Sunday, June 23, 2024
spot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিদেশে ই-স্পোর্টসের জনপ্রিয়তা অনেক বাড়বে

দেশে ই-স্পোর্টসের জনপ্রিয়তা অনেক বাড়বে

২১ জানুয়ারি। দিনটি ছিল শুক্রবার। বন্ধের দিন। বাংলাদেশের লোকজন দিনটি ধরে ঘুরতে বের হয়।

বিয়েশাদি থাকে। দিনটার বিশেষত্ব তাই একটু অন্য রকমই। তবে ২১ জানুয়ারির শুক্রবারটা ই-স্পোর্টসপ্রেমীদের কাছে ইতিহাস তৈরির দিনই ছিল। কেননা প্রতিযোগিতাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম কোনো অফিশিয়াল অফলাইন/ল্যান ই-স্পোর্টস ইভেন্ট। আর এটির আয়োজনে ছিল এরিনা অব ভ্যালোর। সন্ধ্যায় যমুনা ফিউচার পার্কের ইস্ট কোর্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে গ্র্যান্ড ফিনালের ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ওরিয়েন্টাল ফিনিক্স এবং উই ই-স্পোর্টস আর্মাডা। আর সেই লড়াইয়ে জয়ের মুখ দেখে ওরিয়েন্টাল ফিনিক্স। দলের সদস্যরা বিজয়ের উত্তেজনায় উত্তেজিত। অভিনন্দন জানিয়ে ওদের সঙ্গে আড্ডায় বসার আমন্ত্রণ জানালাম। আর আড্ডাস্থল হিসেবে যমুনা ফিউচার পার্কের ফুড কোর্টকেই বেছে নিলাম। গালিবকেই প্রথম প্রশ্ন—

প্রথমে আপনাদের নামগুলো জানা যাক। কে কোন জন?

আসাদুল্লাহ আল গালিব : এই যে আমার ডান দিক থেকে বসে আছে আবদুল্লাহ আল মাসুদ (দলনেতা), ফাহরাজ জামিন স্পর্শ, নাফিস আহমেদ, আবরার শাহরিয়ার সুবাত, ফারদিন হাসান, শেখ মতিউর রহমান আর আমি দলের ম্যানেজার।

প্রশ্ন : এগুলো তো গেল আপনাদের পৈতৃক নাম। গেমিং দুনিয়ায় আপনারা কী নামে পরিচিত?

আসাদুল্লাহ আল গালিব : আমার নাম হচ্ছে ‘সুগারকিড’, মাসুদের নাম ‘ডেডলি’, স্পর্শ হচ্ছে ‘বিস্ট’, নাফিস ‘মি. চার্মিং’, সুবাত তো ‘ওয়ার্থলেস’, ফারদিন ‘পিকা পিকা’ আর মতিউর ‘এসজেন’।

প্রশ্ন : নামগুলো বেশ মজার তো। আচ্ছা, আপনাদের দল হিসেবে শুরুটা হলো কিভাবে? কিভাবে এরিনা অব ভ্যালোরের মতো একটি ৫ভি৫ মাল্টিপ্লেয়ার অনলাইন ব্যাটল এরিনা (এমওবিএ) গেম খেলতে আগ্রহী হলেন?

আবদুল্লাহ আল মাসুদ : আমাদের এ যাত্রা অবশ্য এতটা সহজ ছিল না। চার বছর ধরে আমরা আলাদাভাবে এমওবিএ গেম খেলছি। তবে দল হিসেবে খেলছি দুই বছর হলো। ফলে এমওবিএ গেমের প্রতি আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় খেলা হয়েছে লীগ অব লেজেন্ড, ওয়াইল্ড রিফটসহ বিভিন্ন এমওবিএ গেম। তবে এরিনা অব ভ্যালোর গেম খেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

দলের এক সদস্য শেখ মতিউর রহমানের দিকে নজর গেল। শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে তাঁর। এক লম্বা ইস্পাতের পাত তাঁর পায়ে সংযুক্ত। হাঁটতে বেশ কষ্টও হয়, লক্ষ করেছি। এ অবস্থায় তাঁর মনের জোর দেখে অবাকই হলাম। তাঁকে উদ্দেশ করেই প্রশ্ন করলাম—

আপনাদের ব্যক্তিগত জীবনে এমন কোনো চ্যালেঞ্জ বা বাধা ছিল, যা আপনাদের এজাতীয় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার পথে কিংবা গেমিং ক্যারিয়ার শুরু করায় বাধা সৃষ্টি করেছিল?

শেখ মতিউর রহমান : আমার শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু খেলাটির প্রতি ভালোবাসা আমাকে বেশ সাহস জুগিয়েছে।

আবদুল্লাহ আল মাসুদ : মতিউরের মতো সদস্যই আসলে আমাদের সাহস জুগিয়েছে। ওকে দেখে আমরা নিজেরা নিজেদের সাহস দিয়েছি, আমরা জিতবই। আর তাইতো দলের কোনো স্পনসর বা কোচ ছাড়াই আমরা এই সাফল্য পেয়েছি। এর আগে এ ধরনের খুব বেশি টুর্নামেন্ট খেলিনি। ফলে  মনে দ্বিধা ছিল, অনেকবারই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক বোঝাপড়াই আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতা জিতে কেমন লাগছে?

ফাহরাজ জামিন স্পর্শ : দল হিসেবে আমরা বেশ আনন্দিত। কেননা আমাদের কঠোর পরিশ্রম সফল হয়েছে। এরিনা অব ভ্যালোর বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ আমাদের জন্য ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন : প্রতিযোগিতায় তো ‘ইয়োরোজুয়া’, ‘উই ই-স্পোর্টস’, ‘মার্টারস’-এর মতো অনেক বড় বড় নাম আর পুরনো দল ছিল। এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে কেমন লেগেছে?

নাফিস আহমেদ : আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, আমাদের দলনেতার নির্দেশনা, দল হিসেবে সদস্যদের মধ্যকার বন্ধন এবং অভিজ্ঞতা। দলের সবাই একটু স্নায়ুচাপে ভুগছিলাম, কারণ যেকোনো দলই জিততে পারত। ‘ইয়োরোজুয়া’দের হারানো সম্ভবত আমাদের দলের সেরা মুহূর্ত। কারণ ওরা চ্যাম্পিয়নের মতোই খেলছিল, ওদের হারানো সহজ ছিল না। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা প্রতিটি খেলায় নিজেদের শান্ত রেখেছি এবং কম ভুল করেছি, যে কারণে ‘ইয়োরোজুয়া’, ‘উই ই-স্পোর্টস’, ‘মার্টারস’-এর মতো বড় দলগুলোর সঙ্গে জিততে পেরেছি। প্রতিযোগিতার শীর্ষ আটটি দলকে সম্মান করি। কেননা তারা আমাদের সমপর্যায়ের।

প্রশ্ন : প্রতিযোগিতার উল্লেখযোগ্য মুহূর্তের কথা যদি বলতেন।

আবদুল্লাহ আল মাসুদ : গ্র্যান্ড ফিনালেতে মুখোমুখি হয়েছিলাম উই ই-স্পোর্টস আর্মাডার। সৌভাগ্যবশত এর আগেও তাদের সঙ্গে একবার মোকাবেলা হয়েছিল। ফলে তাদের কৌশলগুলো সম্পর্কে কিছু ধারণা আগে থেকেই ছিল আমাদের। ওদের দুর্বল দিকগুলোকে মাথায় রেখেই আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম। আর সেটা সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে ফাইনালে জয় পেয়েছি।

কথা বলতে বলতে সবারই গলা শুকিয়ে গেছে বলা চলে। কফির অর্ডার দিয়ে আবার ফিরে আসি আড্ডায়।

আচ্ছা, ই-স্পোর্টস আপনাদের ক্যারিয়ারকে কিভাবে বদলে দিয়েছে বলে আপনারা মনে করেন?

আবরার শাহরিয়ার সুবাত : মূলত গভীর ভালোবাসা থেকে এমওবিএ গেমস খেলি। তবে ই-স্পোর্টসকে এখনই ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে পারব না। তবে স্বপ্ন দেখি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ই-স্পোর্টসের জনপ্রিয়তা অনেক বাড়বে। একসময় আমাদের ই-স্পোর্টস প্লেয়াররা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। আর এই স্বপ্ন দেখার শুরুটা কিন্তু করে দিয়েছে এরিনা অব ভ্যালোরের মতো একটি এমওবিএ গেম।

সুবাতের কথা শেষ হতে না হতেই কফি হাজির। গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে বিজয়ী দল হিসেবে তাদের ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা জানতে চাই  দলনেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদের কাছেই।

আবদুল্লাহ আল মাসুদ : এই বিজয় আমাদের অনুপ্রেরণা, আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এবং দিয়েছে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার গুরুদায়িত্ব। এখন আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনা এশিয়ান গেমসসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা। বলতে পারেন, এটা আমাদের স্বপ্ন। বাংলাদেশে ই-স্পোর্টসের বিকাশে এটিই আমাদের প্রথম পদক্ষেপ। আর বাংলাদেশে ই-স্পোর্টসের দলগুলোকে বলতে চাই—এ ধরনের প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসিকতা নিয়ে অংশগ্রহণ করুন।

প্রশ্ন : এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সরকারের অনুমোদনের বিষয়টা কী অবস্থায় আছে?

আসাদুল্লাহ আল গালিব : বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এবার এশিয়ান গেমসে তিনটি গেম—ফিফা, হার্ট স্টোন ও পিস এলিটের অনুমতি দিয়েছে। সেসবের মধ্যে এরিনা অব ভ্যালোর গেমটি নেই। তবে আমাদের মতে, বাংলাদেশের যেসব গেমের ই-স্পোর্টসের অবকাঠামো আছে সেসব গেমকে আসলে সুযোগ দেওয়া উচিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এরিনা অব ভ্যালোর গেমটির কথা। গেমটি আমরা নিয়মিত এবং দক্ষতার সঙ্গে খেলে থাকি। এ জন্য এসব গেম খেলার অনুমতি পেলে আমরা এশিয়ান গেমসে ভালো কিছু করতে পারব।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments