাম ছয়জন। বিছানাপত্র বলতে নিচে অয়েলক্লথ আর মাথায় একখানা ইট। আমরা খাল, পুকুর, বিলের পানি পান করতাম। তাঁবুতে প্রায়ই দেখা যেত পাহাড়ি লাল বিছার উৎপাত। বিছায় কামড়ালে মানুষের মারা যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল।

শরণার্থীদের মধ্যে এক হিন্দু পরিবারের কথা আমার খুব মনে পড়ে। মহিলার সঙ্গে ছয়-সাত বছরের একটি মেয়ে আর তিন-চার বছরের ছেলে। ওরা ঘুরঘুর করছিল আমার হেডকোয়ার্টারের আশপাশে। মহিলার চোখে পানি। বলল, নাম লেখাতে না পারায় দুদিন ছেলেমেয়ে কিছু খায়নি। কথা শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো। আমি তখন স্টোরের ইনচার্জ ছিলাম। ওদের জন্য চাল-ডাল যা পারলাম লুকিয়ে দিয়ে দিলাম।

এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আনা মশারি, খাবার, চিনি, চাল, ডাল, গামছা ইত্যাদি আমি শরণার্থীদের অনেক দিয়েছি। জানতাম, এটি ছিল অন্যায়। কিন্তু ওদের করুণ মুখগুলো দেখে আমি না করতে পারতাম না। একবার চাল-ডাল দেওয়ার সময় ধরা পড়লাম ক্যাপ্টেনের কাছে। শাস্তি হলো-বারো ঘণ্টা একটা ঘরে আটকে রাখা। এতে আমার কোনো দুঃখবোধ ছিল না। কারণ যা করেছি তা আমার দেশের মানুষের জন্য করেছি।

সন্ধ্যার দিকে আমি ফ্রি হয়ে যেতাম। কোনো কোনো দিন আগরতলার সুব্রত হোটেলে যেতাম। বাঙালি নেতাদের আনাগোনা ছিল ওখানে। বাংলাদেশের সব খবর পাওয়া যেত। আবার কোনো কোনো দিন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে দেশপ্রেমের নাটক মঞ্চায়ন করতাম। দেশের গান শেখাতাম-‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ইত্যাদি।

একদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় হঠাৎ আমাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে এলেন। আমি তাকে গান গেয়ে শোনাই-‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে’। তিনি খুব খুশি হলেন। বললেন, চালিয়ে যাও, এ সময় বিনোদনেরও দরকার আছে। ক্যাম্পে মাইক লাগানো থাকত। সেখানে আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদসহ অনেকের গান বাজত।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ফজলুল হক মণি, ছাত্রনেতা আবদুল কুদ্দুস মাখন, মো. জিন্নাসহ কয়েকজন আমাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। আমাকে ট্রেইনার হিসাবে তাদের পছন্দ হওয়ায় নিয়ে যান আগরতলার কলেজটিলায়। ওখানে আমার মতো আরও অনেকে ছিলেন, যাদের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে বাছাই করে আনা হয়েছে। সবার ভেতর থেকে আমিসহ আরও পাঁচজনকে নির্বাচন করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেন।

কিন্তু ঢাকায় আসার পথে কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুরে আমরা একটা সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। জয় হয় আমাদের। এরপর ঢাকায় এসে তেমোহনী, রাজারবাগ ইত্যাদি এলাকার রাজাকারদের দমন এবং পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করি। মেজর হায়দারের অধীনে ২ নম্বর সেক্টরে ছিলাম আমরা। আমাদের সঙ্গে আরও মুক্তিযোদ্ধা যোগ দিয়েছিলেন। সবাই মিলে যুদ্ধ করতাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকার অনেক এমপি ও নেতাকে পরিবারের নিরাপত্তার খাতিরে আমি ভারতে যেতে সাহায্য করেছি।

স্বাধীনতার পর বিটিভি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে প্রথম আমার সাক্ষাৎকার নেয়। এরপর তারা আমাকে নাটকে অভিনয় করার প্রস্তাব দেয়। আমি রাজি হয়ে যাই। অডিশন হয়। তাতে পাশ করি। আমার প্রথম অভিনীত নাটক ‘রক্তে ভেজা শাপলা’। প্রযোজনা করেন আতিকুল হক চৌধুরী। লেখক ছিলেন অভিনেতা আবদুল সাত্তার। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের। আবদুল্লা আল মামুনের ‘সংশপ্তক’ নাটকে আমি হাসেম চরিত্রে অভিনয় করেছি।

এ ছাড়া অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটক হলো-আরেক ফাগুন, একটি সেতুর গল্প, হিরামন, মাটির কোলে, অনন্ত নিবাস ইত্যাদি। বাংলাদেশ বেতারে ‘জল্লাদের দরবার’ একটি নাটক করি স্বাধীনতার পর। স্বাধীনতার আগে ‘বেদের মেয়ে’, এরপর ‘পাতালপুরের রাজকন্যা’, ‘কি যে করি’, ‘দস্যু বনহুর’, ‘এপার ওপার’, ‘মাসুদ রানা’, ‘বাহাদুর’, ‘রাজদুলারী’সহ বিভিন্ন সিনেমায় অভিনয় করি। আমার চারটি কৌতুকের ক্যাসেট ছিল-‘ভাতিজা কি কয়’, ‘চান্দের দেশে ভাতিজা’, ‘পাগলা ঘোড়া’ ও ‘আসছে ভাতিজা’।

দেশ এগিয়েছে, কিন্তু সততায় পিছিয়ে আছে। এখনো দেশে পাকিস্তানি সমর্থকগোষ্ঠী আছে। ঘৃণা করি এদের। স্বাধীন দেশে দেশদ্রোহী থাকতে পারে না। আরেকটি যুদ্ধ করে এদের দেশছাড়া করতে হবে। আগামী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। আর এ দায়িত্বটা নিতে হবে আমাদেরই।

(অনুলিখন : তুষার কান্তি সরকার)

জিল্লুর রহমান : মুক্তিযোদ্ধা, অভিনেতা

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments