Thursday, October 6, 2022
spot_img

দেশে তৈরি

দেশেই ধান কাটার যন্ত্র তৈরি করেছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীরা। যন্ত্রটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্রি হোলফিড কম্বাইন হারভেস্টার’। ব্রির সাত-আটজনের দল ছয় মাসের চেষ্টায় তৈরি করে যন্ত্রটি। ঘণ্টায় মেশিনটি তিন থেকে চার বিঘা জমির ধান কাটতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ। বিশাল জনগোষ্ঠী কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত। তবে দিন দিন কৃষিক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে শ্রমিক সরবরাহ। ধান উৎপাদনে শীর্ষে থাকা অঞ্চলগুলোতে ধান কাটার মৌসুমে অন্য অঞ্চল থেকে শ্রমিক এনে ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।  করোনাকালে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এই সংকট থেকে উত্তরণে সমাধান হতে পারে ‘কম্বাইন হারভেস্টার’। দেশে ২০১৫ সাল থেকে ধান, গম কাটা ও মাড়াইয়ে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার শুরু হয়। এত দিন যন্ত্রটি ছিল আমদানিনির্ভর। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্রের (ব্রি) একদল গবেষক দেশেই তৈরি করেছেন দেশের জমিতে ব্যবহার উপযোগী একটি কম্বাইন হারভেস্টার ‘ব্রি হোলফিড কম্বাইন হারভেস্টার’।

হারভেস্টারটি উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্রির জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (এসএসও) ড. মো. আশরাফুল আলম। যন্ত্রটি উদ্ভাবনের সময় মোট ১৯টি বৈশিষ্ট্যের দিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। চুয়াডাঙ্গায় পরীক্ষামূলক ব্যবহার শেষে ৩১ ডিসেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়।

যে ধরনের কাজে ব্যবহার করা যাবে

এখন বিদেশ থেকে যেসব কম্বাইন হারভেস্টার আসছে, সেগুলোর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো দেশের মাটিতে ব্যবহার উপযোগিতা। সহজ করে বলতে গেলে, আমদানীকৃত হারভেস্টারগুলো উন্নত বিশ্বের বড় আকারের জমি বা কৃষি খামারের উপযোগী করে বানানো। সেগুলো আমাদের দেশের ছোট ছোট জমিতে যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায় না।

উদ্ভাবকদের দাবি অনুযায়ী দেশে তৈরি হারভেস্টারটি এই সমস্যা সমাধান করতে পারবে। এই যন্ত্র বাংলাদেশের জমির প্রেক্ষাপটে মোটামুটি সব আকারের জমিতে ব্যবহার উপযোগী। প্রাথমিকভাবে ধান কাটার উপযোগী করে তৈরি করা হলেও এটি দিয়ে গম কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণ করা যাবে।

গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, দেড় বছর ধরে গবেষণা করে যন্ত্রটি উদ্ভাবন করা হয়েছে, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলকে টার্গেট করে যন্ত্রটি উদ্ভাবন করা হয়। কারণ বোরো মৌসুমে শ্রমিক সংকট ও পাহাড়ি ঢলে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেই যন্ত্রটি দিয়ে ধান কাটা যাবে।

টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন

‘ব্রি হোলফিড কম্বাইন হারভেস্টার’-এর দৈর্ঘ্য পাঁচ হাজার ২০০ মিলিমিটার, প্রস্থ এক হাজার ৮০০ মিলিমিটার এবং উচ্চতা দুই হাজার ৬০০ মিলিমিটার। এর ইঞ্জিনের সক্ষমতা ৮৭ হর্স পাওয়ার। ফোর সিলিন্ডার ইঞ্জিন ব্যবহারের কারণে যন্ত্রটিতে সৃষ্ট শব্দ তুলনামূলক কম। এটি প্রতিবারে ১.৫ মিটার (কাটার প্রস্থ) জমির ধান কাটতে পারে এবং স্টোরেজ ট্যাংকে ৬০০ কেজি পর্যন্ত ধান সংরক্ষণ করতে পারে। যন্ত্রটির মোট ওজন তিন হাজার কেজি এবং ট্রাকশন লোড ২১ কিলোনিউটন/মিটার২ হওয়ায় সহজেই কাদাযুক্ত জমিতেও কাজ করতে পারে। হারভেস্টারটির মূল ইঞ্জিন আমদানি করা হলেও অন্যান্য যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও সংযোজিত।

মাঠে চলছে ফসল কাটার কাজ

উন্নত প্রযুক্তিগত দিক

এই হারভেস্টার ব্যবহার করে কর্দমাক্ত জমি কিংবা মাটিতে হেলে পড়া শস্য (ধান, গম) কাটা যাবে। রাতে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে এটিতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ প্রযুক্তির সেন্সর। এ ছাড়া অন্যান্য হারভেস্টারের মতো এটিতেও এমন সেন্সর লাগানো আছে, যার ফলে শস্য কাটার সময় সামনে কোনো ধাতব বস্তু চলে এলে তা শনাক্ত করতে পারে এবং যন্ত্রকে থামিয়ে দিতে সক্ষম। এতে করে এড়ানো যাবে বড় কোনো দুর্ঘটনা। পরবর্তী সময়ে এতে বিভিন্ন ধরনের উন্নত প্রযুক্তি ও স্মার্ট ফিচার যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

জ্বালানি, কর্মদক্ষতা ও রক্ষণাবেক্ষণ

এটি প্রতি ঘণ্টায় তিন-চার বিঘা জমির ধান কাটতে পারে এবং ডিজেল খরচ হয় ৩.৫-৪ লিটার। যন্ত্রটি ব্যবহারে হারভেস্টিং ক্ষতিও খুবই কম। এই যন্ত্র দিয়ে ফসল কাটলে যে শস্য নষ্ট হয় তার পরিমাণ শতকরা এক ভাগের কম। কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে দিনে ২০ থেকে ৩০ বিঘা পর্যন্ত জমির ধান কাটা যাবে।

যেকোনো ভারী যন্ত্রাংশের দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বেশ জরুরি। আর এ জন্য প্রয়োজন পড়ে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ। বর্তমানে যেসব বিদেশি হারভেস্টার দেশের বাজারে আছে, সেগুলোর যন্ত্রাংশের অপ্রাপ্যতা ও উচ্চমূল্যের কারণে রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন যেমন হচ্ছেন, যন্ত্রের কর্মদক্ষতাও হ্রাস পাচ্ছে।

কিন্তু ব্রির হারভেস্টারে দেশের বাজারে এরই মধ্যে প্রচলিত আছে এমন সব যন্ত্রাংশ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। দেশে তৈরি হারভেস্টারটি বাজারজাতকরণ শুরু হলে এটির যন্ত্রাংশও বাজারে পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যন্ত্রটি ২০ বছর চলবে বলে আশা করছেন তাঁরা। এতে যন্ত্রাংশের বাজারের একচেটিয়া সিন্ডিকেট রোধ করা যাবে—এমনটিই মনে করেন এটির গবেষকদলের প্রধান ড. আশরাফুল ইসলাম।

দাম যেমন পড়বে

বর্তমানে দেশের বাজারে জাপান থেকে যেসব হারভেস্টার আমদানি করা হয় সেগুলোর বাজারদর ২৫-৩০ লাখ বা তার চেয়েও বেশি। চীন থেকে আমদানীকৃত হারভেস্টারগুলোর দাম কিছুটা কম। এই হারভেস্টারগুলো সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি সাপেক্ষে ৯ থেকে ১২ লাখ টাকায় পাওয়া যায়। দেশের তৈরি ব্রির হারভেস্টার বাজারজাতকরণ সম্ভব হলে এটির দাম ১০ থেকে ১২ লাখের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

বাজারে আসবে কবে

উদ্ভাবিত এই যন্ত্র এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা চালিয়ে ভালো ফল পাওয়ার পর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় গত ৩১ ডিসেম্বর। এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য যে ধরনের ওয়ার্কশপের প্রয়োজন তা দেশে নেই। তাই কবে নাগাদ এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ড. আশরাফুল ইসলাম জানান, গবেষকদল হিসেবে যন্ত্রটির প্রটোটাইপ উদ্ভাবন করেছেন তাঁরা। বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারি সেক্টরের কৃষি যন্ত্রাংশ নির্মাতাদের এগিয়ে আসতে হবে।

প্রয়োজন দক্ষ জনবল

কম্বাইন হারভেস্টারকে ইন্টেলিজেন্স মেশিনারি হিসেবে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ এরশাদুল হক। তিনি বলেন, ‘এই যন্ত্রাংশ পরিচালনা ও সংরক্ষণ কাজে দক্ষ জনবল প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন যন্ত্রের সর্বাধিক কর্মদক্ষতা লাভ করা যাবে, আবার যন্ত্রের স্থায়িত্বও বৃদ্ধি পাবে।

আগামী কয়েক বছরে দেশের কৃষিক্ষেত্রে হারভেস্টারসদৃশ যন্ত্রের ব্যবহার অনেকাংশে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে দক্ষ জনবল সংকট এই অগ্রগতির পথে বাধার সৃষ্টি করছে। তাই এখন থেকেই এই সমস্যা নিরসনে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য এখনই টেকিন্যাল ও ভোকেশনাল পর্যায়ে পড়াশোনায় এই বিষয়ে কোর্স চালু করা যেতে পারে। এতে এসব যন্ত্রাংশ পরিচালনা ও সংরক্ষণ কাজে দক্ষ জনবল পাওয়া।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments